ঢাকা ০৮:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: ঘাতক ফয়সাল ভারতে আত্মগোপনে, অসহযোগিতার অভিযোগে তদন্তে অচলাবস্থা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪২:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসৈনিক ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে মূল ঘাতক ও পরিকল্পনাকারীরা। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রধান অভিযুক্তরা। তবে দুই দেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে কার্যকর সহযোগিতা না পাওয়ায় ঘাতকদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ঘাতক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ বর্তমানে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অবস্থান করছে। সীমান্ত পার হয়ে তারা প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের সেফ হাউসে আশ্রয় নিলেও পরে নিরাপত্তার খাতিরে তাদের মুম্বাইয়ে স্থানান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, মুম্বাইয়ের মতো জনবহুল শহরে পরিচয় গোপন করে আত্মগোপন করা সহজ। অন্যদিকে, ফয়সাল দুবাইয়ে পালিয়েছে বলে যে তথ্য ছড়ানো হয়েছিল, সেটিকে তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়ার একটি পরিকল্পিত গুজব হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) পাঁচজন বাংলাদেশিকে আটক করে, যারা হাদি হত্যার আসামিদের পালাতে এবং লজিস্টিক সহায়তা দিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব এবং যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীসহ বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এই পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করা সহজ হতো। তবে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন থেকে বারবার যোগাযোগ করা হলেও ভারত সরকার আটকদের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি বা হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমআইএলএটি) কাঠামো অনুযায়ী তথ্য বিনিময়ের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, খুনিরা তাদের ভূখণ্ডে নেই। অথচ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে তাদের সহযোগীদের আটক হওয়ার বিষয়টি তদন্তে নতুন মোড় এনেছিল। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের নাগাল না পাওয়া তদন্তের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোয়েন্দা নথির বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাদি হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত কিলিং মিশন। গত ৪ ডিসেম্বর থেকেই ফয়সাল ও তার দল হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ শুরু করে। ঘনিষ্ঠতা তৈরির ছলে তারা হাদির নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেয় এবং বিশ্বস্ততা অর্জন করে। ১২ ডিসেম্বর যখন হাদি মতিঝিল থেকে ফিরছিলেন, তখন তাকে অনুসরণ করা হয় এবং পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ওই রাতেই তারা ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। পুরো প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ‘জাস্টিস ফর হাদি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নেটিজেনরা ভারতের অসহযোগিতার সমালোচনা করছেন। অনেকের মতে, অপরাধীদের বিদেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। বর্তমানে তদন্তকারীরা ঘাতকদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল রেড নোটিস দিয়ে খুনিদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপরাধের প্যাটার্ন। ঘাতকরা যদি ভিনদেশে নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করবে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের সক্রিয় কূটনৈতিক ও আইনি সহযোগিতা ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় সুদের হার অপরিবর্তিত রাখল ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: ঘাতক ফয়সাল ভারতে আত্মগোপনে, অসহযোগিতার অভিযোগে তদন্তে অচলাবস্থা

আপডেট সময় : ০৮:৪২:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসৈনিক ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে মূল ঘাতক ও পরিকল্পনাকারীরা। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রধান অভিযুক্তরা। তবে দুই দেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে কার্যকর সহযোগিতা না পাওয়ায় ঘাতকদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ঘাতক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ বর্তমানে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অবস্থান করছে। সীমান্ত পার হয়ে তারা প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের সেফ হাউসে আশ্রয় নিলেও পরে নিরাপত্তার খাতিরে তাদের মুম্বাইয়ে স্থানান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, মুম্বাইয়ের মতো জনবহুল শহরে পরিচয় গোপন করে আত্মগোপন করা সহজ। অন্যদিকে, ফয়সাল দুবাইয়ে পালিয়েছে বলে যে তথ্য ছড়ানো হয়েছিল, সেটিকে তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়ার একটি পরিকল্পিত গুজব হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) পাঁচজন বাংলাদেশিকে আটক করে, যারা হাদি হত্যার আসামিদের পালাতে এবং লজিস্টিক সহায়তা দিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব এবং যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীসহ বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এই পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করা সহজ হতো। তবে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন থেকে বারবার যোগাযোগ করা হলেও ভারত সরকার আটকদের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি বা হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমআইএলএটি) কাঠামো অনুযায়ী তথ্য বিনিময়ের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, খুনিরা তাদের ভূখণ্ডে নেই। অথচ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে তাদের সহযোগীদের আটক হওয়ার বিষয়টি তদন্তে নতুন মোড় এনেছিল। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের নাগাল না পাওয়া তদন্তের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোয়েন্দা নথির বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাদি হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত কিলিং মিশন। গত ৪ ডিসেম্বর থেকেই ফয়সাল ও তার দল হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ শুরু করে। ঘনিষ্ঠতা তৈরির ছলে তারা হাদির নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেয় এবং বিশ্বস্ততা অর্জন করে। ১২ ডিসেম্বর যখন হাদি মতিঝিল থেকে ফিরছিলেন, তখন তাকে অনুসরণ করা হয় এবং পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ওই রাতেই তারা ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। পুরো প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ‘জাস্টিস ফর হাদি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নেটিজেনরা ভারতের অসহযোগিতার সমালোচনা করছেন। অনেকের মতে, অপরাধীদের বিদেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। বর্তমানে তদন্তকারীরা ঘাতকদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল রেড নোটিস দিয়ে খুনিদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপরাধের প্যাটার্ন। ঘাতকরা যদি ভিনদেশে নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করবে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের সক্রিয় কূটনৈতিক ও আইনি সহযোগিতা ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।