ঢাকা ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মাজার ও দরবার শরীফে হামলা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মন্তব্য করেছেন যে, মাজার ও দরবার শরীফে চলমান হামলা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেছেন, এই সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমেই এই সংকট দূর করা সম্ভব।

তিনি শনিবার (২৫ অক্টোবর) ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শিরোনামে একটি জাতীয় সংলাপে এই কথাগুলো বলেন। রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত বিএমএ ভবনের ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ এই সংলাপটির আয়োজন করে।

ইমরান হুসাইন তুষার এবং মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় এই সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম। এ সংলাপে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাট‌ওয়ারী, আইনজীবী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মানজুর আল মতিন, দ্য ডিসেন্ট সম্পাদক ও ফ্যাক্টচেকার কদরুদ্দীন শিশির, কবি ও ক্রিটিক ইমরুল হাসান, লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ, লেখক ও গবেষক তাহমিদাল জামি, গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাহাছ পত্রিকার সম্পাদক জোবাইরুল আরিফ, লেখক ও আলেম ইফতেখার জামিল, লেখক ও আলেম ওমর ফারুক ফেরদৌস, সাংবাদিক ইয়াসির আরাফাত, কবি ও লেখক রাফসান গালিব, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল এর রিসার্চ লিড আহমেদ দীন রুমি, কবি ও লেখক সৈয়দুল হক, সমাজসেবী ও সংগঠক মুহাম্মদ মাঈন উদ্দীন এবং কানজুল হিকমা রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক সুলতান মাহমুদ সোহেলসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ বিষয়ে একটি মূল প্রবন্ধ (কী-নোট পেপার) উপস্থাপন করা হয়। প্রবন্ধে বলা হয়, মাজার সংস্কৃতি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ এবং এটি এদেশের জনগণ, সমাজ ও সংস্কৃতির সাথেই জড়িত। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গটি ধারাবাহিক ও সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হয়ে বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। এটি কেবল সুফি-সমাজের ওপর আঘাত নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপরও আঘাত, যা কেউই মেনে নিতে পারছেন না।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, সুফি-সমাজ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের সবাই চলমান সহিংসতার অবসান চান এবং একটি সমাধানের পথ খুঁজছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য এই সমাধান অত্যন্ত জরুরি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ৫ আগস্টের পর সারাদেশে মাজারগুলোতে ঘটা সহিংসতার ওপর একটি ডকুমেন্টারিও প্রদর্শন করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করেন, তারা হাজার বছরের ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেননি। একারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সাথে কিছু রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততাও রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনা থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়ার যে চেষ্টা, তা মোকাবিলা না করলে এই সংকট সহজে কাটবে না। গত এক বছর ধরে মাজার-দরবারে যে হামলা হয়েছে, তার যদি পাল্টা আঘাত আসে, তবে তা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে নস্যাৎ করে দেবে। তাই, এই সহিংসতা যেকোনো মূল্যেই হোক বন্ধ করতে হবে। সহিংসতা বন্ধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমেই এই সংকট দূর করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মাজারসহ যত ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ বসবাস করেন, তাদের সবার মধ্যে যদি সংলাপের সুযোগ তৈরি না হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ দূর হলেও সামাজিক ফ্যাসিবাদ এখনও রয়ে গেছে। আমাদের এখন এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে হবে।

উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মাজার ও দরবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই মাজার-দরবারের প্রতি এই সহিংসতা রোধ করতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, “সুফি সমাজের পক্ষ থেকে এই আওয়াজ তোলা উচিত যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের ইশতেহারে যেন সুফি সমাজের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ অলি-আউলিয়ার দেশ। এখানে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে, মানুষ হজরত শাহজালাল, শাহ পরান ও অন্যান্য আউলিয়াদের মাজারে জিয়ারত করতে যান। এই সংস্কৃতি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষ সহিংসতাকে মোকাবিলা করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করবেন।

এই সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাট‌ওয়ারী বলেছেন, “মাজারে সহিংসতার বিষয়ে কথা বলাটা একটা ট্যাবুতে (সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয়) পরিণত হয়েছে। আজকের এই অনুষ্ঠানে আসতেও আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, কিন্তু এই ট্যাবু ভাঙতে হবে। আমাদের দেশে মাজার ও দরবারের দায়িত্বশীলদের একটি ঘাটতি হলো, তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে পারছেন না। একারণে তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারছে না। সুফি সমাজের এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে অবদান রাখা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর মাজার ও দরবারে যে সহিংসতা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই কমিশন গঠনে পর্যাপ্ত সহায়তা করবে। শেষ কথা হলো, এদেশের নাগরিক ক‌ওমি, আলিয়া, সুন্নি— যে মতাদর্শই ধারণ করুক না কেন, কেউ কারো গায়ে আঘাত করবে না। এই জায়গায় আমাদের একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন।”

