তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের ওপর পঞ্চম দিনের মতো শুনানি শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। বুধবার (২৯ অক্টোবর) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে এই শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়।
এদিন আদালতে আবেদনকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন ব্যারিস্টার মো. শাহরিয়ার।
এর আগে, গত ২১ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার এই আপিল শুনানি শুরু হয়েছিল। প্রথম দুই দিন (২১ ও ২২ অক্টোবর) রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। এরপর গত ২৩ অক্টোবর তৃতীয় দিনের মতো এবং ২৮ অক্টোবর চতুর্থ দিনের মতো মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ দিনে জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
মূলত, গত ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করেন (আপিলের অনুমতি দেন)। আদালত জানান যে, তারা এ বিষয়ে পুনরায় আপিল শুনবেন। এরই ধারাবাহিকতায় মামলাটির শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চই এই আদেশ দেন।
সেদিন (২৭ আগস্ট) আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেছিলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
ওই শুনানিতে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছিলেন, আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দিয়ে কোনো সাময়িক সমাধান দিতে চায় না; বরং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটি কার্যকর সমাধান চায়, যা বারবার বাধাগ্রস্ত হবে না। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি যেন সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখতে পারে, সেভাবেই কাজ করা হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যদি ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা কখন থেকে কার্যকর হবে—সেদিন সেই প্রশ্নও রেখেছিলেন প্রধান বিচারপতি।
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছিলেন, গত দেড় দশকে দেশের মানুষ শাসিতের পরিবর্তে নানাভাবে শোষিত হয়েছে। মানুষ গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে ব্যবস্থাগুলো ছিল, সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং মানুষ ঠিকমতো বিচার পায়নি। একারণেই এই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজপথই নির্ধারণ করে দিয়েছে কে প্রধান বিচারপতি হবেন আর কে সরকার প্রধান হবেন। জনগণের এই ক্ষমতাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই, কারণ এমন অবজ্ঞা করলেই বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। এসময় তিনি ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটও আদালতে তুলে ধরেন।
পরে সেদিনই আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো শোনার অনুমতি দেন এবং এ বিষয়ে পুনরায় আপিল শুনানির জন্য ২১ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেন।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীটি ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছিল, যার মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়। তবে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম. সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট রুল জারি করলেও, ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট চূড়ান্ত শুনানি শেষে রিটটি খারিজ করে দেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ বলে ঘোষণা করেন।
পরে হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করা হয়। আদালত এই মামলায় আটজন ‘অ্যামিকাস কিউরি’ (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ করে তাদের মতামত শোনেন। এদের মধ্যে পাঁচজনই সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
তারা হলেন— ড. কামাল হোসেন, টিএইচ খান, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। অন্য অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কেসি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মত দেন। আর ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ও ড. এম জহির এই ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পক্ষে তাদের প্রস্তাব আদালতে তুলে ধরেন। এছাড়া তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
এরপর, আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীটি (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয় এবং ৩ জুলাই তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
এরপরে তিনটি জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তবে এরই মধ্যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে।
সরকার পতনের পর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আপিল বিভাগের সেই ২০১১ সালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। বাকিরা হলেন— তোফায়েল আহমেদ, এম. হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভুঁইয়া ও জাহরা রহমান।
পরবর্তীতে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একই বছরের (২০২৪) ১৬ অক্টোবর এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার গত বছরের (২০২৪) ২৩ অক্টোবর পৃথকভাবে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। এছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও একই ধরনের একটি আবেদন জানান।
ফলে, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিগতভাবে করা মোট চারটি রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। সেসব আবেদনের ওপর শুনানি নিয়েই গত ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন এবং জানান যে, এ বিষয়ে পুনরায় আপিল শোনা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত মামলাটি আবারও আপিল বিভাগের শুনানিতে উঠেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















