ঢাকা ১২:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘নীরব সহিংসতা’ দেখার জন্য যে আয়নাটি ইলিয়াস আমাদের দিয়েছিলেন ।। শেষ পর্ব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৭:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

৮.
কিন্তু ইলিয়াসের ছোটোগল্পে নীরব সহিংসতা ব্যাপারটি কীভাবে ঘটে বা আদৌ কি ঘটে? এই প্রশ্ন উত্থাপিত হলে আমরা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করব, ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলোতে নীরব সহিংসতা আরও তীক্ষ্ণ। কারণ, উপন্যাস যেখানে সময়ের বিস্তারে চাপকে নির্মাণ করে, ছোটোগল্প সেখানে চাপকে একটি প্রাথমিক শর্ত হিসেবে হাজির করে। উপন্যাসে সহিংসতা কখনো কখনো ঘটনার পোশাক পরে মাত্র, যেমন, কারফিউ বা গ্রেফতার বা মিছিল বা বিচারের মাধ্যমে। যদিও ইলিয়াস সেখানেও ঘটনাকে চাপের ভাষায় রূপ দেন; কিন্তু ছোটোগল্পে তিনি প্রায়ই ঘটনার এই আবরণটুকুও খুলে ফেলেন। এখানে নীরব সহিংসতা আর বর্ণনার ভেতরে ঢোকে না। সে বরং বর্ণনার ভেতরের নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই ছোটোগল্পে নীরব সহিংসতা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। কারণ পরিসর ছোট হওয়ায় ব্যাখ্যা কম, অথচ শর্ত বেশি; কারণ চরিত্রকে প্রস্তুতির সময় দেওয়া হয় না; কারণ ভাষা এখানে শুধু অভিব্যক্তি নয়, ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সামাজিক অনুমতি।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পে মানুষ কথা বলে, কিন্তু সেই কথায় ভাষার ওজন থাকে না। ভাষা কেবল এখানে ধ্বনি-উৎপাদনের ব্যাপার নয়, বরং সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থ-উৎপাদনের ব্যাপার। ফলে চরিত্ররা বাক্য বানালেও বাক্য প্রায়ই নিষ্প্রভ: কোথাও ইঙ্গিত, কোথাও থেমে যাওয়া, কোথাও অর্ধেক উচ্চারণ। নীরব সহিংসতা কাজ করে এইখানে—শব্দকে অর্থহীন বা ঝুঁকিপূর্ণ করে দিয়ে। আমরা বলেছি, নীরবতা মানে ‘কিছু না’ নয়; নীরবতা মানে অদৃশ্য নির্দেশ, যে নির্দেশ লিখিত হয় না, তবু মানা হয়। এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্রকৌশল, আইন কম, অভ্যাস বেশি।

ইলিয়াসের গল্পে নীরব সহিংসতার রূপ তাত্ত্বিকভাবে বুঝতে গেলে আমাদের মিশেল ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্বকে ছুঁয়ে যেতে হবে। যদিও এ লেখা ততটা তাত্ত্বিকতাকে আমলে নিতে প্রস্তুত নয়। তবু ইলিয়াসের ছোটোগল্পের রচনাকৌশলের কারণে অংশত ফুকোর কাছে যেতেই হয়। ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা এখন কেবল শাস্তি বা প্রকাশ্য দমন করে না, এটি কাজ করে নজরদারি, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমেও। ক্ষমতা এমনভাবে সমাজে প্রবেশ করে যে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই আধুনিক ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ। ফুকোবাদী ক্ষমতাতত্ত্বের এক সাহিত্যিক রূপ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে সহিংসতা তাই প্রকাশ্য নয়, এটি নীরব, দৈনন্দিন এবং প্রাতিষ্ঠানিক।

আর এই সহিংসতা অনেক সময় ঘটনা হিসেবে নয়, পরিবেশ, বাক্যভঙ্গি, স্থান-ব্যবস্থাপনা, আচরণবিধি, সামাজিক নজরদারি, ও স্বাভাবিকতার ভাষা হয়ে কাজ করে। এখানে সহিংসতা মানে কেবল মারধর বা রক্তপাত নয়; এমন এক ক্ষমতা-প্রক্রিয়া যা মানুষকে চুপ করায়, অপমানকে স্বাভাবিক করে, শরীরকে নিয়ন্ত্রিত করে, এবং ভয়ের আটপৌরেত্ব তৈরি করে।

ফুকো আমাদের জানান, ক্ষমতা কেবল উপরে থেকে নেমে আসে না; তা সমাজের ভেতরকার ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সম্পর্ক, নিয়ম, চাহনি ও অভ্যাসের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকে। ফলে ‘নীরব সহিংসতা’কে আমরা পড়ব (ক) শৃঙ্খলা-ক্ষমতা (discipline) এবং (খ) শাসন-মানসিকতা (governmentality)-এর দৈনন্দিন প্রয়োগ হিসেবে: মানুষ কীভাবে নিজেই নিজেকে সংযত করে, কীভাবে প্রতিবেশী বা গলি বা বাড়ির গেট বা দরজার আড়াল ক্ষমতার যন্ত্র হয়ে ওঠে। ইলিয়াসের গল্পগুলোতেও এ উপাদানসমূহ নীরব সহিংসতার কাঠামো নির্মাণ করে। একটু বিশদে আলোচনার জন্য আমরা তাঁর মাত্র ৪টি গল্প (‘উৎসব’, ‘খোঁয়ারি’, ‘দুধভাতে উৎপাত’ ও ‘দোজখের ওম’)কে উদাহরণ হিসেবে বেছে নেব।

‘উৎসব’ গল্পে উৎসব কোনো মুক্ত আনন্দের ঘটনা নয়। একে বলা যায় শ্রেণি–নিয়ন্ত্রিত একটি সামাজিক পরিসর। গল্পের শুরুতেই আনোয়ার আলির মানসিক অবস্থার সঙ্গে পরিসরের সংঘর্ষ দেখা দেয়। বলা যায়, ‘উৎসব’-এ উৎসব নামটাই একটা বিপরীতার্থক ইঙ্গিত: বাইরে আলো, গান, আয়োজন—ভেতরে বিরক্তি, বর্জন, শ্রেণিচাহনি, এবং নীরব দমন। গল্পের শুরুতেই নগরজীবনের এক পরিচ্ছন্ন ঠিকানার ভেতর ঢোকার মুহূর্তে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটাই নীরব সহিংসতার প্রথম সংকেত: ‘এখন আনোয়ার আলির বেশ মুডে থাকার কথা। এই তো কিছুক্ষণ আগে সে বড়োলোক বন্ধুর বৌ-ভাতের নিমন্ত্রণে ধানমন্ডির মস্ত এক বাড়িতে গিয়েছিল। ভিতর ধানমন্ডির খুব সুসজ্জিত, অভিজাত ও আধুনিক বাড়ি। প্রচুর পরিমাণে ভালো মেয়ে দ্যাখা গেছে, কয়েকজনের সঙ্গে এমনকি আলাপও হলো। সমস্ত বিয়েবাড়ির কুলীন কলরব অন্তত সপ্তাহখানেক সমস্ত শরীরে সুখ উদ্রেক করবে। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা অন্যরকম। ওদের সরু গলির মুখে ঢুকেই আনোয়ার আলি বিরক্ত ও দুঃখিত হয়ে পড়ল।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২২)

এখানে তেমন সহিংসতা ‘ঘটল’ বলে মনে হয় না, বরং স্থান (সরু গলি) ও আবহ (বিরক্তি বা দুঃখ) মিলে এক ধরনের মানসিক শাস্তি তৈরি হলো। ফুকোর ভাষায়, শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন দেহকে শোধরায় সূক্ষ্ম নিয়মে। ইলিয়াস দেখান, নগরের অভিজাত-অঞ্চলের ভেতরের ক্ষুদ্র স্থান-ব্যবস্থাই দেহ বা মনের ওপর চাপ তৈরি করে। আরও লক্ষণীয়, গান বা শব্দ এখানে উৎসব নয়; আধিপত্যের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ, যা অনবরত বাজে, ব্যক্তির অন্তর্জগৎকে ঢেকে দেয়: ‘আহমদিয়া হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টে বিশ বছর আগেকার ‘ছোড়ে বাবুল কা ঘর’ বিরতিহীন বাজে এখন রাত্রি সোয়া এগারোটা, আরো ঘণ্টা দুয়েক এই কর্কশ কোলাহলের কাল।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২২)

‘বিরতিহীন’ এই শব্দটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নীরব সহিংসতার একটা কৌশল হলো বিরতি না দেওয়া: অবিরাম শব্দ, অবিরাম তাড়া, অবিরাম নজর। নগরের সামাজিক পরিসরে ব্যক্তির স্বর, নির্বাচন, বিরতি—সবই নিয়ন্ত্রিত।

এরপর গল্পে দেখা যায় লোকাল পরিসর কীভাবে নতুন আগন্তুককে দৃশ্যমানভাবে না-হলেও কার্যত বর্জন করে। গলির ভেতরকার দৈনন্দিন চাহনি, ইঙ্গিত, কথার ভঙ্গি সবই শৃঙ্খলার যন্ত্র। ফুকোর প্যান-অপটিকনের (Panopticon মূলত একটি কারাগারের নকশা, যার ধারণা দেন দার্শনিক জেরেমি বেনথাম। মিশেল ফুকো এই নকশাটিকে ব্যবহার করেন আধুনিক ক্ষমতার রূপক হিসেবে। নকশার মূল বৈশিষ্ট্য: মাঝখানে একটি নজরদারি টাওয়ার, চারপাশে বৃত্তাকারে বন্দিদের কক্ষ, টাওয়ারে থাকা ব্যক্তি সবাইকে দেখতে পারে, কিন্তু বন্দিরা জানে না, তাদের দেখা হচ্ছে কি না। অর্থাৎ, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট। ফুকোর মতে, Panopticon কোনো কারাগার–মডেলমাত্র নয়।) মতো সবাই দেখে, কিন্তু কেউ প্রমাণযোগ্যভাবে আঘাত করে না; তবু আঘাত জমতে থাকে।

ফলে ‘উৎসব’-এ নীরব সহিংসতা কাজ করে স্থানিক সংকোচন (সরু গলি বা বন্ধ পরিসর), সংবেদনগত দখল (বিরতিহীন শব্দ), আবেগ-শাসন ও সামাজিক চাহনির (কে ঢুকতে পারবে বা কার উপস্থিতি ‘বেমানান’ এধরনের বিচার) মাধ্যমে।

‘খোঁয়ারি’ নামের আরেকটি গল্পে নীরব সহিংসতার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রূপ দেখা যায় বাড়ির স্থাপত্য ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে। দরজার কড়া নাড়া, ভেতর থেকে জবাব, তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকা—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একধরনের ইনিশিয়েশন বা প্রশাসিত হওয়া শেখা। গল্পের শুরুতেই ‘ভেতরে ঢোকা’ সহজ নয়। প্রবেশ নিজেই ক্ষমতার পরীক্ষা: ‘অনেকক্ষণ ধরে কড়া নাড়ার পর ওপরতলা থেকে জবাব আসে, ‘আসি!’ তারপর আবার কোনো সাড়া-শব্দ নেই: গেটের মাধবীলতার ঝাড়ে চরে বেড়ায় পোকামাকড়, তাদের চলাচলের ধ্বনি ছাড়া এ বাড়ির কোনো স্পন্দন বোঝা যায় না।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ৯৩)