হামলার শিকার হওয়া শেরপুরের মুর্শিদপুর দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা মতিউর রহমান এ সময় বলেন, “যে নাজেহাল পরিস্থিতির মধ্যে মুর্শিদপুর দরবারকে পড়তে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই দরবারে কোনো মাজার নেই, সেজদা নেই, বা কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও নেই। তবুও কেন এই বর্বরোচিত হামলা হলো? এই প্রশ্নের কোনো ভালো উত্তর নেই।”

গাজীপুর দরবারের প্রতিনিধি মুহা. রবিউল ইসলাম বলেন, “মাজারে আক্রমণ মানে হলো সমাজকে বিভক্ত করা। আমরা যদি চুপ থাকি, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। এখনই সময় সহিংসতার‌ বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নেওয়ার। মাজার কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য। সরকারকেই এর সুরক্ষার‌ জন্য দায়িত্ব নিতে হবে।”

পীরজাদা মাহমুদুল হুদা খান বলেন, “আমরা যারা হামলার শিকার হচ্ছি, কেবল তারাই এই হামলার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছি। যারা মাজারে শায়িত আছেন, তাদের জীবনে মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং গরীবের প্রতি দরদ ছিল; কিন্তু তাদের হাতে লাঠি ছিল না। অথচ তাদের প্রতিই এমন অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।”

নলতা দরবারের প্রতিনিধি এবং আহছানিয়া ইন্সটিটিউট অব সুফিজমের অধ্যাপক শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী বলেন, “মাজার বা দরবারের কারও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হ‌ওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন ওরসে রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য দিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু সরাসরি দরবার থেকে এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়। ধর্মীয়ভাবে আমাদের ঐক্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাহলে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ কমে আসবে।”

মাইজভাণ্ডার দরবার‌ শরীফের প্রতিনিধি জনাব আসলাম হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে ১২ হাজার মাজার ও দরবার রয়েছে। আমরা কি পারতাম না এই সহিংসতাকে মোকাবিলা করতে? কিন্তু আমাদের পীর, মুর্শিদরা আমাদের সেই শিক্ষা দেননি। আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে সহিংসতার মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।”

সংলাপে ওমর ফারুক ফেরদৌস বলেন, “মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় যেমন বিদআত ও শিরকের কার্যকলাপ রয়েছে, সেগুলোকে মাজার কর্তৃপক্ষের নিজেদেরই প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু এটাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু আছে, তার পেছনে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার একটি ভূমিকা রয়েছে। যখনই আমাদের দেশে প্রতিবেশী দেশের অনুকূলে নয় এমন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনই এই বিষয়গুলো বাড়ে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের হামলার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”

কবি ও লেখক সৈয়দুল হক বলেন, “বাংলাদেশে সুফি সমাজের মতো এত বড় ঘরানা মুসলমানদের মাঝে আর নেই। কিন্তু কেন এই সমাজ সহিংসতা মোকাবিলা করতে পারলো না? রাষ্ট্রকে কেন আমরা বাধ্য করতে পারলাম না এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে? আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের মধ্যেই আমাদের মূল সংকট লুকিয়ে আছে।”

লেখক ও গবেষক তাহমিদাল জামি বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কার বিশ্বাস বা মতাদর্শ কেমন, সেদিকে তাকানো রাষ্ট্রের কাজ নয়। মাজার বা দরবারে যদি কোনো সংস্কারের প্রয়োজন হয়, তবে তা মাজার কর্তৃপক্ষই ভেতর থেকে করবে। বাহির থেকে সহিংসতা চালিয়ে সংস্কার করা বা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

ইফতেখার জামিল বলেছেন, “মাজারে সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। এটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। এটি নিয়ে সামাজিকভাবেও কাজ করতে হবে।”

কবি ও লেখক রাফসান গালিব বলেন, “কেন ৫ আগস্টের পর মাজারগুলোতে এত বেশি হামলা হলো? এটা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। এর সঙ্গে অবশ্যই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়‌ও যুক্ত আছে। কিন্তু রাষ্ট্র কেন মাজার ও দরবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারলো না, এই প্রশ্নটি করতে হবে।”

অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন লতিফী বলেন, “বাংলাদেশে মাজার সংস্কৃতির ওপর যে হামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকেও আঘাত করেছে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন।”

