গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০১২ ও ২০১৩ সালে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এক সুসংগঠিত ও লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন সময়ে এলিট ফোর্স র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যাটালিয়ন পরিকল্পিতভাবে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে হত্যার পর লাশ গুম করত। বিশেষ করে, লাশ যেন ভেসে না ওঠে সেজন্য পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো নৃশংস পদ্ধতি অবলম্বনের প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকা থেকে বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আটজনকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতাকর্মীকেও গুম করা হয়। এসব ঘটনায় র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং র্যাব-১-এর সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের কমান্ড পজিশনের দায় চিহ্নিত করেছে কমিশন।
কমিশনের কাছে দেওয়া একজন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তার সাক্ষ্যে ‘গলফ অপারেশন’ নামক এক ভয়াবহ অভিযানের তথ্য উঠে এসেছে। ওই কর্মকর্তা জানান, তৎকালীন র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের সরাসরি পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এই অপারেশন পরিচালিত হতো। ‘গলফ অপারেশন’ বলতে মূলত নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে গুলি করে হত্যা করা বোঝাত। সাক্ষ্য অনুযায়ী, একটি অভিযানে চারজন ব্যক্তিকে গুলি করার পর তাদের পেট কেটে এবং সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীর মোহনায় ফেলে দেওয়া হয়। ওই কর্মকর্তা নিজে সেই নৃশংস ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলে কমিশনকে নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের তালিকায় তৎকালীন র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান ছাড়াও রয়েছেন র্যাব-১–এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিসমত হায়াত, গোয়েন্দা শাখার মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল-আমিন নূর, তৎকালীন মেজর আবদুল্লাহ আল মোমেন এবং ক্যাপ্টেন এইচ এম সেলিমুজ্জামান। এ ছাড়া র্যাব-৭–এর তৎকালীন অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এবং টিএফআইয়ের তৎকালীন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহীন আজাদের নামও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কমান্ড পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এআইজি মো. মোখলেসুর রহমান এবং এডিজি (অপারেশনস) কর্নেল মজিবুর রহমানের ওপর দায়ভার অর্পণ করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সরকারি নথি ধ্বংস করা এবং ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের চূড়ান্ত পরিণতি জানা সম্ভব হয়নি। তবে কমিশনের কাছে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিসমত হায়াত স্বীকার করেছেন যে, সাজেদুল ইসলাম সুমনের ঘটনার সময় তিনি একটি টহল দল পাঠিয়েছিলেন, যদিও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং ২০১৩ সালের এপ্রিলে শিবিরের সদস্য হাফেজ জাকির হোসেনের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের পেছনেও র্যাবের একই ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল। হাফেজ জাকিরকে তুলে নেওয়ার অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা পরবর্তীতে দায় অস্বীকার করলেও কমিশনের তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।
কমিশন তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, এই তদন্তে এটি সুস্পষ্ট যে, র্যাব ইন্টেলিজেন্স ও সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এসব গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকের পরবর্তী পরিণতি আজও অজানা থাকলেও, বারবার একই কায়দায় লাশ নদীতে ফেলার ধরন থেকে একটি ভয়াবহ অপরাধমূলক কাঠামোর চিত্র ফুটে উঠেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