এই যে ‘আসি’ বলে আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই, এই নীরবতা হয়তো উপেক্ষা করার অভিপ্রায়। অর্থাৎ এই নীরবতা ভেতরে ঢোকার আগে পরিচয় যাচাইয়ের একটি ক্ষমতাসূচক ভাষা। ফুকোর ডিসিপ্লিন ব্যক্তিকে আগে চিহ্নিত করে, তারপরই তাকে জায়গা দেয়। গেট বা দরজা বা উপরতলা সবই ক্ষমতার ফিল্টার। গল্পভাষায় আরও একটু এগোলে দেখব, ‘মাধবীলতায় ঢাকা উঁচু গেট তেমন চওড়া নয় গেটের একটা কপাট কেটে আরেকটা ছোটো দরজা[…] সুতরাং এই বাড়িতে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করে ছোটো দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ৯৩ ) আপাতভাবে এটি হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু একে নীরব সহিংসতার এক নিখুঁত রূপ হিসেবেও দেখা যায়। কোনো কথা না বলেই শরীরকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করা হয়। ফুকোর ভাষায়, এই স্থাপত্য মানুষকে ‘docile body’(‘Docile body’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ—যে দেহকে সহজে নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহার, প্রশিক্ষণ ও শাসন করা যায়। মিশেল ফুকো এই ধারণাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর গ্রন্থ Discipline and Punish (1975)-এ। )-তে পরিণত করে।

‘খোঁয়ারি’-তে ওপর-নিচের সম্পর্ক (ওপরতলা থেকে কথা আসে ‘আসি’, তারপর নিচতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা) ক্ষমতার ‘উল্লম্বতা’ তৈরি করে। ওপরতলা যেন কর্তৃত্বের আসন; নিচতলা যেন অনুনয় বা অপেক্ষার পরিসর। এই স্থাপত্যগত উল্লম্বতা ফুকোর ‘হায়ারার্কিক্যাল অবজারভেশন’-এর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে ওপর থেকে দেখা বা ডাকা বা নির্দেশ দেওয়া হয়।

গল্পে কথোপকথনের টানাপোড়েনেও নীরব সহিংসতা আছে: হুকুম-ধাঁচ, বাধ্যতা, অস্বীকার করার অসামর্থ্য। অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়, এটাই একধরনের মাইক্রো-ইন্টারোগেশন (micro-interrogation)।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, ‘খোঁয়ারি’-তে স্বাভাবিক ভাষা কীভাবে দমনকে স্বাভাবিক করে। যেমন, কারও উপস্থিতিকে অস্বাভাবিক বানিয়ে দেওয়া, বা ‘এভাবে হয়’ বলে নিয়মকে প্রকৃতির মতো স্থির করা। ফুকোর ‘নর্মালাইজিং জাজমেন্ট’-যেখানে কাউকে অস্বাভাবিক বা অযোগ্য ঘোষণা করেই শাস্তি কার্যকর হয়, এখানেও সেই খেলাই চলে।

গল্পের মধ্যভাগে সামাজিক কথোপকথনের ভেতর দিয়ে যেভাবে সন্দেহ, তাচ্ছিল্য, অথবা কর্তৃত্ব ফলিত হয়, তা দেখায়, শরীরে আঘাত ছাড়াই মানুষের ভেতর ভয়-লজ্জা-আত্মসংযম ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। ‘খোঁয়ারি’-পাঠে নীরব সহিংসতা তাই প্রধানত: প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ (গেট বা দরজা বা ‘আসি’), অপেক্ষা করানো (সময় দখল), উল্লম্ব কর্তৃত্ব (ওপরতলার স্বর) ও স্বাভাবিকতার নিয়ম (যা মানতে হয়, প্রশ্ন করা যায় না)।

‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পে দারিদ্র্য কোনো তত্ত্ব নয়, একটা প্রাত্যহিক বাস্তব, যা কথাবার্তার ভেতর ঢুকে যায়। যে বাক্যটি ইলিয়াস প্রায় লোকভাষায় ছুড়ে দেন, সেখানে নীরব সহিংসতার সিস্টেম ধরা পড়ে: ‘কাল থেকে শুরু হয়েছে দুধের বায়না। গোরু বিক্রি করে দিয়েছে আজ এক বছরের ওপর, সেই গোরুর শোক কাল থেকে নতুন করে উথলে উঠছে। এত হাহাকারের আছে কী? গোরু যখন ছিলো তখনি কি এই মা মাগি ওদের দুধভাত দিতো? প্রত্যেকদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাশত মুহরির বড়ো ছেলে ঢ্যাঙা আশরাফ বা তার ঘরজামাই বোনাই হারুন মৃধা এসে দুধ দুইয়ে নিয়ে গেছে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৪ ) এটা এক শ্রেণির মানুষের জন্য কেবল দুধের অপ্রতুলতা নয়, এটাকে জীবনরক্ষার উপকরণ (খাদ্য বা পুষ্টি) নিয়ে আরেক শ্রেণির মানুষের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ হিসেবেও দেখা যায়। যেমনটা ফুকোর biopolitics-এ জীবনকে শাসন করা হয় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শ্রম-ক্ষমতা, টিকে থাকার শর্ত দিয়ে। এখানে গরু নেই মানে দুধ নেই, আবার যখন গরু ছিল তখনও দুধ হারুন মৃধা দুধ নিয়ে যেত। ‘এর বদলে সাতদিন পর পর বাজারে হারুন মৃধার দোকান থেকে ওহিদুল্লা চালডাল নিয়ে আসতো।’(আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৪ ) ফলে, দুধের অপ্রাপ্তি হলে পুষ্টির অভাব হবে মানে শরীর নীরবে দুর্বল হবে। কোনো লাঠির আঘাত বা কারাদণ্ড ছাড়াই তখন দেহ শাস্তি পাবে।

আর ইলিয়াস এই সংকটকে পারিবারিক ও নৈতিক ভাষার ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। ফলে কাঠামোগত সহিংসতা ব্যক্তিগত দোষারোপে পরিণত হয়। “ওহিদুল্লা মিন মিন করে, ‘না, হ্যার হাউস হইছে দুধভাত খাইবো, মায়ে বলে বাঁচবো না! তার গলা কাঁদো কাঁদো করার চেষ্টা করেও বিশেষ সুবিধা হয় না। মুহুরির শহরবাসী ছেলের কথা বরং সর্ষের তেলের ঝাঁঝে খোনা শোনায়, ‘দুধভাত খাইলে তর মায়ে ফাল পাইড়া উঠবো, না?” (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৬ )

এখানে ‘মায়ের অবস্থা’ একটা নৈতিক চাপ তৈরি করে ওহিদুল্লার ওপর: তুমি যদি দুধ জোগাড় করতে না পারো, তুমি যেন অপরাধী। এটাও নীরব সহিংসতার একধরনের কৌশল যা কাঠামোর ব্যর্থতাকে ব্যক্তি-নৈতিকতার ব্যর্থতা বানিয়ে দেয়।

এ গল্পে বমির বিবরণ খুব বিস্তারিত। এখানে সহিংসতা দৃশ্যমান রক্তপাত নয়, দেহের ভেতরের ভাঙন। ইলিয়াস লিখছেন: ‘জয়নাব অবিরাম বমি করে। প্রথমে বের হলো ঘোলাটে সাদা ভাত ও পানি। তারপর কেবল পানি। বিবর্ণ পানির ধারা বেরিয়ে আসে প্রবল তোড়ে। মাঝে মাঝে অল্পক্ষণের বিরতি দিচ্ছে। বিরতির পর পরই দ্বিগুণ বেগে বমি আসে। বমির পানিতে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৯১)

এখানে লক্ষণীয় যে, বমির প্রথমে ‘সাদা ভাত ও পানি’, তারপরে ‘কেবল পানি’। খাদ্য ক্রমে অপসৃত হচ্ছে; দেহ নিজেই দেহকে খালি করে দিচ্ছে। এটি ফুকোর biopolitical সহিংসতার টেক্সচুয়াল চিহ্ন: জীবনের ন্যূনতম জিনিসও দেহে টেকে না। এখানকার ‘বিরতি’ ফুকোর ডিসিপ্লিনের মত: দেহ যেন সময়-পর্বে ভেঙে পড়ে; ভাঙনেরও একটা নিয়ম আছে।

আর বমির সঙ্গে ‘বিরতি’র উপস্থিতি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বিরতি এখানে সান্ত্বনা নয়, একে বলা যায়, সংকটকে স্বাভাবিক করে নেওয়ার অভ্যাস। জয়নাবের ‘চোখজোড়া ঢুলুঢুলু। ঠোঁটের কোণে, চিবুকের ডৌলে বমির পানির লালচে ফোঁটা, নীলচে ফোঁটা। এরি মধ্যে ওহিদুল্লার দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে ইঙ্গিত করলে সে এক পা এগিয়ে আসে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৯২)

এই ‘তর্জনী তুলে’ আর কথা না বলে ‘ইঙ্গিত করে’ নীরব সহিংসতার মূল লক্ষণ: ভাষা হারিয়ে ফেলা। দেহের কষ্টকে ভাষায় ধরা যায় না, কেবল অঙ্গভঙ্গিতে বোঝা যায়। অর্থাৎ কাঠামোগত সহিংসতা এক পর্যায়ে কমিউনিকেশনের ক্ষমতাও কেড়ে নেয়।

গল্পের শিরোনামেই ইলিয়াস ইঙ্গিত দেন, দুধভাতের (স্বাভাবিক, শিশুখাদ্য, ঘরের শান্তি) জায়গায় এসেছে ‘উৎপাত’। খাদ্যের প্রশ্নটি ঘরের নৈতিক-আবেগীয় ভেতরভাগকে উত্তাল করে; মানুষের ভাষা ও সম্পর্ককে হিংস্র করে তোলে। কিন্তু সেটা কারও অপরাধ নয়, এটা একটি কাঠামো।

এখানে নীরব সহিংসতা তিন ধাপে কাজ করে: অভাব সৃষ্টি (দুধ নেই), দেহ ভাঙে (বমি বা দুর্বলতা), মায়ের জন্য দুধ জোগাড় করতে ব্যর্থতায় ওহিদুল্লা লজ্জিত হয় বা অপরাধবোধে আক্রান্ত হয় (না পারা মানে ব্যর্থতা)। ফুকোর ভাষায় এটা governmentality: মানুষকে আইন দিয়ে নয়, দৈনন্দিন প্রয়োজন ও নৈতিক চাপ দিয়ে শাসন করা।

ইলিয়াসের ‘দোজখের ওম’ গল্পে সহিংসতা কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুদ্ধোত্তর জীবনের ভেতরে দেহগত অনুভূতি, ভাষার সংকোচন এবং স্থায়ী আতঙ্ক হিসেবে কাজ করে। এখানে সহিংসতা শোনা যায় না, দেখা যায় না। কিন্তু শরীরের ভেতরে উষ্ণতা (ওম) হয়ে জমে থাকে। এই উষ্ণতাই গল্পটির নীরব সহিংসতার কেন্দ্র।

