সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের ফসল হওয়ায় এবং সংস্কারের অঙ্গীকারবদ্ধ থাকায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, যা তাদের সংস্কারের প্রতিশ্রুতিরই অংশ।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর নগরীর আরডিআরএস বাংলাদেশ ভবনের বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহার’ শীর্ষক এক বিভাগীয় সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বদিউল আলম মজুমদার জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দিষ্ট আইন ও কাঠামো ছিল, তাদের মেয়াদ ছিল তিন মাস এবং তারা নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না। তাদের একমাত্র কাজ ছিল নির্বাচন সম্পন্ন করা। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার—এই তিনটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।
তিনি সংবিধান সংশোধনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সুজন সম্পাদক বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়ে সংবিধানের পরিবর্তন হলেও তা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেবে না। এর জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন অপরিহার্য। সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এই মূল্যবোধ প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের প্রার্থীরা সদাচরণ করবে, সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন করবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় এলেও, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে স্বৈরাচারী কাঠামো ব্যবহার করে ‘দানবে’ পরিণত হয়েছেন। এই স্বৈরাচারী কাঠামো বজায় থাকলে ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদেরও স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলেও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো মৌলিক আকাঙ্ক্ষাগুলো অপূর্ণ রয়ে গেছে। নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখা এবং সম্প্রতি ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর আকাঙ্ক্ষাও বেহাত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যে লক্ষ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন, জুলাইযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছেন সেটি যেন ব্যর্থ না হয়, তা নিশ্চিত করা সকলের দায়-দায়িত্ব।
সুজন সম্পাদক নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমকে পুরোপুরি সন্তোষজনক না বললেও আশা প্রকাশ করেন যে, কমিশন নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে, কারণ এটি কোনো দল দ্বারা নির্বাচিত হয়নি। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল একটি সূচনা মাত্র; গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং উত্তরণের জন্য ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে আইন সংস্কার, নির্বাচনি অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করা, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে কলুষতা দূর করা, টাকার খেলা বন্ধ করা, নাগরিক ও গণমাধ্যমকে তাদের নজরদারির ভূমিকা পালন করা এবং নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা। একই সাথে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার প্রয়োজন, যা সবার জন্য সমতল ভোটের মাঠ নিশ্চিত করবে।
সংলাপে রংপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবার রহমান বেলাল, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী তৌহিদুর রহমান মন্ডল, বাসদের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বাবলু, আইনজীবী মাহে আলম, জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন, মহানগরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হায়দার স্বাধীন, নারী সংগঠক মঞ্জুশ্রী সাহা, সাংবাদিক ফরহাদুজ্জামান ফারুক ও জাহানুর রহমান খোকনসহ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। জেলা সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জুর সভাপতিত্বে এবং মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবাইদুল ইসলাম বুলেটের সঞ্চলনায় রংপুর বিভাগের ৮ জেলার সংসদ সদস্য প্রার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সুজনের সংগঠক ও গণমাধ্যম কর্মীরা সংস্কার বিষয়ক বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।
রিপোর্টারের নাম 























