ঢাকায় দুই দিনের সফরে এসেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি পল কাপুর। দুই দিন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ছাড়াও রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এসব বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্যচুক্তি, অবৈধ অভিবাসন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ যেন বাণিজ্যচুক্তি যথাযথভাবে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের সে দেশের আদালতে মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে যেন ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে উভয় বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশ।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধির চেষ্টা করবে বাংলাদেশ। বেসরকারি পর্যায়েও তা কেনা হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৫ বছরে জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরে এক বিলিয়ন ডলারের এলএনজি কিনতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। একইসঙ্গে খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে—প্রতিবছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।
চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। তবে কোন কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। যদিও চুক্তিতে এটাও উল্লেখ আছে যে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সুবিন্যস্ত ও সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘শুল্ক ফাঁকি সহযোগিতা চুক্তি’ করবে।
বাংলাদেশ ‘অ-বাজার’ অর্থনীতির দেশের সঙ্গে (চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, বেলারুশ এবং মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ) নতুন দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে প্রবেশ করে এই চুক্তিকে অগ্রাহ্য করলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি আলোচনা সাপেক্ষে বাতিল করতে পারে, যদি বাংলাদেশ এই সংকটের সমাধান না করে। এতে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ঘোষিত ট্যারিফ পুনর্বহাল করা হবে।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন চায়, যদিও রিভিউ করার সুযোগ আছে। তবে সংসদ ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা যাবে না। সংসদ চুক্তির পর্যালোচনা, প্রশ্ন উত্থাপন এবং মতামত দিতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকে। শুধু জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত চুক্তিগুলো সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনও বাঁধা ছাড়াই এটি পাস হোক।
বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বুধবার (৪ মার্চ) জানিয়েছেন, মার্কিন চুক্তিতে একটা এন্ট্রি ক্লজ এবং এক্সিট ক্লজ আছে। এন্ট্রি ক্লজ হলো—নোটিফিকেশন না হলে এটা কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, এখনও নোটিফিকেশনে যাইনি। সরকার ইচ্ছা করলে রিভিউ করতে পারে। আর এক্সিট ক্লস হলো—৬০ দিনের আপনি নোটিশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। এমন না যে আমরা একটা বন্ধ ঘরে বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত নিয়ে আসার বিষয়ে জোর দিয়েছে। বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেন পল কাপুর। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাতে চায়। ট্রাম্পের নতুন অভিবাসননীতির ফলে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৩২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে সে দেশ থেকে ফেরত পাঠিয়েছে। তারা অনেকেই হাতে-পায়ে শেকল বাঁধা অবস্থায় সামরিক বিমানে করে দেশে এসেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে এবং মর্যাদাহানি না হয়—সেই বিষয়ে আশ্বাস চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি, যারা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের ফিরিরে আনার ব্যাপারেও কথা বলেছি। প্রসেসটা যাতে সহজ হয় এবং সম্মানের সঙ্গে তারা আসতে পারেন, তা নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’’
রিপোর্টারের নাম 






