গল্পের শুরুতেই ইলিয়াস সহিংসতার মানসিক ব্যাখ্যায় না গিয়ে দেহের অনুভূতি দিয়ে পরিস্থিতি নির্মাণ করেন, ‘আজ অনেকদিন পর কামালউদ্দিনের শরীরের প্রায় গোটাটাই শিরশির করে কাঁপে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২৯১ ) এই ‘শিরশির করে কাঁপা’ কোনো আকস্মিক ভীতি নয়; এটি দীর্ঘদিনের চেপে রাখা আতঙ্কের দেহগত প্রতিক্রিয়া। এখানে সহিংসতা অতীতের হলেও তার প্রভাব বর্তমান দেহে সক্রিয়। ইলিয়াস দেখান, সহিংসতা শেষ হয়ে গেলেও দেহ তা ভুলে যায় না। তখন বরং শরীরই হয়ে ওঠে সহিংসতার ধারক। এই ধারাবাহিক দেহগত অস্বস্তিই নীরব সহিংসতার প্রথম স্তর।

আবার কখনো ভাষা সংকোচনের মাধ্যমে ইলিয়াস নীরব সহিংসতার বিস্তার ঘটান। যেমন, তখন গল্পে ভাষা ক্রমে ছোট হয়ে আসে; পূর্ণ বাক্যের বদলে সংকেত, প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত জবাব দেখা যায়, “মরার পর প্রথম দিকে এসে আকবরের মাজানলার বাইরের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করতো, ‘লও যাই।’

—‘কৈ?’
— ‘ঐহানে!” (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২৯৩)

এই তিনটি ক্ষুদ্র উচ্চারণ একটি সমাজের ভাষাচিত্র তুলে ধরে, যেখানে অতিরিক্ত বলা বিপজ্জনক বা অর্থহীন। ‘কৈ?’ প্রশ্নটি কেবল কোনো জায়গা-জিজ্ঞাসা নয়; এটি সন্দেহ ও আত্মরক্ষার ভাষা। এখানে নীরব সহিংসতা কাজ করে ভাষার উপর চাপ হিসেবে: মানুষ কম বলে, ছোট বলে, ইশারায় কথা বলে। ফলে সহিংসতা প্রকাশ্য সংঘর্ষে না গিয়ে ভাষার সংকোচন ঘটিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

গল্পের শিরোনামে থাকা ‘ওম’ শব্দটিও এখানে ধ্বনি নয়। একে বলা যায়, উষ্ণতার অনুভূতি, যা শরীরের ভেতরে জমে থাকে। এই উষ্ণতা আরামদায়ক নয়; এটি দহনকারী। যুদ্ধোত্তর শোক, ভয় ও অনিশ্চয়তা মিলিয়ে যে তাপ তৈরি হয়, তা আগুনের মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।

এই উষ্ণতার ইঙ্গিত গল্পে বারবার দেহের অস্বস্তি, কাঁপুনি ও অস্থিরতায় ফিরে আসে। সহিংসতা তাই এখানে sonic নয় (শব্দে প্রকাশিত নয়), somatic—দেহে অনুভূত। ইলিয়াস সহিংসতাকে দৃশ্য থেকে সরিয়ে অনুভূতিতে স্থানান্তর করেন, তখন তা নীরব হয় বটে কিন্তু গভীরও হয়।

গল্পে পরিচয়, অবস্থান ও নিরাপত্তা, সবই অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে। যখন মানুষ জানে না কে বন্ধু, কে শত্রু, তখন প্রতিটি উচ্চারণ হিসেব করে করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে নীরবতা আত্মরক্ষার কৌশল হয়ে ওঠে। ফলে সহিংসতা আর আলাদা করে প্রয়োগ করতে হয় না; পরিবেশই মানুষকে নিয়ন্ত্রিত রাখে। বলা যায়, ‘দোজখের ওম’–এ নীরব সহিংসতা তিনটি স্তরে কাজ করে: প্রথমত, দেহে: শিরশিরি কাঁপুনি, অস্বস্তি ও উষ্ণতার মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত, ভাষায়: সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ, প্রশ্ন ও সংকেতের মাধ্যমে ও পরিবেশে: অনিশ্চয়তা, সন্দেহ ও স্থায়ী আতঙ্কের মাধ্যমে। এই তিনটি মিলেই ইলিয়াস একটি যুদ্ধোত্তর নরক নির্মাণ করেন, যা আগুনে জ্বলে না, কিন্তু তাপে পোড়ায়।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলোর শেষগুলো প্রায়ই সমাধানহীন। কিন্তু এই সমাধানহীনতা কোনো শিল্পকৌশলগত ফাঁকি নয়; বরং নীরব সহিংসতার কাঠামোর যথার্থ রূপ। কারণ নীরব সহিংসতা মানুষকে হত্যা করে না, মানুষকে স্থগিত করে। জীবন চলতে থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত থেমে থাকে। সময় কাটে, কিন্তু সময় নিজের থাকে না।

তাই বলা যায়, ইলিয়াসের ছোটোগল্পে নীরবতা প্রতিক্রিয়া নয়; নীরবতা হলো condition of existence—অস্তিত্বের শর্ত।

উপন্যাসে ইলিয়াস রাষ্ট্র, ইতিহাস, শ্রেণি-সংঘাতের বড়ো পরিসর দেখান। ছোটোগল্পে তিনি দেখান ঘনত্ব, একটি মুহূর্ত, একটি বাক্য, একটি থেমে যাওয়া নিশ্বাস। উপন্যাসে সহিংসতা কখনো দৃশ্যমান অবকাঠামো নিয়ে আসে; ছোটোগল্পে সহিংসতা অবকাঠামোকে ভেতরে নামিয়ে আনে, মানুষের বাক্য-প্রতিবর্তে, অভ্যাসে, যুক্তিতে, অংশগ্রহণে।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলো আমাদের শেখায়, নীরব সহিংসতা একরকম নয়, সে বহুরূপী। কখনো সে ভাষাকে অকথ্য করে, কখনো অভ্যাসে মিশে যায়, কখনো যুক্তিকে ঢাল বানায়, কখনো উৎসবের আলোয় প্রশ্ন ঢেকে দেয়। কিন্তু প্রতিবার ফল এক: মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কণ্ঠকে ছোট করে, তারপর কণ্ঠের প্রয়োজনই ভুলে যায়।

এইখানেই ছোটোগল্পগুলো ভয়ংকর। কারণ তারা সহিংসতাকে নাটকীয় করে তোলে না; তারা সহিংসতাকে স্বাভাবিকতার ভিত হিসেবে দেখায়। এবং স্বাভাবিকতার ভিত হিসেবে সহিংসতা একবার স্থাপন হলে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবচেয়ে কঠিন, কারণ তখন আর বোঝাই যায় না কোন জায়গা থেকে বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

ফলে, ইলিয়াস তাঁর ছোটোগল্পে আমাদের সামনে যে প্রশ্নটা রাখেন, আমরা কি নীরব, নাকি আমাদের নীরব করে রাখা হয়েছে?— তাতে কখনো ইলিয়াসের অনেক চরিত্রকে ‘নিষ্ক্রিয়’ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে তা এক ধরনের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়করণ। চরিত্রসমূহের নিষ্ক্রিয়তা তাদের ব্যক্তিগত চরিত্রদোষ নয়, এটা মূলত ক্ষমতারই নির্মাণ। ক্ষমতা শুধু দমন করে না, ক্ষমতা কখনো অক্ষমও করে দেয়।

৯.
এ লেখার শেষ প্রশ্নটি যদি এমন হয় যে, ইলিয়াস কি তাহলে অতীত?, না-কি তিনি প্রক্রিয়ার লেখক? তাহলে এর জবাব কী হবে? কেননা, ইলিয়াসকে অনেকেই সময়ের খাঁচায় রেখে দিতে চান—উনসত্তর, সামরিক দমন, যুদ্ধ-পরবর্তী শূন্যতা ইত্যাদিতে। কিন্তু এটা তো ঠিকই যে, তিনি ঘটনা লিখেছেন কম; বরং যা লিখেছেন তাকে ক্ষমতার প্রক্রিয়া বলাই সংগত। ক্ষমতা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন আচরণকে বদলায়, সেটাই তাঁর আসল বিষয়। কারণ প্রক্রিয়া বদলায় না সহজে; কেবল মুখ বদলায়, পোশাক বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়।

তাই ইলিয়াসকে ‘অতীত’ বলে দিলে হয়তো একধরনের নিরাপত্তার বোধ আসে, যেন বই বন্ধ করলেই চাপটা চলে যাবে। কিন্তু ইলিয়াসের সাহিত্যে চাপটা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না; চাপটা পাঠকের শরীরে উঠে আসে। এই ‘শরীরে ওঠা’টা রাজনৈতিক, কারণ ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত মানুষের শ্বাস-চলাচল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়: কে কতটুকু কথা বলবে, কতটা বলবে, কোথায় বলবে, কাকে শুনিয়ে বলবে, আর কাকে গোপনে বলবে।

এইখানে, এই সুনির্দিষ্ট পরিসরে ইলিয়াস আমাদের সমকালীন, কারণ আজও সহিংসতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ খুব বড়ো ঘটনার মধ্যে নেই, আছে ভাষা, নীরবতা, স্ব-সম্পাদনার ভেতরে।

আগেই বলেছি, ইলিয়াস গ্রামকে তথাকথিত ‘সরল’ করে নির্মাণ করেননি। গ্রামকে তিনি দেখান এমন এক পরিসর হিসেবে, যেখানে কথা বলা মানে কেবল বাক্য উচ্চারণ নয়, কথা বলা মানে সামাজিক আদালতে দাঁড়ানো। খোয়াবনামার দুনিয়ায় নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়; নীরবতা এক ধরনের সামাজিক জ্ঞান: কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না।

আজকে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সবচেয়ে বড়ো বিভ্রম: ‘এখন সবাই কথা বলে।’ সত্যি, সবাই লিখছে, স্ট্যাটাস, পোস্ট, থ্রেড, রিল ইত্যাদি। কিন্তু ইলিয়াসের চোখ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কথা বলা আর কণ্ঠ পাওয়া এক জিনিস নয়। ডিজিটাল যুগে কথা বলার পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু কণ্ঠের ‘ওজন’ কমে। কারণ কণ্ঠ এখন অ্যালগরিদমের বিচারে দৃশ্যমান হয়, আর অ্যালগরিদমের কাছে কণ্ঠ মানে নৈতিকতা নয়, কণ্ঠ মানে এনগেজমেন্ট। ফলে মানুষ শিখে নেয় নিরাপদ ভাষা: স্পষ্ট অভিযোগ নয়, ইঙ্গিত; নাম নয়, ছায়া; প্রতিবাদ নয়, রসিকতা; সত্য নয়, ‘আমি শুধু জিজ্ঞেস করছি’ প্রভৃতি। এটা ইলিয়াসীয় নীরবতার আধুনিক রূপ: কথা বলেও না বলা। এটা এমন এক নীরবতা, যেখানে মানুষ নিজে নিজেই নিজের বাক্যকে শান দিয়ে ভোঁতা করে, এমন ভোঁতা যে, কাটে না, কেবল আঁচড় লাগে।

