জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদনের ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ টাকায়।
রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে এই ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ জানান, এই বর্ধিত ব্যয়ের সম্পূর্ণ অর্থই প্রকল্প ঋণ থেকে আসবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ডলারের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার খুব বেশি না বাড়লেও, টাকার অঙ্কে এই পরিমাণটি যথেষ্ট বড় মনে হচ্ছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও জোর দিয়ে বলেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার এই সময়ে সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এবং ব্যয় সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে এই ব্যয় ২২.৬৩ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৪ সালের পরিবর্তে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থায়নে সরকারের নিজস্ব অংশের পরিমাণ ১৬৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে, যার ফলে সরকারের মোট অংশ দাঁড়াবে ২১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, প্রকল্প ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটের মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির আয়ুষ্কাল ৬০ বছর ধরা হয়েছে, যা প্রয়োজনে আরও ২০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
একনেক সভায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য ১ হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সাধারণ হাসপাতাল স্থাপনসহ স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় প্রকল্পসহ মোট ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এই ২৫টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৪টি নতুন প্রকল্প, ৬টি সংশোধিত প্রকল্প এবং ৫টি মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৩২ হাজার ১৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ২৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অনুমোদিত মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি এককভাবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়। পানিসম্পদ খাতের প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নদীভাঙন প্রতিরোধ, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা। এছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’-এর প্রথম ধাপও অনুমোদনের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
অন্যান্য অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ এবং জেলা সড়ক উন্নয়নের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কার্যক্রমও অনুমোদিত হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর আওতায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে শক্তিশালীকরণ এবং পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে স্যানিটেশন খাতে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কুমিল্লা জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, নৌ-পুলিশ স্থাপনা, ট্রাফিক ইউনিট এবং হাইওয়ে থানা নির্মাণের পরিকল্পনাও অনুমোদন লাভ করেছে।
রেলপথ খাতের অধীনে দোহাজারী হয়ে রামু অতিক্রম করে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প সংশোধিত আকারে অনুমোদিত হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৬৪ জেলায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন এবং পুষ্টি সেবা উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন পেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সবুজায়ন কার্যক্রম এবং শিল্পভিত্তিক উৎপাদন প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয় যে, ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ১০টি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদনের বিষয়টি একনেককে অবহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’র নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ ও অবলোকন কেন্দ্র এবং খুলনা নভোথিয়েটার প্রকল্প দুটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করার বিষয়ে অবহিত করা হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























