ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

উখিয়ায় কাস্টমস চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি: সিন্ডিকেটের কবলে ব্যবসায়ীরা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ মহাসড়কের বালুখালী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন শতাধিক গাড়ি থেকে অবৈধভাবে এই চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী চালক ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন।

সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বালুখালী কাস্টমস চেকপোস্টের সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে এই চাঁদাবাজি চালানো হয়। বাঁশ, লবণ, কাঠ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরবরাহকৃত পণ্যবাহী ট্রাকসহ সব ধরনের ছোট-বড় যানবাহন এই চক্রের লক্ষ্যবস্তু। এমনকি দেশের নামী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানও এই হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, চেকপোস্টের সামনে কম্বল দিয়ে আড়াল তৈরি করে লোকচক্ষুর অন্তরালে চালকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। কোনো চালক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে, আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে গাড়ি আটকে রেখে দীর্ঘক্ষণ ভোগান্তিতে ফেলা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলাল ও সিপাহি শামসুরকে কেন্দ্র করে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পণ্যবাহী গাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি যানবাহন থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, চট্টগ্রাম থেকে আসা মালবাহী কাভার্ড ভ্যান ও মিনি ট্রাক থামিয়ে চালকদের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং টাকা আদায়ের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্য ধারণ করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালাতে স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রকেও ম্যানেজ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুল্ক আইন-২০২৩ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমস চেকপোস্টে নগদ অর্থ গ্রহণের কোনো বিধান নেই। সকল প্রকার শুল্ক ও ভ্যাট ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করার কথা থাকলেও বালুখালীতে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিস্কুট ডিলার আরিফ ও ট্রাক চালক শাহ কামালসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, চেকপোস্ট পার হতে গেলেই ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিতে তারা বাধ্য হন। প্রতিবাদ করলে নথিপত্র তল্লাশির নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।

চাঁদাবাজির পাশাপাশি জব্দকৃত মালামাল নিলামেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী নিলামের আগে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মাইকিং করার কথা থাকলেও, একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে গোপনে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় জব্দ হওয়া অনেক মূল্যবান যানবাহন খোলা আকাশের নিচে অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বালুখালী কাস্টমস চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলাল জানান, তার দপ্তরে কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই এবং তিনি এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন। নিলাম প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তবে সরেজমিনে দেখা চিত্র এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই চেকপোস্টে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুই ইস্যুতে নিশ্চয়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র

উখিয়ায় কাস্টমস চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি: সিন্ডিকেটের কবলে ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় : ১১:৪১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ মহাসড়কের বালুখালী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন শতাধিক গাড়ি থেকে অবৈধভাবে এই চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী চালক ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন।

সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বালুখালী কাস্টমস চেকপোস্টের সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে এই চাঁদাবাজি চালানো হয়। বাঁশ, লবণ, কাঠ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরবরাহকৃত পণ্যবাহী ট্রাকসহ সব ধরনের ছোট-বড় যানবাহন এই চক্রের লক্ষ্যবস্তু। এমনকি দেশের নামী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানও এই হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, চেকপোস্টের সামনে কম্বল দিয়ে আড়াল তৈরি করে লোকচক্ষুর অন্তরালে চালকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। কোনো চালক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে, আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে গাড়ি আটকে রেখে দীর্ঘক্ষণ ভোগান্তিতে ফেলা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলাল ও সিপাহি শামসুরকে কেন্দ্র করে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পণ্যবাহী গাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি যানবাহন থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, চট্টগ্রাম থেকে আসা মালবাহী কাভার্ড ভ্যান ও মিনি ট্রাক থামিয়ে চালকদের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং টাকা আদায়ের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্য ধারণ করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালাতে স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রকেও ম্যানেজ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুল্ক আইন-২০২৩ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমস চেকপোস্টে নগদ অর্থ গ্রহণের কোনো বিধান নেই। সকল প্রকার শুল্ক ও ভ্যাট ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করার কথা থাকলেও বালুখালীতে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিস্কুট ডিলার আরিফ ও ট্রাক চালক শাহ কামালসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, চেকপোস্ট পার হতে গেলেই ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিতে তারা বাধ্য হন। প্রতিবাদ করলে নথিপত্র তল্লাশির নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।

চাঁদাবাজির পাশাপাশি জব্দকৃত মালামাল নিলামেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী নিলামের আগে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মাইকিং করার কথা থাকলেও, একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে গোপনে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় জব্দ হওয়া অনেক মূল্যবান যানবাহন খোলা আকাশের নিচে অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বালুখালী কাস্টমস চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলাল জানান, তার দপ্তরে কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই এবং তিনি এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন। নিলাম প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তবে সরেজমিনে দেখা চিত্র এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই চেকপোস্টে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।