ইলিয়াস আমাদের দেখিয়েছিলেন, নীরবতা শুধু রাষ্ট্র-ভয় থেকে আসে না; নীরবতা আসে সমাজের ভেতরের বিচারের ভয় থেকেও। আজ সেই বিচার আগের চেয়ে বেশি দ্রুত: কমেন্ট সেকশন, স্ক্রিনশট, শেয়ার, ট্রল মিলিয়ে একধরনের জনসম্মুখে আদালত বা আদালতও নয় একধরনের মব-বিচার। এই ঘটনাটাকে সামাজিক বিজ্ঞানীরা বহু আগে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ নামে ব্যাখ্যা করেছেন, যখন মানুষ মনে করে তার মতটি সংখ্যালঘু, তখন একঘরে হওয়ার ভয়ে সে চুপ থাকে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ‘Spiral of Silence’ রিপোর্টেও এই ভয় (অস্ট্রাসিজম বা রিডিকিউল) আত্ম-সেন্সরশিপের বড়ো কারণ বলে দেখানো হয়েছে।

ইলিয়াস এই তত্ত্ব জানতেন কিনা জানি না, কিন্তু তাঁর সাহিত্য এই তত্ত্বের মানবিক সত্য উন্মোচন করেছে: চুপ থাকার সবচেয়ে তীব্র কারণ অনেক সময় বন্দুক নয়, একাকিত্ব।

ডিজিটাল সংস্কৃতিতে একাকিত্বের ভয় আরও শক্তিশালী, কারণ ‘কমিউনিটি’ এখন শুধু পাড়া বা অফিস নয়; কমিউনিটি এখন ফিড। ফিডে তুমি একা হয়ে গেলে, তোমার পরিচয়ও একা হয়।

ইলিয়াসের সমকালে মানুষ ভয় পেত, কেউ শুনছে কি না। আজ মানুষ ভয় পায়, সবকিছু রেকর্ড হয়ে আছে কিনা। এটাই ডিজিটাল যুগের বড়ো মোড়: ভয় আর এখন অনুমান নয়, ইনফ্রাস্ট্রাকচার। কারণ একধরনের নজরদারির আবর্তে আমরা ঢুকে পড়েছি। এই নজরদারি-চেতনা মানুষের আচরণ বদলে দেয়। ‘চিলিং ইফেক্ট’ হিসেবে এটা গবেষণায় বারবার এসেছে। ‘Digital Dataveillance’ নিয়ে একটি গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে, ডিজিটাল নজরদারির অনুভূতি মানুষকে নিজের যোগাযোগ সীমিত করতে বাধ্য করে, যা মূলত দৈনন্দিন স্ব-সেন্সরশিপ।

‘ফ্রিডম হাউস’ নামের একটি গবেষণা সংস্থা দেখিয়েছে, এআই ও ডেটা-চালিত প্রযুক্তি ডিজিটাল দমনকে ‘সহজ, দ্রুত, সস্তা, কার্যকর’ করে তুলতে পারে, অর্থাৎ দমননীতি এখন স্কেলিং হয়।   

এছাড়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক নানা রিপোর্ট/ব্রিফিং ‘চিলিং ইমপ্যাক্ট’ অর্থাৎ আইন বা প্রক্রিয়া বা হয়রানির আশঙ্কায় সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশ শীতল হয়ে আসে, এই কথাই সামনে এনেছে। ফলে, ইলিয়াসের সাহিত্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, আগে পুলিশ ছিল রাস্তায়; এখন পুলিশ অনেক সময় মাথার ভেতরে। আর মাথার ভেতরের পুলিশকে ছুটি দেওয়া সবচেয়ে কঠিন।

ইলিয়াস খোয়াবনামায় দেখিয়েছেন, গ্রামে গুজব শুধু কথা নয়; গুজব ক্ষমতা। কারণ গুজব উৎসহীন, দায়হীন, কিন্তু কার্যকর। ডিজিটাল যুগে অ্যালগরিদম-চালিত ভাইরালিটি ঠিক এমনই: উৎস হারিয়ে যায়, দায় পাতলা হয়, কিন্তু প্রভাব বিপুল হয়। যে কথা ভাইরাল হয়, সেই কথাই অনেক সময় ‘সত্য’ হয়ে দাঁড়ায় ফ্যাক্টের কারণে নয়, দৃশ্যমানতার কারণে।

ফলত, ইলিয়াস-সাহিত্য আজও ভয়ানকভাবে প্রাসঙ্গিক এজন্য যে, গ্রামের গুজব মানুষকে যেভাবে চুপ করাতো, আজ ভাইরালিটি মানুষকে সেভাবেই চুপ করায়। কেউ বলার আগে ভাবে: ‘যদি কেউ ভুলভাবে বোঝে!’, ‘কেউ যদি ক্লিপিং করে ছড়িয়ে দেয়!’, ‘কনটেক্সট যদি উধাও হয়ে যায়!’ ইত্যাদি। এই ‘কনটেক্সট-ভয়’ই নতুন নীরবতা। আর তাই আজকের নীরবতা অনেক সময় ‘সাহসের অভাব’ নয়; এটা ‘কনটেক্সটের অনিশ্চয়তা’।

এই লেখায় এর আগেই আমরা দেখিয়েছি, ইলিয়াস ‘ভদ্রলোকী রাজনীতি’কে কেমন সন্দেহের চোখে দেখেন। বর্তমান বাস্তবতায় সেই একই ভদ্রতা নতুন পোশাক পরেছে: ‘be civil’, ‘tone matters’, ‘community standards’ প্রভৃতি। কিন্তু সমস্যা হলো যেভাবে ভদ্রতার মানদণ্ড নির্ণীত হয়, তাতে যারা ক্ষমতার কাছাকাছি, তাদের ভাষা ‘ভদ্র’ আর প্রান্তিকের ভাষা হয় আক্রমণাত্মক। ফলে প্রান্তিক-অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয় না, কারণ তাদের প্রকাশের ভাষাই অগ্রহণযোগ্য। এখানে ইলিয়াসের সাহিত্যে এটা একটা বার্তার মতো কাজ করে যে, সহিংসতা শুধু নিষেধ নয়, সহিংসতা কখনো ভাষার শুদ্ধতার নামে ব্যবহৃত হয়। যখন বলা হয় ‘ঠিকভাবে বলো’, তখন অনেক সময় আসলে বলা হয় ‘এইভাবে বলো না।’

খোয়াবনামাতেও আমরা দেখি, তমিজের বাপের গলা থেমে যায়, বলা কঠিন হয়ে পড়ে। এই চুপ করে থাকা কোনো শারীরিক সমস্যা নয়, এটা সামাজিক চাপের ফল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ‘ঠিকভাবে বলো’ মানে: রাগ দেখিয়ো না, তীব্রতা দেখিয়ো না, নাম নিয়ো না; অর্থাৎ সত্যকে ধারহীন করো। সত্য শিথিল হলে ক্ষমতা আরামে থাকে।

তাহলে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমরা কীভাবে পড়ব? ইলিয়াসকে পড়ার ম্যানুয়েল তৈরি করা যদিও এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যেকেউ যেকোনোভাবে ইলিয়াসকে পড়তে পারে। তবে, ইলিয়াসকে ইলিয়াসের মতো করে পড়ার জন্য কয়েকটি নতুন লেন্স ব্যবহার করলে আরওকিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে হয়। যেমন, লেন্সগুলো এমন হতে পারে:

  1. K) ইলিয়াস =‘আত্ম-সেন্সরশিপের কথাসাহিত্যিক ভূগোল’

তিনি দেখান, মানুষ কীভাবে নিজের কথাকে নিজেই কেটে দেয়। আজকের প্রেক্ষাপটে এই জায়গাটাতে ইলিয়াসকে আমরা ডিজিটাল মনস্তত্ত্বের লেখক হিসেবেও পড়তে পারি।

  1. L) ইলিয়াস = ‘নীরবতার অবকাঠামো’-এর লেখক

নীরবতা কারা তৈরি করে, রাষ্ট্র, সমাজ, শ্রেণি, আইন, প্ল্যাটফর্‌ম, অ্যালগরিদম মিলিয়ে একধরনের অবকাঠামো। ফ্রিডম হাউসের গবেষণায় যেভাবে এআইকে ডিজিটাল দমনের অ্যাম্প্লিফায়ার বলছে, ইলিয়াসীয় পাঠ সেই অবকাঠামোকে মানবিক করে দেখতে শেখায়।

  1. M) ইলিয়াস = ‘ভাষার নৈতিকতা’র লেখক

তিনি আমাদের ভালো মানুষ বানান না; তিনি আমাদের স্বস্তি কেড়ে নেন। এই স্বস্তিহীনতাই তাঁর নৈতিকতা, ভুয়া আশায় আশান্বিত করা নয়, বরং নির্মম স্পষ্টতা।

ফলে ডিজিটাল যুগে নীরবতা আর শুধু ‘চুপ’ নয়; নীরবতা হলো, স্ব-সম্পাদনা, নিরাপদ ভাষা, কনটেক্সট-ভয়, অ্যালগরিদমিক ভদ্রতা, নজরদারি-চেতনা প্রভৃতি। কারণ, ইলিয়াস আমাদের চিৎকার করতে নয়, নীরবতাকে আগে চিনতে বলেন। আর সেই চেনাটা আনন্দের নয়, বিপজ্জনক। কারণ নীরবতাকে একবার চিনে ফেললে, নীরব থাকা আর নির্দোষ থাকে না।

১০.

এই বিবিধ-বিখণ্ডিত লেখার শেষে আমরা এটা বলতে পারি যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সত্যি আমাদের কোনো বিপ্লবের নকশা দিয়ে যাননি। এমনকি কোনো মুক্তির গানও নয়। তিনি আমাদের চেঁচাতেও বলেননি। তাহলে তিনি কী করেছেন? তিনি কেবল একটি আয়না ধরেছেন আমাদের চোখের সামনে।

এই আয়নায় আমরা দেখি, কোথা থেকে এসেছে আমাদের নীরবতা,

কীভাবে তৈরি হয়েছে, কাদের স্বার্থে কাজ করছে। এই আয়নায় তাকানো কঠিন। কারণ এই আয়নায় আমরা এক অপ্রিয় সত্যকে দেখতে পাই, আমরা কেবলই নীরবতার ভুক্তভোগী নই, কখনো কখনো আমরাই নীরবতার সহ-উৎপাদক।

 

গ্রন্থাবলি

  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ২০০৮। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ২। মাওলা ব্রাদার্স। ঢাকা।
  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ২০২৩। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গল্পসমগ্র । মাওলা ব্রাদার্স। ঢাকা।

ইন্টারনেট তথ্য

  • পিউরিসার্চ ডট কম/ দ্য স্পাইরাল সাইলেন্স অন সোশ্যাল-মিডিয়া
  • জার্নালস ডট সেইজপাব ডট কম/ doi/10.1177/20539517211065368
  • ফ্রিডমহাউজ ডট ওআরজি/ এক্সপান্ডিং অ্যান্ড ডিফেন্ডিং ফ্রিডম এরাউন্ড ওয়ার্ল্ড
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাউজানের বালু সাম্রাজ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: ১৪ মাসে অর্ধশত সংঘর্ষ, নিহত ২, হাতবদল নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক মেরুকরণ

