বিগত বছরের লোকসান এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে চাঁদপুরের হাইমচরে নতুন করে আলু চাষ শুরু করেছেন কৃষকরা। ফলন ভালো হওয়ার আশা থাকলেও, বাজারমূল্য নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এর ওপর শীতের তীব্রতার সঙ্গে নতুন করে দেখা দিয়েছে মড়ক রোগ, যা রোপণ করা আলুর চারা নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের আলুচাষিরা।
হাইমচরের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা তাদের আলু ক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে তাদের চোখে মুখে হাসির চেয়ে দুশ্চিন্তার ছাপই বেশি। পূর্বচর কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক সেলিম জমাদার, যিনি প্রবাস থেকে ফিরে কৃষি কাজ শুরু করেছেন, আক্ষেপ করে বলেন, “নিজের জমি না থাকায় ৪২ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে আলু চাষ করেছি। কয়েক বছরে লাভের মুখ দেখিনি। গত বছর অনেক লোকসান হয়েছে। এবারও যদি ভালো দাম না পাই, তাহলে আর চাষ করব না, হয়তো আবার প্রবাসে ফিরে যাব।”
একই চিত্র দক্ষিণ আলগী গ্রামেও। সেখানকার চাষি সাইফউদ্দিন জানান, গত বছর আলুর দাম এতটাই কম ছিল যে, উৎপাদন খরচও ওঠেনি। ক্ষোভে তিনি তার উৎপাদিত আলু গরুকে খাইয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই লোকসানের ভয়ে এ বছর তিনি আলুর আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাকিল খন্দকার জানান, কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছে এবং বর্তমানে আলুর অবস্থা বেশ ভালো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান শীতের তীব্রতায় আলুতে ‘লেইট ব্লাইট’ বা নাবি ধসা রোগ দেখা দেওয়ার একটি ঝুঁকি থাকে। এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কৃষি অফিস থেকে সতর্কতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, দেশের উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলাতেও আলুচাষিরা একই রকম সংকটে পড়েছেন। টানা তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে জেলার মাঠজুড়ে আলু ক্ষেতে মড়ক রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সেখানকার কৃষকরাও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নীলফামারীতে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষ হয়েছিল। আগাম আলু উত্তোলনের পর বর্তমানে জমিতে যে মৌসুমি আলু (লেইট কামার) আবাদ রয়েছে, সেগুলিতেই মড়ক রোগ আক্রমণ করছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে দেখা যায়, টানা ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে আলু ক্ষেতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে মড়ক রোগ। কৃষকরা জানান, আগাম আলুতে লোকসান হওয়ায় তারা মৌসুমি আলু চাষ ব্যাপক হারে করেছিলেন। কিন্তু তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় আলু ক্ষেতে নাবি ধসা রোগ দেখা দেওয়ায় তারা নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া, তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে প্রথমে আলু গাছের পাতা বাদামি হয়ে কালচে রঙ ধারণ করছে এবং পরবর্তীতে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পুরো ক্ষেত ঝলসে যাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুর রহমান জানান, আলুর নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধে আগে থেকেই কৃষকদের সতর্ক করা হয়েছে। তীব্র শীত ও কুয়াচ্ছন্ন সময়ে ফসল রক্ষায় কৃষকদের আগাম করণীয় ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আলুর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক ওষুধ প্রয়োগে অনীহা দেখাচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রিপোর্টারের নাম 
























