আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা অন্তত চারটি স্পষ্ট ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সংগঠনটির বহু নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তাদের অনুসারীরাও নিজ নিজ দলের হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এমনকি প্রার্থী না হয়েও হেফাজতে ইসলামের আমির ও মহাসচিবসহ অনেক শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা কওমি অঙ্গনে ব্যাপক অস্বস্তি ও জটিলতা তৈরি করেছে।
২০১০ সালে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার লক্ষ্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও কওমি মাদরাসা বোর্ড-বেফাকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মরহুম শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, এর বিভিন্ন শীর্ষ পদে থাকা ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে বরাবরই পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে বিভেদ ও নতুন বলয় সৃষ্টি হয়েছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় তাদের কোনো নির্বাচনি তৎপরতা নেই। তবে প্রত্যেকে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। হেফাজতের আমির মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ অনেক নেতার জামায়াতবিরোধী অবস্থান ও বিতর্কিত বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা কোনো রাজনীতিতে জড়িত নন। জাতির অভিভাবক ও দেশের আলেম সমাজের মুরব্বি হিসেবে তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের মধ্যে যে চারটি ধারা স্পষ্ট, সেগুলো হলো:
প্রথমত, বিএনপি জোটের সমর্থক ধারা। হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সংশ্লিষ্ট জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুটি অংশই বিএনপি জোটে যুক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে হেফাজতের ঢাকা মহানগর সভাপতি ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব এবং যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী অন্যতম। তাদের অনুসারী হেফাজতসংশ্লিষ্ট সারা দেশের নেতাকর্মীরা তাই বিএনপি জোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, জামায়াতে ইসলামীর জোটের সমর্থক ধারা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি জোটে যুক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে হেফাজতের নায়েবে আমির ও খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অন্যতম। তাদের অনুসারীদের সবাই জামায়াত জোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
তৃতীয়ত, জামায়াতবিরোধী অবস্থানে থাকা ধারা। হেফাজতে ইসলামের আমির ও মহাসচিবসহ অনেক শীর্ষ নেতা সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও, তারা মূলত জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা ও সমালোচনায় সরব। সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে হেফাজত আমির মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতকে ‘ইসলামী দল নয়’ উল্লেখ করে তাদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। যদিও সংগঠনটির নেতারা এসব বক্তব্যকে আমিরের ব্যক্তিগত বক্তব্য বলে দাবি করেছেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে হেফাজত আমিরের বক্তব্যকে ‘অসত্য ও মনগড়া’ আখ্যা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি, সম্প্রতি ১০১ আলেমের নামে প্রকাশিত একটি জামায়াতবিরোধী বিবৃতি নিয়েও তোলপাড় সৃষ্টি হয়, যেখানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন দাবি করেন যে তারা এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেননি, যা ‘প্রতারণার’ অভিযোগের জন্ম দেয়।
চতুর্থত, নীরব ও নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা ধারা। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট বিশাল একটি অংশ কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। তাদের কিছু অংশ জামায়াতবিরোধী অবস্থানে থাকলেও, অধিকাংশ অনুসারীই প্রকাশ্যে তেমন কোনো মতপ্রকাশ করেন না। আসন্ন নির্বাচন ঘিরেও তারা অনেকটা নীরব অবস্থানে রয়েছেন এবং সাধারণত সংশ্লিষ্ট কওমি মাদরাসার মুহতামিম, শিক্ষক ও মুরব্বিদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানান, তার জানামতে নির্বাচন নিয়ে হেফাজতে ইসলাম সাংগঠনিকভাবে কোনো পক্ষে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে হেফাজতে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা আছেন, তাদের অনুসারীরা সংশ্লিষ্ট পক্ষে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, হেফাজতের আমির ও মহাসচিব পরোক্ষভাবে কোনো পক্ষ নিতে পারেন, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিকভাবে এ ধরনের পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর হেফাজতে ইসলাম ব্যাপক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। পরবর্তীতে, কওমি সনদের স্বীকৃতি আদায়ের স্বার্থে আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়ায় হেফাজত নেতারা সমালোচিত হন। ওই সমাবেশ ঘিরে সংগঠনটির অভ্যন্তরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয় এবং মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির নূর হুসাইন কাসেমীসহ অনেক শীর্ষ নেতা এতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যা পরবর্তীতে হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। এসব ঘটনা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিভেদের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট চারমুখী বিভাজন কওমি অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