‘নীরব সহিংসতা’ দেখার জন্য যে আয়নাটি ইলিয়াস আমাদের দিয়েছিলেন ।। শেষ পর্ব

আপডেট সময় : ১২:০৭:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

৮.
কিন্তু ইলিয়াসের ছোটোগল্পে নীরব সহিংসতা ব্যাপারটি কীভাবে ঘটে বা আদৌ কি ঘটে? এই প্রশ্ন উত্থাপিত হলে আমরা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করব, ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলোতে নীরব সহিংসতা আরও তীক্ষ্ণ। কারণ, উপন্যাস যেখানে সময়ের বিস্তারে চাপকে নির্মাণ করে, ছোটোগল্প সেখানে চাপকে একটি প্রাথমিক শর্ত হিসেবে হাজির করে। উপন্যাসে সহিংসতা কখনো কখনো ঘটনার পোশাক পরে মাত্র, যেমন, কারফিউ বা গ্রেফতার বা মিছিল বা বিচারের মাধ্যমে। যদিও ইলিয়াস সেখানেও ঘটনাকে চাপের ভাষায় রূপ দেন; কিন্তু ছোটোগল্পে তিনি প্রায়ই ঘটনার এই আবরণটুকুও খুলে ফেলেন। এখানে নীরব সহিংসতা আর বর্ণনার ভেতরে ঢোকে না। সে বরং বর্ণনার ভেতরের নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই ছোটোগল্পে নীরব সহিংসতা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। কারণ পরিসর ছোট হওয়ায় ব্যাখ্যা কম, অথচ শর্ত বেশি; কারণ চরিত্রকে প্রস্তুতির সময় দেওয়া হয় না; কারণ ভাষা এখানে শুধু অভিব্যক্তি নয়, ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সামাজিক অনুমতি।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পে মানুষ কথা বলে, কিন্তু সেই কথায় ভাষার ওজন থাকে না। ভাষা কেবল এখানে ধ্বনি-উৎপাদনের ব্যাপার নয়, বরং সামাজিকভাবে স্বীকৃত অর্থ-উৎপাদনের ব্যাপার। ফলে চরিত্ররা বাক্য বানালেও বাক্য প্রায়ই নিষ্প্রভ: কোথাও ইঙ্গিত, কোথাও থেমে যাওয়া, কোথাও অর্ধেক উচ্চারণ। নীরব সহিংসতা কাজ করে এইখানে—শব্দকে অর্থহীন বা ঝুঁকিপূর্ণ করে দিয়ে। আমরা বলেছি, নীরবতা মানে ‘কিছু না’ নয়; নীরবতা মানে অদৃশ্য নির্দেশ, যে নির্দেশ লিখিত হয় না, তবু মানা হয়। এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্রকৌশল, আইন কম, অভ্যাস বেশি।

ইলিয়াসের গল্পে নীরব সহিংসতার রূপ তাত্ত্বিকভাবে বুঝতে গেলে আমাদের মিশেল ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্বকে ছুঁয়ে যেতে হবে। যদিও এ লেখা ততটা তাত্ত্বিকতাকে আমলে নিতে প্রস্তুত নয়। তবু ইলিয়াসের ছোটোগল্পের রচনাকৌশলের কারণে অংশত ফুকোর কাছে যেতেই হয়। ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা এখন কেবল শাস্তি বা প্রকাশ্য দমন করে না, এটি কাজ করে নজরদারি, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমেও। ক্ষমতা এমনভাবে সমাজে প্রবেশ করে যে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই আধুনিক ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ। ফুকোবাদী ক্ষমতাতত্ত্বের এক সাহিত্যিক রূপ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে সহিংসতা তাই প্রকাশ্য নয়, এটি নীরব, দৈনন্দিন এবং প্রাতিষ্ঠানিক।

আর এই সহিংসতা অনেক সময় ঘটনা হিসেবে নয়, পরিবেশ, বাক্যভঙ্গি, স্থান-ব্যবস্থাপনা, আচরণবিধি, সামাজিক নজরদারি, ও স্বাভাবিকতার ভাষা হয়ে কাজ করে। এখানে সহিংসতা মানে কেবল মারধর বা রক্তপাত নয়; এমন এক ক্ষমতা-প্রক্রিয়া যা মানুষকে চুপ করায়, অপমানকে স্বাভাবিক করে, শরীরকে নিয়ন্ত্রিত করে, এবং ভয়ের আটপৌরেত্ব তৈরি করে।

ফুকো আমাদের জানান, ক্ষমতা কেবল উপরে থেকে নেমে আসে না; তা সমাজের ভেতরকার ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সম্পর্ক, নিয়ম, চাহনি ও অভ্যাসের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকে। ফলে ‘নীরব সহিংসতা’কে আমরা পড়ব (ক) শৃঙ্খলা-ক্ষমতা (discipline) এবং (খ) শাসন-মানসিকতা (governmentality)-এর দৈনন্দিন প্রয়োগ হিসেবে: মানুষ কীভাবে নিজেই নিজেকে সংযত করে, কীভাবে প্রতিবেশী বা গলি বা বাড়ির গেট বা দরজার আড়াল ক্ষমতার যন্ত্র হয়ে ওঠে। ইলিয়াসের গল্পগুলোতেও এ উপাদানসমূহ নীরব সহিংসতার কাঠামো নির্মাণ করে। একটু বিশদে আলোচনার জন্য আমরা তাঁর মাত্র ৪টি গল্প (‘উৎসব’, ‘খোঁয়ারি’, ‘দুধভাতে উৎপাত’ ও ‘দোজখের ওম’)কে উদাহরণ হিসেবে বেছে নেব।

‘উৎসব’ গল্পে উৎসব কোনো মুক্ত আনন্দের ঘটনা নয়। একে বলা যায় শ্রেণি–নিয়ন্ত্রিত একটি সামাজিক পরিসর। গল্পের শুরুতেই আনোয়ার আলির মানসিক অবস্থার সঙ্গে পরিসরের সংঘর্ষ দেখা দেয়। বলা যায়, ‘উৎসব’-এ উৎসব নামটাই একটা বিপরীতার্থক ইঙ্গিত: বাইরে আলো, গান, আয়োজন—ভেতরে বিরক্তি, বর্জন, শ্রেণিচাহনি, এবং নীরব দমন। গল্পের শুরুতেই নগরজীবনের এক পরিচ্ছন্ন ঠিকানার ভেতর ঢোকার মুহূর্তে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটাই নীরব সহিংসতার প্রথম সংকেত: ‘এখন আনোয়ার আলির বেশ মুডে থাকার কথা। এই তো কিছুক্ষণ আগে সে বড়োলোক বন্ধুর বৌ-ভাতের নিমন্ত্রণে ধানমন্ডির মস্ত এক বাড়িতে গিয়েছিল। ভিতর ধানমন্ডির খুব সুসজ্জিত, অভিজাত ও আধুনিক বাড়ি। প্রচুর পরিমাণে ভালো মেয়ে দ্যাখা গেছে, কয়েকজনের সঙ্গে এমনকি আলাপও হলো। সমস্ত বিয়েবাড়ির কুলীন কলরব অন্তত সপ্তাহখানেক সমস্ত শরীরে সুখ উদ্রেক করবে। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা অন্যরকম। ওদের সরু গলির মুখে ঢুকেই আনোয়ার আলি বিরক্ত ও দুঃখিত হয়ে পড়ল।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২২)

এখানে তেমন সহিংসতা ‘ঘটল’ বলে মনে হয় না, বরং স্থান (সরু গলি) ও আবহ (বিরক্তি বা দুঃখ) মিলে এক ধরনের মানসিক শাস্তি তৈরি হলো। ফুকোর ভাষায়, শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন দেহকে শোধরায় সূক্ষ্ম নিয়মে। ইলিয়াস দেখান, নগরের অভিজাত-অঞ্চলের ভেতরের ক্ষুদ্র স্থান-ব্যবস্থাই দেহ বা মনের ওপর চাপ তৈরি করে। আরও লক্ষণীয়, গান বা শব্দ এখানে উৎসব নয়; আধিপত্যের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ, যা অনবরত বাজে, ব্যক্তির অন্তর্জগৎকে ঢেকে দেয়: ‘আহমদিয়া হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টে বিশ বছর আগেকার ‘ছোড়ে বাবুল কা ঘর’ বিরতিহীন বাজে এখন রাত্রি সোয়া এগারোটা, আরো ঘণ্টা দুয়েক এই কর্কশ কোলাহলের কাল।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২২)

‘বিরতিহীন’ এই শব্দটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নীরব সহিংসতার একটা কৌশল হলো বিরতি না দেওয়া: অবিরাম শব্দ, অবিরাম তাড়া, অবিরাম নজর। নগরের সামাজিক পরিসরে ব্যক্তির স্বর, নির্বাচন, বিরতি—সবই নিয়ন্ত্রিত।

এরপর গল্পে দেখা যায় লোকাল পরিসর কীভাবে নতুন আগন্তুককে দৃশ্যমানভাবে না-হলেও কার্যত বর্জন করে। গলির ভেতরকার দৈনন্দিন চাহনি, ইঙ্গিত, কথার ভঙ্গি সবই শৃঙ্খলার যন্ত্র। ফুকোর প্যান-অপটিকনের (Panopticon মূলত একটি কারাগারের নকশা, যার ধারণা দেন দার্শনিক জেরেমি বেনথাম। মিশেল ফুকো এই নকশাটিকে ব্যবহার করেন আধুনিক ক্ষমতার রূপক হিসেবে। নকশার মূল বৈশিষ্ট্য: মাঝখানে একটি নজরদারি টাওয়ার, চারপাশে বৃত্তাকারে বন্দিদের কক্ষ, টাওয়ারে থাকা ব্যক্তি সবাইকে দেখতে পারে, কিন্তু বন্দিরা জানে না, তাদের দেখা হচ্ছে কি না। অর্থাৎ, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট। ফুকোর মতে, Panopticon কোনো কারাগার–মডেলমাত্র নয়।) মতো সবাই দেখে, কিন্তু কেউ প্রমাণযোগ্যভাবে আঘাত করে না; তবু আঘাত জমতে থাকে।

ফলে ‘উৎসব’-এ নীরব সহিংসতা কাজ করে স্থানিক সংকোচন (সরু গলি বা বন্ধ পরিসর), সংবেদনগত দখল (বিরতিহীন শব্দ), আবেগ-শাসন ও সামাজিক চাহনির (কে ঢুকতে পারবে বা কার উপস্থিতি ‘বেমানান’ এধরনের বিচার) মাধ্যমে।

‘খোঁয়ারি’ নামের আরেকটি গল্পে নীরব সহিংসতার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রূপ দেখা যায় বাড়ির স্থাপত্য ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে। দরজার কড়া নাড়া, ভেতর থেকে জবাব, তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকা—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একধরনের ইনিশিয়েশন বা প্রশাসিত হওয়া শেখা। গল্পের শুরুতেই ‘ভেতরে ঢোকা’ সহজ নয়। প্রবেশ নিজেই ক্ষমতার পরীক্ষা: ‘অনেকক্ষণ ধরে কড়া নাড়ার পর ওপরতলা থেকে জবাব আসে, ‘আসি!’ তারপর আবার কোনো সাড়া-শব্দ নেই: গেটের মাধবীলতার ঝাড়ে চরে বেড়ায় পোকামাকড়, তাদের চলাচলের ধ্বনি ছাড়া এ বাড়ির কোনো স্পন্দন বোঝা যায় না।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ৯৩)

