বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদপত্রগুলো বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পাদকীয় নীতি ও সংবাদ উপস্থাপনের ধরনে যে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে, তা সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের এক-এগারো পরবর্তী সময় থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত দেশের প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক পক্ষালম্বন এবং ‘পলিটিক্যাল প্যারালেলিজম’-এর এক নগ্ন চিত্র ফুটে ওঠে।
কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক তাইয়িব আহমেদের মতে, বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো মূলত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা প্রায়ই সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ‘জার্নালিস্টিক পাওয়ার’-এর অপব্যবহার করে।
নিচে কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার অতীত ও বর্তমান ভূমিকার উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
প্রথম আলো: সুপরিকল্পিত বয়ান ও চরিত্র হনন
২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে প্রথম আলো বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডা চালায়। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সততা ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে অসংখ্য সংবাদ ও কলাম প্রকাশ করা হয়।
- সম্পাদকীয় আক্রমণ: ২০০৭ সালের জুনে এক সম্পাদকীয়তে বিএনপিকে ‘দুর্বৃত্তচক্র’ হিসেবে অভিহিত করে খালেদা জিয়ার বিচার দাবি করা হয়।
- ২০১৩-২১ এর কৌশল: এই সময়ে বিএনপিকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও গ্রেনেড হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এমনকি ২০২১ সালেও তারেক রহমানের নেতৃত্বকে ‘দিশাহীন’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়।
ডেইলি স্টার: ‘হাওয়া ভবন’ ষড়যন্ত্র ও কার্টুন বিতর্ক
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ডেইলি স্টার গ্রেনেড হামলা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে একে ‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিএনপিকে সরাসরি দায়ী করা হয়।
- কার্টুন রাজনীতি: ২০১৩ সালে যখন বাস পুড়িয়ে মানুষ হত্যার জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হচ্ছিল, তখন ডেইলি স্টার একটি বিতর্কিত কার্টুন ছাপে। সেখানে দেখানো হয় শেখ হাসিনা জ্বলন্ত বাসের আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন আর খালেদা জিয়া পেট্রলবোমা নিয়ে বসে আছেন।
- ব্যক্তিগত আক্রমণ: তারেক রহমানকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত সন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করে বারবার সম্পাদকীয় নীতিতে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন ও জনকণ্ঠ: ভোলবদলের জীবন্ত দলিল
এই দুটি পত্রিকা শেখ হাসিনার আমলে বিএনপিকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যের কারিগর’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল।
- বাংলাদেশ প্রতিদিন: ২০১৪ সালে তারা খালেদা জিয়াকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিলেও বর্তমানে তাকে ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ ও ‘আপসহীন নারী’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
- জনকণ্ঠ: ২০১৬ সালে তারেক রহমানকে বিডিআর বিদ্রোহের উসকানিদাতা হিসেবে সংবাদ প্রকাশ করলেও এখন তাদের সুর পুরোপুরি বদলে গেছে।
| পত্রিকা | একালের অবস্থান (আওয়ামী লীগ আমল) | সেকালের অবস্থান (বর্তমান/পরিবর্তিত) |
| প্রথম আলো | বিএনপিকে ‘জঙ্গিবাদী’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং | বর্তমান পরিস্থিতিতে নমনীয় ও বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা |
| ডেইলি স্টার | ‘হাওয়া ভবন’ ও ‘জজ মিয়া’ নাটকের নেপথ্য কারিগর হিসেবে আক্রমণ | গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা বলছে |
| বাংলাদেশ প্রতিদিন | খালেদা জিয়াকে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা | ‘আপসহীন নেত্রী’ ও ‘জনগণের ভরসা’ হিসেবে উপস্থাপন |
| জনকণ্ঠ | তারেক রহমানকে বিডিআর বিদ্রোহের কারিগর হিসেবে প্রচার | সম্পাদকীয় নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন |
বিশ্লেষকদের মতে, এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা বদলায়, কিন্তু তাদের কোনো দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নেই। যে গণমাধ্যম একসময় বিরোধী রাজনীতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে দেখিয়েছিল, তারাই আজ একই শক্তিকে ‘গণতন্ত্রের আশা’ হিসেবে হাজির করছে। এই প্রবণতা সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
রিপোর্টারের নাম 
























