ঢাকা ০৫:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

ভোটের লড়াইয়ে ‘ধর্মীয় লেবাস’: কৌশল না কি আদর্শের প্রতিফলন?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের বেশভূষা ও আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে উদারপন্থি, বামপন্থি কিংবা স্বতন্ত্র—সব ঘরানার প্রার্থীদের মধ্যেই ধর্মীয় পোশাক ও অনুষঙ্গ ব্যবহারের এক বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টুপি, পাঞ্জাবি কিংবা ঘোমটা এখন কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। অতীতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে মূলধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দলই জনসমর্থন টানতে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ ভোটাররা প্রচারণায় গুণগত পরিবর্তন আশা করলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ধর্মের ব্যবহার আরও বেড়েছে।

নির্বাচনি প্রচারণার চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থীরা সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রচারণার সময় ধর্মীয় জমায়েত, মসজিদ বা শোকসভার মতো স্থানগুলোকে বেশি বেছে নিচ্ছেন। পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মাথায় টুপি ও গায়ে পাঞ্জাবি এবং নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মাথায় কাপড় বা ঘোমটা ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি যেসব প্রার্থী ব্যক্তিগত জীবনে এমন পোশাকে অভ্যস্ত নন, তারাও ভোটের মাঠে নিজেদের ‘ধর্মপ্রাণ’ হিসেবে জাহির করতে এই কৌশল নিচ্ছেন।

সম্প্রতি ঢাকার একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর জনসংযোগের সময় তার আকস্মিক পোশাক পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মহলের দাবি, দেশের সিংহভাগ ভোটার মুসলিম হওয়ায় তাদের সাথে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রার্থীরা এমন পথ বেছে নেন। বিশেষ করে সমাজ বা মসজিদ কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আস্থা অর্জনে এই ‘লেবাস’ কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে অনেকে মনে করেন।

তবে ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ এটিকে ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, প্রার্থীরা কেবল ভোট পাওয়ার জন্য ধর্মের অপব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, গ্রামীণ বা রক্ষণশীল ভোটারদের একাংশ প্রার্থীর ধর্মীয় ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, যা প্রার্থীদের এই কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখলদারি বা ঋণখেলাপির মতো অভিযোগ থাকে। ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে তারা মূলত নিজেদের একটি ‘স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করেন। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার মাধ্যমে ভোটারদের নৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূখণ্ডে রাজনীতির সাথে ধর্মের মেলবন্ধন কয়েক দশকের পুরনো। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর থেকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক পোশাকে পরিবর্তন, ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ধর্মীয় স্লোগান সম্বলিত পোস্টার এবং পরবর্তীতে সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ যুক্ত হওয়া এর প্রমাণ দেয়। নব্বইয়ের দশকের নির্বাচনেও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মাজার জিয়ারত, হাতে তসবিহ রাখা কিংবা মাথায় নির্দিষ্ট রঙের কাপড় ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।

যদিও বাংলাদেশের নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোনো প্রার্থী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বা ধর্মকে পুঁজি করে ভোট প্রার্থনা করলে জরিমানা ও শাস্তির বিধান থাকলেও এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সততার চেয়ে বাহ্যিক লেবাসকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, ততক্ষণ রাজনীতির মাঠে ধর্মের এমন কৌশলগত ব্যবহার চলতেই থাকবে। তবে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে প্রার্থীরা কেবল পোশাক দিয়ে নয়, বরং আদর্শ ও কর্মপরিকল্পনা দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গণতন্ত্র ও আওয়ামী লীগ একসাথে চলেনি: মির্জা ফখরুল

ভোটের লড়াইয়ে ‘ধর্মীয় লেবাস’: কৌশল না কি আদর্শের প্রতিফলন?

আপডেট সময় : ১১:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের বেশভূষা ও আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে উদারপন্থি, বামপন্থি কিংবা স্বতন্ত্র—সব ঘরানার প্রার্থীদের মধ্যেই ধর্মীয় পোশাক ও অনুষঙ্গ ব্যবহারের এক বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টুপি, পাঞ্জাবি কিংবা ঘোমটা এখন কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। অতীতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে মূলধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দলই জনসমর্থন টানতে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ ভোটাররা প্রচারণায় গুণগত পরিবর্তন আশা করলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ধর্মের ব্যবহার আরও বেড়েছে।

নির্বাচনি প্রচারণার চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থীরা সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রচারণার সময় ধর্মীয় জমায়েত, মসজিদ বা শোকসভার মতো স্থানগুলোকে বেশি বেছে নিচ্ছেন। পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মাথায় টুপি ও গায়ে পাঞ্জাবি এবং নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মাথায় কাপড় বা ঘোমটা ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি যেসব প্রার্থী ব্যক্তিগত জীবনে এমন পোশাকে অভ্যস্ত নন, তারাও ভোটের মাঠে নিজেদের ‘ধর্মপ্রাণ’ হিসেবে জাহির করতে এই কৌশল নিচ্ছেন।

সম্প্রতি ঢাকার একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর জনসংযোগের সময় তার আকস্মিক পোশাক পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মহলের দাবি, দেশের সিংহভাগ ভোটার মুসলিম হওয়ায় তাদের সাথে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রার্থীরা এমন পথ বেছে নেন। বিশেষ করে সমাজ বা মসজিদ কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আস্থা অর্জনে এই ‘লেবাস’ কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে অনেকে মনে করেন।

তবে ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ এটিকে ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, প্রার্থীরা কেবল ভোট পাওয়ার জন্য ধর্মের অপব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, গ্রামীণ বা রক্ষণশীল ভোটারদের একাংশ প্রার্থীর ধর্মীয় ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, যা প্রার্থীদের এই কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখলদারি বা ঋণখেলাপির মতো অভিযোগ থাকে। ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে তারা মূলত নিজেদের একটি ‘স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করেন। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার মাধ্যমে ভোটারদের নৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূখণ্ডে রাজনীতির সাথে ধর্মের মেলবন্ধন কয়েক দশকের পুরনো। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর থেকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক পোশাকে পরিবর্তন, ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ধর্মীয় স্লোগান সম্বলিত পোস্টার এবং পরবর্তীতে সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ যুক্ত হওয়া এর প্রমাণ দেয়। নব্বইয়ের দশকের নির্বাচনেও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মাজার জিয়ারত, হাতে তসবিহ রাখা কিংবা মাথায় নির্দিষ্ট রঙের কাপড় ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।

যদিও বাংলাদেশের নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোনো প্রার্থী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বা ধর্মকে পুঁজি করে ভোট প্রার্থনা করলে জরিমানা ও শাস্তির বিধান থাকলেও এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সততার চেয়ে বাহ্যিক লেবাসকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, ততক্ষণ রাজনীতির মাঠে ধর্মের এমন কৌশলগত ব্যবহার চলতেই থাকবে। তবে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে প্রার্থীরা কেবল পোশাক দিয়ে নয়, বরং আদর্শ ও কর্মপরিকল্পনা দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।