৬.
এ লেখায় আমরা এটা স্পষ্ট করতে চাই যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যে নীরবতা কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত অভ্যাস বা মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নয়; নীরবতা এক ধরনের সম্পর্ক-নিয়ন্ত্রক শক্তি। এই শক্তি কখনো আত্মরক্ষার কৌশল, কখনো আধিপত্যের কৌশল, আবার কখনো ভাঙনের চিহ্ন। এই ভাঙন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখনই, যখন আমরা তাঁর পুরুষ চরিত্রসমূহের দিকে তাকাই। তার আগে বলে নেওয়া দরকার, এ লেখায় ইলিয়াসের সাহিত্যের সামূহিক ‘পুরুষ’কে আমরা বরং ‘পুরুষতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী। একে ‘পৌরুষ’ বা ‘পুরুষত্ব’ বলা যেত, কিন্তু তাতে ‘পুরুষতা’কে আমরা যে জৈবিক সত্য নয়, বরং সমাজ-নির্মিত ক্ষমতা-ব্যবস্থা হিসেবে সনাক্ত করতে চাই, তা করা যেত না। অথচ ইলিয়াসের সাহিত্যে পুরুষ যেভাবে অবহেলা করে, অস্বীকার করে, চাপা সিদ্ধান্ত দিয়ে, ছোট করে, নিঃসঙ্গ করে অদৃশ্যভাবে যেসব সহিংসতা ঘটায়, এই অদৃশ্য সহিংসতা বুঝতে গেলে ব্যক্তি ‘পুরুষ’টিকে নয়, তার পুরুষতাকে বোঝা জরুরি। কারণ ‘পুরুষতা’ বায়োলজিক্যাল বা ‘পুরুষ মানেই পুরুষ’ ধরনের ধারণা নয়। এখানে পুরুষতা মানে: সমাজ যে-ধরনের ভূমিকা, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কথাবলার অধিকার পুরুষের ওপর আরোপ করে, সেই সামাজিক নির্মাণ।
কিন্তু ‘পৌরুষ’ বললে আমাদের প্রথমে মনে আসে পুরুষের সাহস বা বীরত্ব। ইলিয়াসের সাহিত্যের ‘নীরব সহিংসতা’ আলোচনায় সেটা বরং বিপজ্জনক হতো। কারণ, তখন পুরুষের বীরত্ব খোঁজাটাই জরুরি হয়ে উঠতো। ‘পুরুষতা’ শব্দটি সেই নৈতিক মহিমা দেয় না। ফলে, আমাদের পক্ষে একথা বলা সহজ হয় যে, নীরবতা ক্ষমতার ভেতরের সেই প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়াটিই কখনো সহিংস হয়ে ওঠে। পুরুষত্ব বা পৌরুষ বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে পুরুষকে একটা স্থির অবস্থানে বসিয়ে দেয়, যেন পুরুষ মানেই কিছু নির্দিষ্ট গুণ বা স্থিতি। কিন্তু ইলিয়াসের পুরুষ চরিত্ররা প্রায়ই ভাঙা, দ্বিধাগ্রস্ত, বিচ্ছিন্ন, অপরাধবোধে জর্জরিত, কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া। ‘পুরুষতা’ শব্দটি দিয়ে তখন বোঝানো যায়, পুরুষ চরিত্ররা যা করে তা তাদের জৈবিক পুরুষ হওয়ার ফল নয়। তারা যে সামাজিক পুরুষতা বহন করছে, তার চাপ বা সুযোগের ফল।
এজন্য ‘পুরুষতা’ শব্দটি জরুরি। কারণ, তাহলে আমরা ইলিয়াসের সাহিত্যে নীরব সহিংসতাকে ব্যক্তি-মন নয়, ক্ষমতার বিন্যাস হিসেবে পাঠ করতে পারবো।
