বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা সম্প্রতি এই উদ্বেগজনক চিত্র উন্মোচন করেছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে ৫৯ শতাংশই তরুণ, যাদের একটি বড় অংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রথমবার মাদক গ্রহণের অভিজ্ঞতা লাভ করে।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হিসেবে গাঁজা (ক্যানাবিস) চিহ্নিত হয়েছে, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন। তবে, এই গবেষণায় সিগারেটকে মাদক ব্যবহারের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গত রবিবার (২৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলের ৫০৪ নম্বর কক্ষে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে এই গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ ম্যাথড (এনএসইউএম) ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিভাগীয় পর্যায়ে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ময়মনসিংহ (৬.০২ শতাংশ), রংপুর (৬.০০ শতাংশ) এবং চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ) বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, রাজশাহী (২.৭২ শতাংশ) এবং খুলনা (৪.০৮ শতাংশ) বিভাগে এই হার তুলনামূলকভাবে কম।
সংখ্যার বিচারে, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করে, যাদের আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ২২.৯ লাখ। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১৮.৮ লাখ) এবং রংপুর বিভাগ (প্রায় ১০.৮ লাখ)। বিভাগভিত্তিক মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যাগুলো নিম্নরূপ: বরিশাল বিভাগে ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, ঢাকা বিভাগে ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, খুলনা বিভাগে ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯ জন, রংপুর বিভাগে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন। সব মিলিয়ে, সমগ্র দেশে যেকোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন।
বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদককে সহজলভ্য বলে জানিয়েছে।
মাদক ব্যবহারের ধরণ অনুযায়ী ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা হলো: গাঁজা (ক্যানাবিস) ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন, মেথামফেটামিন (ইয়াবা) ২২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৫ জন, অ্যালকোহল ২০ লাখ ২০ হাজার ৯৭৭ জন, কোডিন ফসফেট (কফ সিরাপ) ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬০ জন, হেরোইন ৩ লাখ ২২ হাজার ৬৭৭ জন, ঘুমের ওষুধ ৩০ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪ জন, ইনহেল্যান্ট (যেমন: আঠা, পেইন্ট থিনার) ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৭ জন এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ৩৯ হাজার ৬১ জন। এছাড়াও, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ হাজার ৮৮৮ জন, এলএসডি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯৫ জন এবং অন্যান্য মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৫ হাজার ৮৬৪ জন। এই ধরনের মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে এইচআইভি, হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণায় আরও জানা গেছে যে, একজন মাদক সেবনকারী মাসে গড়ে ছয় হাজার টাকা ব্যয় করে।
গবেষণায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, মাদক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে বা শিশুকালেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে, এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