আইনজীবী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মানজুর আল মতিন বলেন, “কোর‌আন এত সুন্দর, নির্মল ও পবিত্র, অথচ কোরআনের নাম ব্যবহার করে অনেকে মাজার-দরবারে হামলা চালাচ্ছেন। একজন মুসলমান হিসেবে এটা সহ্য করা খুবই কষ্টের। এই সহিংসতার ফলে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই বিপর্যয় রোধ করা না গেলে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।”

গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “সুফি সমাজ নিজেদেরকে মূলধারায় যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেনি। মূলধারার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাদের যথেষ্ট অংশ থাকলেও, সেই অংশ তারা বুঝে নিতে পারেনি। কেন এই অক্ষমতা, তা মাজার ও দরবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি, কোনো যুক্তি দিয়েই সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”

সুফি সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এই সংলাপে উপস্থিত ছিলেন মাইজভাণ্ডার দরবার‌ শরীফের রহমানিয়া ম‌ঈনিয়া মঞ্জিলের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আসলাম হোসেন, অলিতলা দরবার শরীফের পীর মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন লতিফী, নলতা দরবার শরীফের শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী, ফরাজিকান্দী দরবার শরীফের মাসুক আহমেদ, গাজীপুরী দরবার শরীফের সৈয়দ মুহা. রবিউল ইসলাম, ফরিদপুরের পীর আবদুল ওয়াহেদ, দরবারে চাঁদপুরের গোলাম জিলানী, মুর্শিদপুর দরবারের মাওলানা মতিউর রহমান, আহলা দরবার শরীফের মো. মোখলেছুর রহমান, হাকিমাবাদ দরবারের মোহাম্মদ সফিউল আজম, কামারডাঙ্গী দরবার শরীফের খলিফা মো. মাহমুদুল হুদা খান, খানকায়ে এমাদিয়া কারান্দারিয়ার মাওলানা হায়দার আলী এমাদী আল কাদেরী, আশেকানে মদিনা দরবারের পীর মুফতি আবদুস সাত্তার কাদেরী, হোমনা সুফি দরবার শরীফের খন্দকার মহিউদ্দিন সুফি এবং বাগমারী হাদি আমানুল্লাহ দরগাহ শরীফের মাওলানা আবদুস সালামসহ আরও অনেকে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

মাজার ও দরবার শরীফে হামলা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে

আপডেট সময় : ১১:৩৭:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মন্তব্য করেছেন যে, মাজার ও দরবার শরীফে চলমান হামলা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেছেন, এই সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমেই এই সংকট দূর করা সম্ভব।

তিনি শনিবার (২৫ অক্টোবর) ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শিরোনামে একটি জাতীয় সংলাপে এই কথাগুলো বলেন। রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত বিএমএ ভবনের ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ এই সংলাপটির আয়োজন করে।

ইমরান হুসাইন তুষার এবং মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় এই সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম। এ সংলাপে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাট‌ওয়ারী, আইনজীবী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মানজুর আল মতিন, দ্য ডিসেন্ট সম্পাদক ও ফ্যাক্টচেকার কদরুদ্দীন শিশির, কবি ও ক্রিটিক ইমরুল হাসান, লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ, লেখক ও গবেষক তাহমিদাল জামি, গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাহাছ পত্রিকার সম্পাদক জোবাইরুল আরিফ, লেখক ও আলেম ইফতেখার জামিল, লেখক ও আলেম ওমর ফারুক ফেরদৌস, সাংবাদিক ইয়াসির আরাফাত, কবি ও লেখক রাফসান গালিব, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল এর রিসার্চ লিড আহমেদ দীন রুমি, কবি ও লেখক সৈয়দুল হক, সমাজসেবী ও সংগঠক মুহাম্মদ মাঈন উদ্দীন এবং কানজুল হিকমা রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক সুলতান মাহমুদ সোহেলসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ বিষয়ে একটি মূল প্রবন্ধ (কী-নোট পেপার) উপস্থাপন করা হয়। প্রবন্ধে বলা হয়, মাজার সংস্কৃতি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ এবং এটি এদেশের জনগণ, সমাজ ও সংস্কৃতির সাথেই জড়িত। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গটি ধারাবাহিক ও সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হয়ে বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। এটি কেবল সুফি-সমাজের ওপর আঘাত নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপরও আঘাত, যা কেউই মেনে নিতে পারছেন না।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, সুফি-সমাজ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের সবাই চলমান সহিংসতার অবসান চান এবং একটি সমাধানের পথ খুঁজছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য এই সমাধান অত্যন্ত জরুরি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ৫ আগস্টের পর সারাদেশে মাজারগুলোতে ঘটা সহিংসতার ওপর একটি ডকুমেন্টারিও প্রদর্শন করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করেন, তারা হাজার বছরের ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেননি। একারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সাথে কিছু রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততাও রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনা থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়ার যে চেষ্টা, তা মোকাবিলা না করলে এই সংকট সহজে কাটবে না। গত এক বছর ধরে মাজার-দরবারে যে হামলা হয়েছে, তার যদি পাল্টা আঘাত আসে, তবে তা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে নস্যাৎ করে দেবে। তাই, এই সহিংসতা যেকোনো মূল্যেই হোক বন্ধ করতে হবে। সহিংসতা বন্ধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমেই এই সংকট দূর করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মাজারসহ যত ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ বসবাস করেন, তাদের সবার মধ্যে যদি সংলাপের সুযোগ তৈরি না হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ দূর হলেও সামাজিক ফ্যাসিবাদ এখনও রয়ে গেছে। আমাদের এখন এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে হবে।

উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মাজার ও দরবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই মাজার-দরবারের প্রতি এই সহিংসতা রোধ করতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, “সুফি সমাজের পক্ষ থেকে এই আওয়াজ তোলা উচিত যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের ইশতেহারে যেন সুফি সমাজের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ অলি-আউলিয়ার দেশ। এখানে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে, মানুষ হজরত শাহজালাল, শাহ পরান ও অন্যান্য আউলিয়াদের মাজারে জিয়ারত করতে যান। এই সংস্কৃতি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষ সহিংসতাকে মোকাবিলা করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করবেন।

এই সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাট‌ওয়ারী বলেছেন, “মাজারে সহিংসতার বিষয়ে কথা বলাটা একটা ট্যাবুতে (সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয়) পরিণত হয়েছে। আজকের এই অনুষ্ঠানে আসতেও আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, কিন্তু এই ট্যাবু ভাঙতে হবে। আমাদের দেশে মাজার ও দরবারের দায়িত্বশীলদের একটি ঘাটতি হলো, তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে পারছেন না। একারণে তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারছে না। সুফি সমাজের এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে অবদান রাখা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর মাজার ও দরবারে যে সহিংসতা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই কমিশন গঠনে পর্যাপ্ত সহায়তা করবে। শেষ কথা হলো, এদেশের নাগরিক ক‌ওমি, আলিয়া, সুন্নি— যে মতাদর্শই ধারণ করুক না কেন, কেউ কারো গায়ে আঘাত করবে না। এই জায়গায় আমাদের একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন।”

হামলার শিকার হওয়া শেরপুরের মুর্শিদপুর দরবারের প্রতিনিধি মাওলানা মতিউর রহমান এ সময় বলেন, “যে নাজেহাল পরিস্থিতির মধ্যে মুর্শিদপুর দরবারকে পড়তে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই দরবারে কোনো মাজার নেই, সেজদা নেই, বা কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও নেই। তবুও কেন এই বর্বরোচিত হামলা হলো? এই প্রশ্নের কোনো ভালো উত্তর নেই।”

গাজীপুর দরবারের প্রতিনিধি মুহা. রবিউল ইসলাম বলেন, “মাজারে আক্রমণ মানে হলো সমাজকে বিভক্ত করা। আমরা যদি চুপ থাকি, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। এখনই সময় সহিংসতার‌ বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নেওয়ার। মাজার কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য। সরকারকেই এর সুরক্ষার‌ জন্য দায়িত্ব নিতে হবে।”

পীরজাদা মাহমুদুল হুদা খান বলেন, “আমরা যারা হামলার শিকার হচ্ছি, কেবল তারাই এই হামলার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছি। যারা মাজারে শায়িত আছেন, তাদের জীবনে মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং গরীবের প্রতি দরদ ছিল; কিন্তু তাদের হাতে লাঠি ছিল না। অথচ তাদের প্রতিই এমন অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।”

নলতা দরবারের প্রতিনিধি এবং আহছানিয়া ইন্সটিটিউট অব সুফিজমের অধ্যাপক শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী বলেন, “মাজার বা দরবারের কারও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হ‌ওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন ওরসে রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য দিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু সরাসরি দরবার থেকে এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়। ধর্মীয়ভাবে আমাদের ঐক্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাহলে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ কমে আসবে।”

মাইজভাণ্ডার দরবার‌ শরীফের প্রতিনিধি জনাব আসলাম হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে ১২ হাজার মাজার ও দরবার রয়েছে। আমরা কি পারতাম না এই সহিংসতাকে মোকাবিলা করতে? কিন্তু আমাদের পীর, মুর্শিদরা আমাদের সেই শিক্ষা দেননি। আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে সহিংসতার মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।”

