ঢাকা ১০:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: গৌরব ও আস্থার অনন্য উপাখ্যান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪৬:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’— এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ কেবল দেশের সীমান্ত রক্ষায় নয়, বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এক অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাহিনীর জন্ম, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহসিকতা, পেশাদারত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের ৭টি ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বাংলাদেশের ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষণ দলে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ চার দশকের এক গৌরবময় ইতিহাস। এ পর্যন্ত ৪০টি দেশের ৫৬টি মিশনে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে ৩ হাজার ৪০ জনেরও বেশি নারী সদস্য তাঁদের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ। রাজেন্দ্রপুরের ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং’ (বিপসট) থেকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তবেই সদস্যরা মিশনে যোগ দেন। কঙ্গো, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং দক্ষিণ সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিবেশে তাঁরা শুধু অস্ত্র হাতে নিরাপত্তা দেন না, বরং মাইন অপসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবন রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার এই কন্টকাকীর্ণ পথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে চরম আত্মত্যাগও করতে হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬৮ জন বীর শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির বেদীতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ২০০৩ সালে বেনিনে বিমান দুর্ঘটনা কিংবা ২০০৫ সালে কঙ্গোতে ৯ জন শান্তিরক্ষীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা দেশের মানুষের হৃদয়ে আজও ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও দমে না গিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যা অনেক দেশে ‘সিমিক’ (Civil-Military Co-operation) কার্যক্রমের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময় ‘ইউএন মেডেল’, ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’ এবং ফোর্স কমান্ডারের প্রশংসাপত্রে ভূষিত করা হয়েছে। ২০০৪ সালে বিবিসি এই বাহিনীকে শান্তিরক্ষা মিশনের ‘মজ্জা’ বা মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছিল। সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব আজ বিশ্বশান্তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজেদের দক্ষতা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত এক আস্থার প্রতীক।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: গৌরব ও আস্থার অনন্য উপাখ্যান

আপডেট সময় : ০১:৪৬:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’— এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ কেবল দেশের সীমান্ত রক্ষায় নয়, বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এক অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাহিনীর জন্ম, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহসিকতা, পেশাদারত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের ৭টি ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বাংলাদেশের ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষণ দলে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ চার দশকের এক গৌরবময় ইতিহাস। এ পর্যন্ত ৪০টি দেশের ৫৬টি মিশনে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে ৩ হাজার ৪০ জনেরও বেশি নারী সদস্য তাঁদের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ। রাজেন্দ্রপুরের ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং’ (বিপসট) থেকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তবেই সদস্যরা মিশনে যোগ দেন। কঙ্গো, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং দক্ষিণ সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিবেশে তাঁরা শুধু অস্ত্র হাতে নিরাপত্তা দেন না, বরং মাইন অপসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবন রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার এই কন্টকাকীর্ণ পথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে চরম আত্মত্যাগও করতে হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬৮ জন বীর শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির বেদীতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ২০০৩ সালে বেনিনে বিমান দুর্ঘটনা কিংবা ২০০৫ সালে কঙ্গোতে ৯ জন শান্তিরক্ষীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা দেশের মানুষের হৃদয়ে আজও ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও দমে না গিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যা অনেক দেশে ‘সিমিক’ (Civil-Military Co-operation) কার্যক্রমের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময় ‘ইউএন মেডেল’, ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’ এবং ফোর্স কমান্ডারের প্রশংসাপত্রে ভূষিত করা হয়েছে। ২০০৪ সালে বিবিসি এই বাহিনীকে শান্তিরক্ষা মিশনের ‘মজ্জা’ বা মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছিল। সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব আজ বিশ্বশান্তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজেদের দক্ষতা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত এক আস্থার প্রতীক।