কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী প্রচারণায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ছুফুয়া বাজারে এক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম দিনে ছুফুয়া বাজারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চৌদ্দগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক জিএস খলিলুর রহমান মজুমদার সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এবং সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত হন আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তাহের আহমেদ তাঁকে স্বাগত জানিয়ে মঞ্চে আসার আমন্ত্রণ জানান এবং উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন যে সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় দেড় মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সালাউদ্দিন আহমেদ মঞ্চে এসে ভোটারদের প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনারা বুঝে-শুনে নিজেদের রায় দেবেন। ভালো জায়গায় দেবেন, যেখানে দিলে কাজে লাগবে, সেখানে দেবেন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির তাহের ভাই বর্তমানে টেলিভিশনের খবরে আলোচিত এবং তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করছেন। ভিডিওটিতে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “তাহের ভাই কিছুটা অসুস্থ। আমি আপনাদের কাছে তাহের ভাইয়ের জন্য দোয়া চাই এবং তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।”
এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কুমিল্লার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদা মন্তব্য করেছেন যে, চৌদ্দগ্রামে শুধু সালাউদ্দিন আহমেদ নন, বরং চৌদ্দগ্রামের সাবেক সকল আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান-মেম্বারকে তাহের সাহেব পুনর্বাসন করছেন। তার অভিযোগ, যারা তাহের সাহেবের সাথে যোগাযোগ করছেন না, তাদের পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “অনেক হত্যা মামলার আসামিদের নিয়ে তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি শেখ হাসিনার আমলের মতো নির্বাচন চান এবং সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারীদের পুনর্বাসন করছেন।”
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক খোরশেদ আলম বলেন, “শুধু সালাউদ্দিন আহমেদ নন, এমন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামায়াত তাদের সাথে টেনে নিচ্ছে। চৌদ্দগ্রামে ধানের শীষের জোয়ার দেখে তারা এখন আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করছে।” তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ তাদের এই কর্মকাণ্ডে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি বেলাল আহমেদ জানান, সালাউদ্দিন আহমেদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং তার বাবার সঙ্গে তাহের ভাইয়ের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সালাউদ্দিন আহমেদ চৌদ্দগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার আসামি এবং তখন তাকে সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “তার বাড়ির সামনে নির্বাচনি সভা হওয়ায় তিনি এখানে এসে বক্তব্য দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় একটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে আটজনকে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মো. আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি নিজেকে বাস মালিক দাবি করে কুমিল্লার আদালতে এই ঘটনায় মামলা করেন। এই মামলায় সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, র্যাবের তৎকালীন ডিজি বেনজীর আহমেদ, কুমিল্লার তৎকালীন পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এই মামলায় সালাউদ্দিন আহমেদ ১১ নম্বর আসামি এবং তার ছেলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নেয়ামত উল্লাহ ৭৯ নম্বর আসামি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ বিএনপি ক্ষমতাকালীন সময়ে কালিকাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ লাভ করেন। বর্তমানে চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের অবস্থান ভালো দেখে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে জামায়াতের সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের প্রচারণায় অংশগ্রহণ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত।
রিপোর্টারের নাম 





