এই যে ‘আসি’ বলে আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই, এই নীরবতা হয়তো উপেক্ষা করার অভিপ্রায়। অর্থাৎ এই নীরবতা ভেতরে ঢোকার আগে পরিচয় যাচাইয়ের একটি ক্ষমতাসূচক ভাষা। ফুকোর ডিসিপ্লিন ব্যক্তিকে আগে চিহ্নিত করে, তারপরই তাকে জায়গা দেয়। গেট বা দরজা বা উপরতলা সবই ক্ষমতার ফিল্টার। গল্পভাষায় আরও একটু এগোলে দেখব, ‘মাধবীলতায় ঢাকা উঁচু গেট তেমন চওড়া নয় গেটের একটা কপাট কেটে আরেকটা ছোটো দরজা[…] সুতরাং এই বাড়িতে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করে ছোটো দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ৯৩ ) আপাতভাবে এটি হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু একে নীরব সহিংসতার এক নিখুঁত রূপ হিসেবেও দেখা যায়। কোনো কথা না বলেই শরীরকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করা হয়। ফুকোর ভাষায়, এই স্থাপত্য মানুষকে ‘docile body’(‘Docile body’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ—যে দেহকে সহজে নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহার, প্রশিক্ষণ ও শাসন করা যায়। মিশেল ফুকো এই ধারণাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর গ্রন্থ Discipline and Punish (1975)-এ। )-তে পরিণত করে।

‘খোঁয়ারি’-তে ওপর-নিচের সম্পর্ক (ওপরতলা থেকে কথা আসে ‘আসি’, তারপর নিচতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা) ক্ষমতার ‘উল্লম্বতা’ তৈরি করে। ওপরতলা যেন কর্তৃত্বের আসন; নিচতলা যেন অনুনয় বা অপেক্ষার পরিসর। এই স্থাপত্যগত উল্লম্বতা ফুকোর ‘হায়ারার্কিক্যাল অবজারভেশন’-এর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে ওপর থেকে দেখা বা ডাকা বা নির্দেশ দেওয়া হয়।

গল্পে কথোপকথনের টানাপোড়েনেও নীরব সহিংসতা আছে: হুকুম-ধাঁচ, বাধ্যতা, অস্বীকার করার অসামর্থ্য। অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়, এটাই একধরনের মাইক্রো-ইন্টারোগেশন (micro-interrogation)।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, ‘খোঁয়ারি’-তে স্বাভাবিক ভাষা কীভাবে দমনকে স্বাভাবিক করে। যেমন, কারও উপস্থিতিকে অস্বাভাবিক বানিয়ে দেওয়া, বা ‘এভাবে হয়’ বলে নিয়মকে প্রকৃতির মতো স্থির করা। ফুকোর ‘নর্মালাইজিং জাজমেন্ট’-যেখানে কাউকে অস্বাভাবিক বা অযোগ্য ঘোষণা করেই শাস্তি কার্যকর হয়, এখানেও সেই খেলাই চলে।

গল্পের মধ্যভাগে সামাজিক কথোপকথনের ভেতর দিয়ে যেভাবে সন্দেহ, তাচ্ছিল্য, অথবা কর্তৃত্ব ফলিত হয়, তা দেখায়, শরীরে আঘাত ছাড়াই মানুষের ভেতর ভয়-লজ্জা-আত্মসংযম ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। ‘খোঁয়ারি’-পাঠে নীরব সহিংসতা তাই প্রধানত: প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ (গেট বা দরজা বা ‘আসি’), অপেক্ষা করানো (সময় দখল), উল্লম্ব কর্তৃত্ব (ওপরতলার স্বর) ও স্বাভাবিকতার নিয়ম (যা মানতে হয়, প্রশ্ন করা যায় না)।

‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পে দারিদ্র্য কোনো তত্ত্ব নয়, একটা প্রাত্যহিক বাস্তব, যা কথাবার্তার ভেতর ঢুকে যায়। যে বাক্যটি ইলিয়াস প্রায় লোকভাষায় ছুড়ে দেন, সেখানে নীরব সহিংসতার সিস্টেম ধরা পড়ে: ‘কাল থেকে শুরু হয়েছে দুধের বায়না। গোরু বিক্রি করে দিয়েছে আজ এক বছরের ওপর, সেই গোরুর শোক কাল থেকে নতুন করে উথলে উঠছে। এত হাহাকারের আছে কী? গোরু যখন ছিলো তখনি কি এই মা মাগি ওদের দুধভাত দিতো? প্রত্যেকদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাশত মুহরির বড়ো ছেলে ঢ্যাঙা আশরাফ বা তার ঘরজামাই বোনাই হারুন মৃধা এসে দুধ দুইয়ে নিয়ে গেছে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৪ ) এটা এক শ্রেণির মানুষের জন্য কেবল দুধের অপ্রতুলতা নয়, এটাকে জীবনরক্ষার উপকরণ (খাদ্য বা পুষ্টি) নিয়ে আরেক শ্রেণির মানুষের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ হিসেবেও দেখা যায়। যেমনটা ফুকোর biopolitics-এ জীবনকে শাসন করা হয় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শ্রম-ক্ষমতা, টিকে থাকার শর্ত দিয়ে। এখানে গরু নেই মানে দুধ নেই, আবার যখন গরু ছিল তখনও দুধ হারুন মৃধা দুধ নিয়ে যেত। ‘এর বদলে সাতদিন পর পর বাজারে হারুন মৃধার দোকান থেকে ওহিদুল্লা চালডাল নিয়ে আসতো।’(আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৪ ) ফলে, দুধের অপ্রাপ্তি হলে পুষ্টির অভাব হবে মানে শরীর নীরবে দুর্বল হবে। কোনো লাঠির আঘাত বা কারাদণ্ড ছাড়াই তখন দেহ শাস্তি পাবে।

আর ইলিয়াস এই সংকটকে পারিবারিক ও নৈতিক ভাষার ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। ফলে কাঠামোগত সহিংসতা ব্যক্তিগত দোষারোপে পরিণত হয়। “ওহিদুল্লা মিন মিন করে, ‘না, হ্যার হাউস হইছে দুধভাত খাইবো, মায়ে বলে বাঁচবো না! তার গলা কাঁদো কাঁদো করার চেষ্টা করেও বিশেষ সুবিধা হয় না। মুহুরির শহরবাসী ছেলের কথা বরং সর্ষের তেলের ঝাঁঝে খোনা শোনায়, ‘দুধভাত খাইলে তর মায়ে ফাল পাইড়া উঠবো, না?” (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৮৬ )

এখানে ‘মায়ের অবস্থা’ একটা নৈতিক চাপ তৈরি করে ওহিদুল্লার ওপর: তুমি যদি দুধ জোগাড় করতে না পারো, তুমি যেন অপরাধী। এটাও নীরব সহিংসতার একধরনের কৌশল যা কাঠামোর ব্যর্থতাকে ব্যক্তি-নৈতিকতার ব্যর্থতা বানিয়ে দেয়।

এ গল্পে বমির বিবরণ খুব বিস্তারিত। এখানে সহিংসতা দৃশ্যমান রক্তপাত নয়, দেহের ভেতরের ভাঙন। ইলিয়াস লিখছেন: ‘জয়নাব অবিরাম বমি করে। প্রথমে বের হলো ঘোলাটে সাদা ভাত ও পানি। তারপর কেবল পানি। বিবর্ণ পানির ধারা বেরিয়ে আসে প্রবল তোড়ে। মাঝে মাঝে অল্পক্ষণের বিরতি দিচ্ছে। বিরতির পর পরই দ্বিগুণ বেগে বমি আসে। বমির পানিতে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৯১)

এখানে লক্ষণীয় যে, বমির প্রথমে ‘সাদা ভাত ও পানি’, তারপরে ‘কেবল পানি’। খাদ্য ক্রমে অপসৃত হচ্ছে; দেহ নিজেই দেহকে খালি করে দিচ্ছে। এটি ফুকোর biopolitical সহিংসতার টেক্সচুয়াল চিহ্ন: জীবনের ন্যূনতম জিনিসও দেহে টেকে না। এখানকার ‘বিরতি’ ফুকোর ডিসিপ্লিনের মত: দেহ যেন সময়-পর্বে ভেঙে পড়ে; ভাঙনেরও একটা নিয়ম আছে।

আর বমির সঙ্গে ‘বিরতি’র উপস্থিতি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বিরতি এখানে সান্ত্বনা নয়, একে বলা যায়, সংকটকে স্বাভাবিক করে নেওয়ার অভ্যাস। জয়নাবের ‘চোখজোড়া ঢুলুঢুলু। ঠোঁটের কোণে, চিবুকের ডৌলে বমির পানির লালচে ফোঁটা, নীলচে ফোঁটা। এরি মধ্যে ওহিদুল্লার দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে ইঙ্গিত করলে সে এক পা এগিয়ে আসে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ১৯২)

এই ‘তর্জনী তুলে’ আর কথা না বলে ‘ইঙ্গিত করে’ নীরব সহিংসতার মূল লক্ষণ: ভাষা হারিয়ে ফেলা। দেহের কষ্টকে ভাষায় ধরা যায় না, কেবল অঙ্গভঙ্গিতে বোঝা যায়। অর্থাৎ কাঠামোগত সহিংসতা এক পর্যায়ে কমিউনিকেশনের ক্ষমতাও কেড়ে নেয়।

গল্পের শিরোনামেই ইলিয়াস ইঙ্গিত দেন, দুধভাতের (স্বাভাবিক, শিশুখাদ্য, ঘরের শান্তি) জায়গায় এসেছে ‘উৎপাত’। খাদ্যের প্রশ্নটি ঘরের নৈতিক-আবেগীয় ভেতরভাগকে উত্তাল করে; মানুষের ভাষা ও সম্পর্ককে হিংস্র করে তোলে। কিন্তু সেটা কারও অপরাধ নয়, এটা একটি কাঠামো।

এখানে নীরব সহিংসতা তিন ধাপে কাজ করে: অভাব সৃষ্টি (দুধ নেই), দেহ ভাঙে (বমি বা দুর্বলতা), মায়ের জন্য দুধ জোগাড় করতে ব্যর্থতায় ওহিদুল্লা লজ্জিত হয় বা অপরাধবোধে আক্রান্ত হয় (না পারা মানে ব্যর্থতা)। ফুকোর ভাষায় এটা governmentality: মানুষকে আইন দিয়ে নয়, দৈনন্দিন প্রয়োজন ও নৈতিক চাপ দিয়ে শাসন করা।

ইলিয়াসের ‘দোজখের ওম’ গল্পে সহিংসতা কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুদ্ধোত্তর জীবনের ভেতরে দেহগত অনুভূতি, ভাষার সংকোচন এবং স্থায়ী আতঙ্ক হিসেবে কাজ করে। এখানে সহিংসতা শোনা যায় না, দেখা যায় না। কিন্তু শরীরের ভেতরে উষ্ণতা (ওম) হয়ে জমে থাকে। এই উষ্ণতাই গল্পটির নীরব সহিংসতার কেন্দ্র।