সংলাপে ওমর ফারুক ফেরদৌস বলেন, “মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় যেমন বিদআত ও শিরকের কার্যকলাপ রয়েছে, সেগুলোকে মাজার কর্তৃপক্ষের নিজেদেরই প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু এটাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু আছে, তার পেছনে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার একটি ভূমিকা রয়েছে। যখনই আমাদের দেশে প্রতিবেশী দেশের অনুকূলে নয় এমন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনই এই বিষয়গুলো বাড়ে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের হামলার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”

কবি ও লেখক সৈয়দুল হক বলেন, “বাংলাদেশে সুফি সমাজের মতো এত বড় ঘরানা মুসলমানদের মাঝে আর নেই। কিন্তু কেন এই সমাজ সহিংসতা মোকাবিলা করতে পারলো না? রাষ্ট্রকে কেন আমরা বাধ্য করতে পারলাম না এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে? আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের মধ্যেই আমাদের মূল সংকট লুকিয়ে আছে।”

লেখক ও গবেষক তাহমিদাল জামি বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কার বিশ্বাস বা মতাদর্শ কেমন, সেদিকে তাকানো রাষ্ট্রের কাজ নয়। মাজার বা দরবারে যদি কোনো সংস্কারের প্রয়োজন হয়, তবে তা মাজার কর্তৃপক্ষই ভেতর থেকে করবে। বাহির থেকে সহিংসতা চালিয়ে সংস্কার করা বা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

ইফতেখার জামিল বলেছেন, “মাজারে সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। এটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। এটি নিয়ে সামাজিকভাবেও কাজ করতে হবে।”

কবি ও লেখক রাফসান গালিব বলেন, “কেন ৫ আগস্টের পর মাজারগুলোতে এত বেশি হামলা হলো? এটা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। এর সঙ্গে অবশ্যই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়‌ও যুক্ত আছে। কিন্তু রাষ্ট্র কেন মাজার ও দরবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারলো না, এই প্রশ্নটি করতে হবে।”

অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন লতিফী বলেন, “বাংলাদেশে মাজার সংস্কৃতির ওপর যে হামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকেও আঘাত করেছে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন।”

আইনজীবী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মানজুর আল মতিন বলেন, “কোর‌আন এত সুন্দর, নির্মল ও পবিত্র, অথচ কোরআনের নাম ব্যবহার করে অনেকে মাজার-দরবারে হামলা চালাচ্ছেন। একজন মুসলমান হিসেবে এটা সহ্য করা খুবই কষ্টের। এই সহিংসতার ফলে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই বিপর্যয় রোধ করা না গেলে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।”

গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “সুফি সমাজ নিজেদেরকে মূলধারায় যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেনি। মূলধারার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাদের যথেষ্ট অংশ থাকলেও, সেই অংশ তারা বুঝে নিতে পারেনি। কেন এই অক্ষমতা, তা মাজার ও দরবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি, কোনো যুক্তি দিয়েই সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”

সুফি সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এই সংলাপে উপস্থিত ছিলেন মাইজভাণ্ডার দরবার‌ শরীফের রহমানিয়া ম‌ঈনিয়া মঞ্জিলের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আসলাম হোসেন, অলিতলা দরবার শরীফের পীর মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন লতিফী, নলতা দরবার শরীফের শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী, ফরাজিকান্দী দরবার শরীফের মাসুক আহমেদ, গাজীপুরী দরবার শরীফের সৈয়দ মুহা. রবিউল ইসলাম, ফরিদপুরের পীর আবদুল ওয়াহেদ, দরবারে চাঁদপুরের গোলাম জিলানী, মুর্শিদপুর দরবারের মাওলানা মতিউর রহমান, আহলা দরবার শরীফের মো. মোখলেছুর রহমান, হাকিমাবাদ দরবারের মোহাম্মদ সফিউল আজম, কামারডাঙ্গী দরবার শরীফের খলিফা মো. মাহমুদুল হুদা খান, খানকায়ে এমাদিয়া কারান্দারিয়ার মাওলানা হায়দার আলী এমাদী আল কাদেরী, আশেকানে মদিনা দরবারের পীর মুফতি আবদুস সাত্তার কাদেরী, হোমনা সুফি দরবার শরীফের খন্দকার মহিউদ্দিন সুফি এবং বাগমারী হাদি আমানুল্লাহ দরগাহ শরীফের মাওলানা আবদুস সালামসহ আরও অনেকে।