পৌষের বিদায় আর মাঘের আগমনে প্রকৃতিতে যখন শীতের তীব্রতা, ঠিক তখনই শরীয়তপুরের মনোহর বাজার এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে সদর উপজেলার মধ্যপাড়া কালি মন্দির সংলগ্ন মাঠ। উপলক্ষ—দুইশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ‘জোড় মাছের মেলা’। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু পাল্টালেও এই জনপদের মানুষের কাছে মেলার আবেদন আজও অম্লান।
প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিনে আয়োজিত এই মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘জোড়া’ মিলিয়ে কেনাকাটা। লোকজ বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের রীতি মেনে মেলায় আসা ক্রেতারা এক জোড়া ইলিশ ও এক জোড়া বেগুন কিনে হাসিমুখে ঘরে ফেরেন। এই অনন্য প্রথার কারণেই মেলাটি স্থানীয়দের কাছে ‘জোড় মাছের মেলা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এক সময় এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক আচারকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও বর্তমানে তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আয়োজন।
সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই শত শত মাছ ব্যবসায়ী তাদের ডালায় রূপালি ইলিশের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। কনকনে শীত উপেক্ষা করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের হাঁকডাকে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কেবল মাছই নয়, মেলাজুড়ে বসেছে হরেক রকমের সবজি, বাহারি খেলনা, মাটির তৈজসপত্র এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও খাবারের দোকান। বিশেষ করে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো; রঙিন বেলুন আর বাঁশির শব্দে মেলা প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণবন্ত।
মেলায় আসা প্রবীণ দর্শনার্থীরা জানান, এই মেলা তাদের শেকড়ের টান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানে আসছেন। শৈশবে বাবার হাত ধরে আসা মানুষগুলো এখন আসছেন নিজের সন্তানদের নিয়ে। যদিও এ বছর ইলিশের দাম কিছুটা চড়া, তবুও ঐতিহ্যের খাতিরে কেনাকাটায় কমতি নেই কারো। ক্রেতাদের মতে, দাম যাই হোক না কেন, বছরের এই দিনে জোড়া ইলিশ কেনাটা তাদের পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়িক দিক থেকেও এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই আয়োজনে কয়েক কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। বংশপরম্পরায় এখানে মাছ বিক্রি করছেন এমন অনেক ব্যবসায়ী জানান, ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা এই মেলায় গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি হয়। স্বল্প সময়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই শতাব্দীর এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং শরীয়তপুরবাসীর আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আগামীতেও এই সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় রেখে মেলার জৌলুস ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মনোহর বাজারের এই জোড় মাছের মেলা তাই আজও টিকে আছে তার নিজস্ব মহিমায়, যা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির কথা।
রিপোর্টারের নাম 






