বাংলাদেশের সমাজে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, রাষ্ট্রীয় আধুনিকতা ও পিতৃতন্ত্র মিলিয়ে পুরুষের প্রতি একটি প্রচলিত ‘প্রত্যাশা-প্যাকেজ’ থাকে। এই প্যাকেজে সাধারণত তিনটি স্তম্ভ কাজ করে: ক) কণ্ঠ, মানে পুরুষ ‘কথা বলতে পারে’; তার কথা শোনা হয় (বা শোনার কথা); তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় (বা দেওয়ার কথা); খ) কার্যক্ষমতা, পুরুষ শুধু কথা বলবে না, কিছু করবে; সিদ্ধান্ত নেবে; সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে; সংকটে ‘কাজের লোক’ হবে এবং গ) কর্তৃত্ব-দায়িত্ব, পরিবার-সমাজের সামনে ‘কর্তা’; দায়িত্ব নেবে, রক্ষা করবে, নেতৃত্ব দেবে; তার উপস্থিতি মানে ‘কিছু একটা স্থিতি’। মূলত এই তিনটি একসঙ্গে মিলে ‘পুরুষতার ভিত’ তৈরি করে দেয়।
আর ‘নীরব সহিংসতা’ বলতে আমরা যা বলতে চাই, তার মূল কথা ক্ষমতা (রাষ্ট্র-সমাজ-শ্রেণি-প্রথা), যা মানুষকে সরাসরি মারার আগেই তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়। বিশেষ করে তার কণ্ঠ ও কার্যক্ষমতা কেড়ে নেয়। কেড়ে নেওয়া মানে এখানে সবসময় আইন করে নিষেধাজ্ঞা নয়। বেশিরভাগ সময় এটা ঘটে পরিবেশ তৈরি করে। যেমন, কথা বললে ঝামেলা; কথা বললে চাকরি বা সম্মান বা সম্পর্ক নষ্ট; কথা বললে ‘অশালীন’ বা ‘উগ্র’ বা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’তকমা; কথা বললেও অবশ্য কিছু বদলায় না। এভাবে ক্ষমতা মানুষকে শেখায় যে, চুপ থাকাই নিরাপদ, বলার কোনো মানে নেই।
এখানে লক্ষ করবার বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় আঘাতটা প্রথমে পড়ে কণ্ঠে। তারপর কার্যক্ষমতায়। আর এই দুইটা জিনিসই যেহেতু সমাজ পুরুষতার প্রধান কাঠামো হিসেবে দেখায়, তাই পুরুষের কণ্ঠ-কার্যক্ষমতা ভাঙা মানে পুরুষতার ভিত ভেঙে দেওয়া। আর পুরুষতার ভিত ভাঙা মানে নীরব সহিংসতা সফল।
ইলিয়াসকে বুঝতে হলে কথা বলতে পারা ও কথা বলার ক্ষমতা বা অধিকার কী তা বুঝতে হবে। অনেক চরিত্রই ‘কথা বলতে পারে’। তারা বাক্য বানায়, তর্ক করে, যুক্তি দেয়। কিন্তু তাদের কথা শোনা হয় না, বা শুনে অগ্রাহ্য করা হয়, বা শুনে বিপদ তৈরি হয়, বা শুনে কিছুই বদলায় না তাই তাদের কণ্ঠ ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ইলিয়াসের ভয়টা এখানেই: অকার্যকর কণ্ঠ। এবং অকার্যকর কণ্ঠই একসময় আত্ম-সেন্সরশিপের জন্ম দেয়: মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠকে কাটছাঁট করতে শুরু করে, এটাই ‘নীরব সহিংসতা’র ক্লাইম্যাক্স।
কার্যক্ষমতা মানে শুধু সাহস নয়। কার্যক্ষমতা মানে কাজ করলে ফল হবে—এই বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের সামাজিক ভিত্তি। ইলিয়াস দেখান, ক্ষমতা প্রথমে এই বিশ্বাসটাই ভাঙে: সংগঠন আছে, কিন্তু কাজ হয় না; নেতা আছে, কিন্তু নেতৃত্ব ধোঁয়াশা; প্রতিবাদ আছে, কিন্তু ফল নেই; নৈতিকতা আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নেই। ফলে চরিত্রের ভেতরে জন্ম নেয় সবচেয়ে বিষাক্ত বাক্য ‘আমি জানি, কিন্তু আমি কিছু করতে পারি না।’ এই বাক্যটা যখন স্থায়ী হয়, তখন মানুষ কেবল চুপ করে না, মানুষ নিজের ভেতরেই পরাজিত হয়ে যায়।
