ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকলেও ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। একদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও বরাদ্দ থাকলেও, অন্যদিকে সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ ‘নোট’-এ সিসিটিভি কিনতে নিষেধ করায় জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সরকারি এই পরিকল্পনা এখন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার উপক্রম হয়েছে।
নির্বাচনি সহিংসতা রোধে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। অনেক জরাজীর্ণ ভোটকেন্দ্রে আগের আমলের অচল ক্যামেরা ঝুলে থাকলেও নতুন কোনো নির্দেশনা না আসায় সেগুলো সচল করার কোনো উদ্যোগ নেই। উপদেষ্টা পর্যায়ের ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সরকারি কেনাকাটা বা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সিসিটিভি সংগ্রহ করতে গেলে অন্তত ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগবে। ফলে এখন স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ক্যামেরাগুলো সচল বা স্থাপন করার বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।
নির্দেশনার মারপ্যাঁচ ও কর্মকর্তাদের বিভ্রান্তি
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে পাঠানো বার্তায় ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি সংযোজন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এমনকি কেন্দ্র সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। তবে কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন যে, বরাদ্দের অর্থের সাথে দেওয়া নোটে স্পষ্টভাবে লেখা আছে ‘সিসি ক্যামেরার জন্য টাকা খরচ করা যাবে না’। এই পরস্পরবিরোধী নির্দেশনার ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঠিক কী করবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না। অনেক জায়গায় প্রধান শিক্ষকরা নিজেদের স্কুলের জমানো ফান্ড ব্যবহার করে তড়িঘড়ি করে সিসিটিভি লাগানোর কথা ভাবলেও কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকায় তাঁরাও হাত গুটিয়ে বসে আছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার কেন্দ্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব কেন্দ্রের অধিকাংশই সীমান্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং রাজনৈতিক সংঘাতপ্রবণ স্থানে অবস্থিত। এছাড়া আরও ১৬ হাজার কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘হলুদ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মতো একটি সহজলভ্য ও কার্যকর নজরদারি যন্ত্র স্থাপনে এমন অব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সিসিটিভি না থাকলে ভোট ডাকাত বা কেন্দ্র দখলকারীদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও সিসিটিভি পরিসংখ্যান ২০২৬
| কেন্দ্রের শ্রেণি | সংখ্যা (প্রায়) | সিসিটিভির বর্তমান অবস্থা |
| অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) | ৯,০০০টি | অধিকাংশ কেন্দ্রে ক্যামেরা নেই বা অচল। |
| ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ) | ১৬,০০০টি | স্থাপনের জন্য সরকারি কেনাকাটায় জটিলতা। |
| সাধারণ (সবুজ) | ১৭,৭৬১টি | স্থানীয় ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীলতা। |
| মোট ভোটকেন্দ্র | ৪২,৭৬১টি | সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ৩-৬ মাস সময় প্রয়োজন। |
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেলেও সিসিটিভির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কেনাকাটা ও নীতিমালার ক্ষেত্রে এই ঘাটতি প্রশাসনের অদক্ষতাকেই প্রমাণ করে। যদি নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখল বা কারচুপির মতো ঘটনা ঘটে এবং ক্যামেরার অভাবে তা প্রমাণ করা না যায়, তবে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। সরকার এখন অন্তত ৯০ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের বিকল্প উৎসগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করছে, তবে শেষ মুহূর্তে তা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