গল্পের শুরুতেই ইলিয়াস সহিংসতার মানসিক ব্যাখ্যায় না গিয়ে দেহের অনুভূতি দিয়ে পরিস্থিতি নির্মাণ করেন, ‘আজ অনেকদিন পর কামালউদ্দিনের শরীরের প্রায় গোটাটাই শিরশির করে কাঁপে।’ (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২৯১ ) এই ‘শিরশির করে কাঁপা’ কোনো আকস্মিক ভীতি নয়; এটি দীর্ঘদিনের চেপে রাখা আতঙ্কের দেহগত প্রতিক্রিয়া। এখানে সহিংসতা অতীতের হলেও তার প্রভাব বর্তমান দেহে সক্রিয়। ইলিয়াস দেখান, সহিংসতা শেষ হয়ে গেলেও দেহ তা ভুলে যায় না। তখন বরং শরীরই হয়ে ওঠে সহিংসতার ধারক। এই ধারাবাহিক দেহগত অস্বস্তিই নীরব সহিংসতার প্রথম স্তর।

আবার কখনো ভাষা সংকোচনের মাধ্যমে ইলিয়াস নীরব সহিংসতার বিস্তার ঘটান। যেমন, তখন গল্পে ভাষা ক্রমে ছোট হয়ে আসে; পূর্ণ বাক্যের বদলে সংকেত, প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত জবাব দেখা যায়, “মরার পর প্রথম দিকে এসে আকবরের মাজানলার বাইরের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করতো, ‘লও যাই।’

—‘কৈ?’
— ‘ঐহানে!” (আখতারুজ্জামান, ২০২৩: ২৯৩)

এই তিনটি ক্ষুদ্র উচ্চারণ একটি সমাজের ভাষাচিত্র তুলে ধরে, যেখানে অতিরিক্ত বলা বিপজ্জনক বা অর্থহীন। ‘কৈ?’ প্রশ্নটি কেবল কোনো জায়গা-জিজ্ঞাসা নয়; এটি সন্দেহ ও আত্মরক্ষার ভাষা। এখানে নীরব সহিংসতা কাজ করে ভাষার উপর চাপ হিসেবে: মানুষ কম বলে, ছোট বলে, ইশারায় কথা বলে। ফলে সহিংসতা প্রকাশ্য সংঘর্ষে না গিয়ে ভাষার সংকোচন ঘটিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

গল্পের শিরোনামে থাকা ‘ওম’ শব্দটিও এখানে ধ্বনি নয়। একে বলা যায়, উষ্ণতার অনুভূতি, যা শরীরের ভেতরে জমে থাকে। এই উষ্ণতা আরামদায়ক নয়; এটি দহনকারী। যুদ্ধোত্তর শোক, ভয় ও অনিশ্চয়তা মিলিয়ে যে তাপ তৈরি হয়, তা আগুনের মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।

এই উষ্ণতার ইঙ্গিত গল্পে বারবার দেহের অস্বস্তি, কাঁপুনি ও অস্থিরতায় ফিরে আসে। সহিংসতা তাই এখানে sonic নয় (শব্দে প্রকাশিত নয়), somatic—দেহে অনুভূত। ইলিয়াস সহিংসতাকে দৃশ্য থেকে সরিয়ে অনুভূতিতে স্থানান্তর করেন, তখন তা নীরব হয় বটে কিন্তু গভীরও হয়।

গল্পে পরিচয়, অবস্থান ও নিরাপত্তা, সবই অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে। যখন মানুষ জানে না কে বন্ধু, কে শত্রু, তখন প্রতিটি উচ্চারণ হিসেব করে করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে নীরবতা আত্মরক্ষার কৌশল হয়ে ওঠে। ফলে সহিংসতা আর আলাদা করে প্রয়োগ করতে হয় না; পরিবেশই মানুষকে নিয়ন্ত্রিত রাখে। বলা যায়, ‘দোজখের ওম’–এ নীরব সহিংসতা তিনটি স্তরে কাজ করে: প্রথমত, দেহে: শিরশিরি কাঁপুনি, অস্বস্তি ও উষ্ণতার মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত, ভাষায়: সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ, প্রশ্ন ও সংকেতের মাধ্যমে ও পরিবেশে: অনিশ্চয়তা, সন্দেহ ও স্থায়ী আতঙ্কের মাধ্যমে। এই তিনটি মিলেই ইলিয়াস একটি যুদ্ধোত্তর নরক নির্মাণ করেন, যা আগুনে জ্বলে না, কিন্তু তাপে পোড়ায়।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলোর শেষগুলো প্রায়ই সমাধানহীন। কিন্তু এই সমাধানহীনতা কোনো শিল্পকৌশলগত ফাঁকি নয়; বরং নীরব সহিংসতার কাঠামোর যথার্থ রূপ। কারণ নীরব সহিংসতা মানুষকে হত্যা করে না, মানুষকে স্থগিত করে। জীবন চলতে থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত থেমে থাকে। সময় কাটে, কিন্তু সময় নিজের থাকে না।

তাই বলা যায়, ইলিয়াসের ছোটোগল্পে নীরবতা প্রতিক্রিয়া নয়; নীরবতা হলো condition of existence—অস্তিত্বের শর্ত।

উপন্যাসে ইলিয়াস রাষ্ট্র, ইতিহাস, শ্রেণি-সংঘাতের বড়ো পরিসর দেখান। ছোটোগল্পে তিনি দেখান ঘনত্ব, একটি মুহূর্ত, একটি বাক্য, একটি থেমে যাওয়া নিশ্বাস। উপন্যাসে সহিংসতা কখনো দৃশ্যমান অবকাঠামো নিয়ে আসে; ছোটোগল্পে সহিংসতা অবকাঠামোকে ভেতরে নামিয়ে আনে, মানুষের বাক্য-প্রতিবর্তে, অভ্যাসে, যুক্তিতে, অংশগ্রহণে।

ইলিয়াসের ছোটোগল্পগুলো আমাদের শেখায়, নীরব সহিংসতা একরকম নয়, সে বহুরূপী। কখনো সে ভাষাকে অকথ্য করে, কখনো অভ্যাসে মিশে যায়, কখনো যুক্তিকে ঢাল বানায়, কখনো উৎসবের আলোয় প্রশ্ন ঢেকে দেয়। কিন্তু প্রতিবার ফল এক: মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কণ্ঠকে ছোট করে, তারপর কণ্ঠের প্রয়োজনই ভুলে যায়।

এইখানেই ছোটোগল্পগুলো ভয়ংকর। কারণ তারা সহিংসতাকে নাটকীয় করে তোলে না; তারা সহিংসতাকে স্বাভাবিকতার ভিত হিসেবে দেখায়। এবং স্বাভাবিকতার ভিত হিসেবে সহিংসতা একবার স্থাপন হলে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবচেয়ে কঠিন, কারণ তখন আর বোঝাই যায় না কোন জায়গা থেকে বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

ফলে, ইলিয়াস তাঁর ছোটোগল্পে আমাদের সামনে যে প্রশ্নটা রাখেন, আমরা কি নীরব, নাকি আমাদের নীরব করে রাখা হয়েছে?— তাতে কখনো ইলিয়াসের অনেক চরিত্রকে ‘নিষ্ক্রিয়’ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে তা এক ধরনের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়করণ। চরিত্রসমূহের নিষ্ক্রিয়তা তাদের ব্যক্তিগত চরিত্রদোষ নয়, এটা মূলত ক্ষমতারই নির্মাণ। ক্ষমতা শুধু দমন করে না, ক্ষমতা কখনো অক্ষমও করে দেয়।

৯.
এ লেখার শেষ প্রশ্নটি যদি এমন হয় যে, ইলিয়াস কি তাহলে অতীত?, না-কি তিনি প্রক্রিয়ার লেখক? তাহলে এর জবাব কী হবে? কেননা, ইলিয়াসকে অনেকেই সময়ের খাঁচায় রেখে দিতে চান—উনসত্তর, সামরিক দমন, যুদ্ধ-পরবর্তী শূন্যতা ইত্যাদিতে। কিন্তু এটা তো ঠিকই যে, তিনি ঘটনা লিখেছেন কম; বরং যা লিখেছেন তাকে ক্ষমতার প্রক্রিয়া বলাই সংগত। ক্ষমতা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন আচরণকে বদলায়, সেটাই তাঁর আসল বিষয়। কারণ প্রক্রিয়া বদলায় না সহজে; কেবল মুখ বদলায়, পোশাক বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়।

তাই ইলিয়াসকে ‘অতীত’ বলে দিলে হয়তো একধরনের নিরাপত্তার বোধ আসে, যেন বই বন্ধ করলেই চাপটা চলে যাবে। কিন্তু ইলিয়াসের সাহিত্যে চাপটা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না; চাপটা পাঠকের শরীরে উঠে আসে। এই ‘শরীরে ওঠা’টা রাজনৈতিক, কারণ ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত মানুষের শ্বাস-চলাচল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়: কে কতটুকু কথা বলবে, কতটা বলবে, কোথায় বলবে, কাকে শুনিয়ে বলবে, আর কাকে গোপনে বলবে।

এইখানে, এই সুনির্দিষ্ট পরিসরে ইলিয়াস আমাদের সমকালীন, কারণ আজও সহিংসতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ খুব বড়ো ঘটনার মধ্যে নেই, আছে ভাষা, নীরবতা, স্ব-সম্পাদনার ভেতরে।

আগেই বলেছি, ইলিয়াস গ্রামকে তথাকথিত ‘সরল’ করে নির্মাণ করেননি। গ্রামকে তিনি দেখান এমন এক পরিসর হিসেবে, যেখানে কথা বলা মানে কেবল বাক্য উচ্চারণ নয়, কথা বলা মানে সামাজিক আদালতে দাঁড়ানো। খোয়াবনামার দুনিয়ায় নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়; নীরবতা এক ধরনের সামাজিক জ্ঞান: কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না।

আজকে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সবচেয়ে বড়ো বিভ্রম: ‘এখন সবাই কথা বলে।’ সত্যি, সবাই লিখছে, স্ট্যাটাস, পোস্ট, থ্রেড, রিল ইত্যাদি। কিন্তু ইলিয়াসের চোখ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কথা বলা আর কণ্ঠ পাওয়া এক জিনিস নয়। ডিজিটাল যুগে কথা বলার পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু কণ্ঠের ‘ওজন’ কমে। কারণ কণ্ঠ এখন অ্যালগরিদমের বিচারে দৃশ্যমান হয়, আর অ্যালগরিদমের কাছে কণ্ঠ মানে নৈতিকতা নয়, কণ্ঠ মানে এনগেজমেন্ট। ফলে মানুষ শিখে নেয় নিরাপদ ভাষা: স্পষ্ট অভিযোগ নয়, ইঙ্গিত; নাম নয়, ছায়া; প্রতিবাদ নয়, রসিকতা; সত্য নয়, ‘আমি শুধু জিজ্ঞেস করছি’ প্রভৃতি। এটা ইলিয়াসীয় নীরবতার আধুনিক রূপ: কথা বলেও না বলা। এটা এমন এক নীরবতা, যেখানে মানুষ নিজে নিজেই নিজের বাক্যকে শান দিয়ে ভোঁতা করে, এমন ভোঁতা যে, কাটে না, কেবল আঁচড় লাগে।

