বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনি সংস্কৃতির এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও গ্রামীণ জনপদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাপকাঠি ছিল সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। সে সময় যোগ্য ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী হতে অনীহা প্রকাশ করতেন, আর সাধারণ মানুষ দলবেঁধে গিয়ে তাদের অনুরোধ করে নির্বাচনে আনতেন। এটি ছিল একটি সম্মিলিত সামাজিক সম্মতির প্রতিফলন। কিন্তু কালক্রমে সেই সুস্থ ধারা বিলুপ্ত হয়ে সেখানে স্থান করে নিয়েছে অর্থ ও পেশিশক্তির দাপট। ভোটের বিনিময়ে একসময় যেখানে ‘পান-তামাক’ আপ্যায়নের রেওয়াজ ছিল, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ। ফলে ভোটারের সম্মানের চেয়ে টাকার প্রভাবই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মানেই শতকোটি টাকার বিনিয়োগ। দলীয় মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রচার-প্রচারণা—সবকিছুই এখন অর্থবিত্তের ওপর নির্ভরশীল। যার যত বেশি সম্পদ, নির্বাচনি বাজারে তিনি তত বেশি প্রভাবশালী। এই ‘মোটাতাজাকরণ’ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনি ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলেও সাধারণ ভোটাররা ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। মূলত ঔপনিবেশিক আমল থেকেই একটি বিশেষ শ্রেণিকে ক্ষমতায় বসানোর উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছিল, যা আজ বিশ্বজুড়ে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত ‘জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা’ শাসনব্যবস্থার ধারণা এখন কেবল কিতাববন্দি তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সংজ্ঞা ও নির্বাচন নিয়ে দার্শনিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল সরাসরি গণতন্ত্রের পক্ষে থাকলেও তার গুরু প্লেটো ছিলেন এর ঘোর বিরোধী। প্লেটোর এই বিরোধিতার মূলে ছিল তার শিক্ষক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড, যা তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কার্যকর করা হয়েছিল। আধুনিক যুগে জন স্টুয়ার্ড মিল প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কথা বললেও তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, নির্বাচন যেন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারে পরিণত না হয়। বর্তমান সময়ে বড় ভ্রান্তিটি হলো—নির্বাচনকেই গণতন্ত্রের সমার্থক মনে করা। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র একটি বিশাল প্যাকেজ, যার মধ্যে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সামাজিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচন এই ব্যবস্থার অসংখ্য উপাদানের মধ্যে মাত্র একটি।
বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে বিগত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর থেকে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিদেশি প্রভাবের গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বা ‘পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ’ বদলে দিয়েছে। এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো ব্যবস্থাই স্থায়ী হতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ নির্ধারণের একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই সময়ে ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা অদৃশ্য শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। যারা জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকে, তাদের প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি প্রকৃত জন-অংশীদারত্বমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই দেশে একদল ‘জরিপকারী’ বা জরিপ প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিগত নির্বাচনগুলোতেও এমন জরিপের নামে জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা দেখা গেছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে কিছু জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে অসংখ্য অসংগতি ধরা পড়ে। কোনো জরিপে দেখা যাচ্ছে অর্ধেক মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, আবার কোনোটিতে নির্দিষ্ট দলের বিশাল জয়ের আগাম বার্তা দেওয়া হচ্ছে। যখন একটি বড় অংশের মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায় বা নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক থাকে, তখন সেই জরিপের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
পরিসংখ্যান নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেলির সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক—তিনি বলেছিলেন, ‘মিথ্যা তিন প্রকার: সাধারণ মিথ্যা, জঘন্য মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান।’ বর্তমান সময়ের অনেক নির্বাচনি জরিপও যেন সেই ‘জঘন্য মিথ্যা’র নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব জরিপ বাণিজ্যের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা বন্ধ হওয়া জরুরি। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন এবং রাহুমুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এই ‘জরিপ বিক্রেতাদের’ হাত থেকে মুক্তি পাওয়া এখন সময়ের দাবি। জনগণের প্রকৃত রায়ই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র মাপকাঠি।
রিপোর্টারের নাম 
























