ঢাকা ১১:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার উচ্ছেদ: নেপথ্যের কুশীলব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ব্যবচ্ছেদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৮:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও বেদনাদায়ক অধ্যায় রচিত হয়েছিল। ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের যে বাড়িতে দীর্ঘ ৪০ বছর কাটিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সেখান থেকে তাকে অত্যন্ত অমর্যাদাকরভাবে উচ্ছেদ করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

সেই সময়ের ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের সময় এক সেনা কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার শয়নকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বেরিয়ে আসার জন্য চরম আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অশ্রুসিক্ত চোখে খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, এটি তার ঘর এবং তাকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক কাপড়ে তাকে প্রিয় বাসভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় উঠে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দেশবাসীর কাছে এই অন্যায়ের বিচার চান।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, খালেদা জিয়াকে এই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছিল। এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নিজেই বিভিন্ন জনসভায় স্বীকার করেছিলেন যে, ২১ আগস্টের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তিনি খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেছেন। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে আইনি রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ কোনো শুনানি ছাড়াই একতরফাভাবে উচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছিল। এ ছাড়া তৎকালীন বিচারপতি এস কে সিনহা, মোজাম্মেল হক ও নাজমুন আরা সুলতানার ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যেও একটি অংশ এই অভিযানে সরাসরি জড়িত ছিল। শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক পুরো অভিযানের ছক তৈরি করেন। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল মুবীন এই উচ্ছেদ অভিযানে সেনাবাহিনীর ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়া যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর এবং এডিজি মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ মাঠপর্যায়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম তদারকি করেন। অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান।

উচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে গণমাধ্যমকে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তৎকালীন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের জড়ো করে উচ্ছেদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। সাংবাদিক জ ই মামুন উচ্ছেদের পর বাড়ি থেকে মদ উদ্ধারের মতো সাজানো ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রচার করে প্রোপাগান্ডা তৈরি করেন। পাশাপাশি সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর বিভিন্ন কলামের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালান।

মঈনুল রোডের এই বাড়িটি ছিল জিয়া পরিবারের আবেগ ও ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭২ সাল থেকে জিয়াউর রহমান এখানে বসবাস শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তার শাহাদতের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে নামমাত্র খাজনায় বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মন্ত্রিসভার এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই ইজারা বাতিল করে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সুযোগ না দিয়ে এবং মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে পরিচালিত এই উচ্ছেদ অভিযানটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের হুমকির মুখেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মৈত্রীর বার্তা জার্মান চ্যান্সেলরের

মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার উচ্ছেদ: নেপথ্যের কুশীলব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ব্যবচ্ছেদ

আপডেট সময় : ০৯:৪৮:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও বেদনাদায়ক অধ্যায় রচিত হয়েছিল। ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের যে বাড়িতে দীর্ঘ ৪০ বছর কাটিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সেখান থেকে তাকে অত্যন্ত অমর্যাদাকরভাবে উচ্ছেদ করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

সেই সময়ের ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের সময় এক সেনা কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার শয়নকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বেরিয়ে আসার জন্য চরম আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অশ্রুসিক্ত চোখে খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, এটি তার ঘর এবং তাকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক কাপড়ে তাকে প্রিয় বাসভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় উঠে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দেশবাসীর কাছে এই অন্যায়ের বিচার চান।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, খালেদা জিয়াকে এই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছিল। এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নিজেই বিভিন্ন জনসভায় স্বীকার করেছিলেন যে, ২১ আগস্টের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তিনি খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেছেন। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে আইনি রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ কোনো শুনানি ছাড়াই একতরফাভাবে উচ্ছেদের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছিল। এ ছাড়া তৎকালীন বিচারপতি এস কে সিনহা, মোজাম্মেল হক ও নাজমুন আরা সুলতানার ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যেও একটি অংশ এই অভিযানে সরাসরি জড়িত ছিল। শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক পুরো অভিযানের ছক তৈরি করেন। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল মুবীন এই উচ্ছেদ অভিযানে সেনাবাহিনীর ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়া যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর এবং এডিজি মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ মাঠপর্যায়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম তদারকি করেন। অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান।

উচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে গণমাধ্যমকে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তৎকালীন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের জড়ো করে উচ্ছেদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। সাংবাদিক জ ই মামুন উচ্ছেদের পর বাড়ি থেকে মদ উদ্ধারের মতো সাজানো ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রচার করে প্রোপাগান্ডা তৈরি করেন। পাশাপাশি সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর বিভিন্ন কলামের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালান।

মঈনুল রোডের এই বাড়িটি ছিল জিয়া পরিবারের আবেগ ও ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭২ সাল থেকে জিয়াউর রহমান এখানে বসবাস শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তার শাহাদতের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে নামমাত্র খাজনায় বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মন্ত্রিসভার এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই ইজারা বাতিল করে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সুযোগ না দিয়ে এবং মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে পরিচালিত এই উচ্ছেদ অভিযানটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।