ইলিয়াস আমাদের দেখিয়েছিলেন, নীরবতা শুধু রাষ্ট্র-ভয় থেকে আসে না; নীরবতা আসে সমাজের ভেতরের বিচারের ভয় থেকেও। আজ সেই বিচার আগের চেয়ে বেশি দ্রুত: কমেন্ট সেকশন, স্ক্রিনশট, শেয়ার, ট্রল মিলিয়ে একধরনের জনসম্মুখে আদালত বা আদালতও নয় একধরনের মব-বিচার। এই ঘটনাটাকে সামাজিক বিজ্ঞানীরা বহু আগে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ নামে ব্যাখ্যা করেছেন, যখন মানুষ মনে করে তার মতটি সংখ্যালঘু, তখন একঘরে হওয়ার ভয়ে সে চুপ থাকে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ‘Spiral of Silence’ রিপোর্টেও এই ভয় (অস্ট্রাসিজম বা রিডিকিউল) আত্ম-সেন্সরশিপের বড়ো কারণ বলে দেখানো হয়েছে।

ইলিয়াস এই তত্ত্ব জানতেন কিনা জানি না, কিন্তু তাঁর সাহিত্য এই তত্ত্বের মানবিক সত্য উন্মোচন করেছে: চুপ থাকার সবচেয়ে তীব্র কারণ অনেক সময় বন্দুক নয়, একাকিত্ব।

ডিজিটাল সংস্কৃতিতে একাকিত্বের ভয় আরও শক্তিশালী, কারণ ‘কমিউনিটি’ এখন শুধু পাড়া বা অফিস নয়; কমিউনিটি এখন ফিড। ফিডে তুমি একা হয়ে গেলে, তোমার পরিচয়ও একা হয়।

ইলিয়াসের সমকালে মানুষ ভয় পেত, কেউ শুনছে কি না। আজ মানুষ ভয় পায়, সবকিছু রেকর্ড হয়ে আছে কিনা। এটাই ডিজিটাল যুগের বড়ো মোড়: ভয় আর এখন অনুমান নয়, ইনফ্রাস্ট্রাকচার। কারণ একধরনের নজরদারির আবর্তে আমরা ঢুকে পড়েছি। এই নজরদারি-চেতনা মানুষের আচরণ বদলে দেয়। ‘চিলিং ইফেক্ট’ হিসেবে এটা গবেষণায় বারবার এসেছে। ‘Digital Dataveillance’ নিয়ে একটি গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে, ডিজিটাল নজরদারির অনুভূতি মানুষকে নিজের যোগাযোগ সীমিত করতে বাধ্য করে, যা মূলত দৈনন্দিন স্ব-সেন্সরশিপ।

‘ফ্রিডম হাউস’ নামের একটি গবেষণা সংস্থা দেখিয়েছে, এআই ও ডেটা-চালিত প্রযুক্তি ডিজিটাল দমনকে ‘সহজ, দ্রুত, সস্তা, কার্যকর’ করে তুলতে পারে, অর্থাৎ দমননীতি এখন স্কেলিং হয়।   

এছাড়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক নানা রিপোর্ট/ব্রিফিং ‘চিলিং ইমপ্যাক্ট’ অর্থাৎ আইন বা প্রক্রিয়া বা হয়রানির আশঙ্কায় সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশ শীতল হয়ে আসে, এই কথাই সামনে এনেছে। ফলে, ইলিয়াসের সাহিত্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, আগে পুলিশ ছিল রাস্তায়; এখন পুলিশ অনেক সময় মাথার ভেতরে। আর মাথার ভেতরের পুলিশকে ছুটি দেওয়া সবচেয়ে কঠিন।

ইলিয়াস খোয়াবনামায় দেখিয়েছেন, গ্রামে গুজব শুধু কথা নয়; গুজব ক্ষমতা। কারণ গুজব উৎসহীন, দায়হীন, কিন্তু কার্যকর। ডিজিটাল যুগে অ্যালগরিদম-চালিত ভাইরালিটি ঠিক এমনই: উৎস হারিয়ে যায়, দায় পাতলা হয়, কিন্তু প্রভাব বিপুল হয়। যে কথা ভাইরাল হয়, সেই কথাই অনেক সময় ‘সত্য’ হয়ে দাঁড়ায় ফ্যাক্টের কারণে নয়, দৃশ্যমানতার কারণে।

ফলত, ইলিয়াস-সাহিত্য আজও ভয়ানকভাবে প্রাসঙ্গিক এজন্য যে, গ্রামের গুজব মানুষকে যেভাবে চুপ করাতো, আজ ভাইরালিটি মানুষকে সেভাবেই চুপ করায়। কেউ বলার আগে ভাবে: ‘যদি কেউ ভুলভাবে বোঝে!’, ‘কেউ যদি ক্লিপিং করে ছড়িয়ে দেয়!’, ‘কনটেক্সট যদি উধাও হয়ে যায়!’ ইত্যাদি। এই ‘কনটেক্সট-ভয়’ই নতুন নীরবতা। আর তাই আজকের নীরবতা অনেক সময় ‘সাহসের অভাব’ নয়; এটা ‘কনটেক্সটের অনিশ্চয়তা’।

এই লেখায় এর আগেই আমরা দেখিয়েছি, ইলিয়াস ‘ভদ্রলোকী রাজনীতি’কে কেমন সন্দেহের চোখে দেখেন। বর্তমান বাস্তবতায় সেই একই ভদ্রতা নতুন পোশাক পরেছে: ‘be civil’, ‘tone matters’, ‘community standards’ প্রভৃতি। কিন্তু সমস্যা হলো যেভাবে ভদ্রতার মানদণ্ড নির্ণীত হয়, তাতে যারা ক্ষমতার কাছাকাছি, তাদের ভাষা ‘ভদ্র’ আর প্রান্তিকের ভাষা হয় আক্রমণাত্মক। ফলে প্রান্তিক-অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয় না, কারণ তাদের প্রকাশের ভাষাই অগ্রহণযোগ্য। এখানে ইলিয়াসের সাহিত্যে এটা একটা বার্তার মতো কাজ করে যে, সহিংসতা শুধু নিষেধ নয়, সহিংসতা কখনো ভাষার শুদ্ধতার নামে ব্যবহৃত হয়। যখন বলা হয় ‘ঠিকভাবে বলো’, তখন অনেক সময় আসলে বলা হয় ‘এইভাবে বলো না।’

খোয়াবনামাতেও আমরা দেখি, তমিজের বাপের গলা থেমে যায়, বলা কঠিন হয়ে পড়ে। এই চুপ করে থাকা কোনো শারীরিক সমস্যা নয়, এটা সামাজিক চাপের ফল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ‘ঠিকভাবে বলো’ মানে: রাগ দেখিয়ো না, তীব্রতা দেখিয়ো না, নাম নিয়ো না; অর্থাৎ সত্যকে ধারহীন করো। সত্য শিথিল হলে ক্ষমতা আরামে থাকে।

তাহলে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমরা কীভাবে পড়ব? ইলিয়াসকে পড়ার ম্যানুয়েল তৈরি করা যদিও এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যেকেউ যেকোনোভাবে ইলিয়াসকে পড়তে পারে। তবে, ইলিয়াসকে ইলিয়াসের মতো করে পড়ার জন্য কয়েকটি নতুন লেন্স ব্যবহার করলে আরওকিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে হয়। যেমন, লেন্সগুলো এমন হতে পারে:

  1. K) ইলিয়াস =‘আত্ম-সেন্সরশিপের কথাসাহিত্যিক ভূগোল’

তিনি দেখান, মানুষ কীভাবে নিজের কথাকে নিজেই কেটে দেয়। আজকের প্রেক্ষাপটে এই জায়গাটাতে ইলিয়াসকে আমরা ডিজিটাল মনস্তত্ত্বের লেখক হিসেবেও পড়তে পারি।

  1. L) ইলিয়াস = ‘নীরবতার অবকাঠামো’-এর লেখক

নীরবতা কারা তৈরি করে, রাষ্ট্র, সমাজ, শ্রেণি, আইন, প্ল্যাটফর্‌ম, অ্যালগরিদম মিলিয়ে একধরনের অবকাঠামো। ফ্রিডম হাউসের গবেষণায় যেভাবে এআইকে ডিজিটাল দমনের অ্যাম্প্লিফায়ার বলছে, ইলিয়াসীয় পাঠ সেই অবকাঠামোকে মানবিক করে দেখতে শেখায়।

  1. M) ইলিয়াস = ‘ভাষার নৈতিকতা’র লেখক

তিনি আমাদের ভালো মানুষ বানান না; তিনি আমাদের স্বস্তি কেড়ে নেন। এই স্বস্তিহীনতাই তাঁর নৈতিকতা, ভুয়া আশায় আশান্বিত করা নয়, বরং নির্মম স্পষ্টতা।

ফলে ডিজিটাল যুগে নীরবতা আর শুধু ‘চুপ’ নয়; নীরবতা হলো, স্ব-সম্পাদনা, নিরাপদ ভাষা, কনটেক্সট-ভয়, অ্যালগরিদমিক ভদ্রতা, নজরদারি-চেতনা প্রভৃতি। কারণ, ইলিয়াস আমাদের চিৎকার করতে নয়, নীরবতাকে আগে চিনতে বলেন। আর সেই চেনাটা আনন্দের নয়, বিপজ্জনক। কারণ নীরবতাকে একবার চিনে ফেললে, নীরব থাকা আর নির্দোষ থাকে না।

১০.

এই বিবিধ-বিখণ্ডিত লেখার শেষে আমরা এটা বলতে পারি যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সত্যি আমাদের কোনো বিপ্লবের নকশা দিয়ে যাননি। এমনকি কোনো মুক্তির গানও নয়। তিনি আমাদের চেঁচাতেও বলেননি। তাহলে তিনি কী করেছেন? তিনি কেবল একটি আয়না ধরেছেন আমাদের চোখের সামনে।

এই আয়নায় আমরা দেখি, কোথা থেকে এসেছে আমাদের নীরবতা,

কীভাবে তৈরি হয়েছে, কাদের স্বার্থে কাজ করছে। এই আয়নায় তাকানো কঠিন। কারণ এই আয়নায় আমরা এক অপ্রিয় সত্যকে দেখতে পাই, আমরা কেবলই নীরবতার ভুক্তভোগী নই, কখনো কখনো আমরাই নীরবতার সহ-উৎপাদক।

 

গ্রন্থাবলি

  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ২০০৮। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ২। মাওলা ব্রাদার্স। ঢাকা।
  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ২০২৩। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গল্পসমগ্র । মাওলা ব্রাদার্স। ঢাকা।

ইন্টারনেট তথ্য

  • পিউরিসার্চ ডট কম/ দ্য স্পাইরাল সাইলেন্স অন সোশ্যাল-মিডিয়া
  • জার্নালস ডট সেইজপাব ডট কম/ doi/10.1177/20539517211065368
  • ফ্রিডমহাউজ ডট ওআরজি/ এক্সপান্ডিং অ্যান্ড ডিফেন্ডিং ফ্রিডম এরাউন্ড ওয়ার্ল্ড