ফলে, ইলিয়াসকে ‘নীরব সহিংসতা’ হিসেবে পড়তে গেলে পুরুষ চরিত্ররা ‘কেস স্টাডি’ হয়ে ওঠে, কারণ সমাজ পুরুষের কাছে একটা অতিরিক্ত দাবি করে: তুমি পুরুষ, তোমাকে কিছু করতে হবে; তুমি পুরুষ, তোমাকে রক্ষা করতে হবে; তুমি পুরুষ, তোমাকে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু যখন ক্ষমতার কাঠামো (রাষ্ট্র বা শ্রেণি বা প্রথা) তার কাজ করার জায়গা কেটে দেয়, তখন পুরুষ চরিত্রের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়ে: ক) বাইরের চাপ: রাষ্ট্র বা সমাজ বা অর্থনীতি, খ) ভেতরের চাপ: ‘আমি পুরুষ হয়েও পারছি না কেন?’ ইত্যাদি।
এই দ্বিগুণ চাপ থেকেই ইলিয়াসের সাহিত্যে পুরুষ চরিত্রদের মধ্যে দেখা যায়, দ্বিধা, লজ্জা, আত্মঘৃণা, অস্থিরতা, অকার্যকর কথাবার্তা এবং শেষে নীরবতা। এটা পুরুষের মানসিকতার সস্তা ব্যাখ্যা নয়; বরং এটা দেখায়, ক্ষমতা মানুষের পরিচয়ের গভীরে ঢুকে গিয়ে কীভাবে তাকে ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়।
ইলিয়াসের শিল্পকৌশলের একটা চমকপ্রদ দিক এটাই যে, তিনি পুরুষতাকে নৈতিক ভাষায় নয়, কার্যকারিতার ভাষায় শনাক্ত করেন। নৈতিকতা থাকলেই পুরুষতা দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় তখনই, যখন নৈতিকতা বাস্তবকে নাড়াতে পারে। আর ইলিয়াসের পুরুষ চরিত্ররা সেই জায়গাতেই বারবার ব্যর্থ হয়, এটাই তাদের ট্র্যাজেডি। যেমন চিলেকোঠার সেপাই-এ ওসমান অনেক কথা বলে, কিন্তু কথার অর্থ ধোঁয়াশা হয়ে যায়। কথার ভেতরেই থাকে অদ্ভুত অর্থহীনতা। যেন, একধরনের ‘শব্দ আছে, কিন্তু কণ্ঠ নেই’ পরিস্থিতি। এক জায়গায় আনোয়ারের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওসমান সারাক্ষণ কথা বলে:
সে তো সবসময় কারো না কারো সঙ্গে কথা বলেই চলেছে। তার পছন্দমতো লোক সে বেছে নেয়, কিংবা তার কপালগুণে পছন্দসই লোকজন তার চোখের সামনে আসে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে জটিল মাথা আরো জটিল করে তোলে। তার কথাবার্তা বেশির ভাগই অস্পষ্ট। উচ্চারণের ভঙ্গি থেকে মনে হয় আজ বোধ হয় খুব কবিতা আবৃত্তি করছে, কবিতার কোনো শব্দই বোঝা যায় না, তবে এটুকু ধরা যায় যে তার বেশির ভাগ শব্দই ২ সিলেবলের।’(আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৩১৫)
এই অস্পষ্টতা কেবল তার ব্যক্তিগত মানসিক-বিভ্রান্তি নয়। সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না; বিশ্লেষণ করে, কিন্তু কাজ করতে পারে না। তার কণ্ঠ আছে, কিন্তু তার কণ্ঠের ওজন নেই। এই অকার্যকর কণ্ঠই ধীরে ধীরে তাকে নীরবতার দিকে ঠেলে দেয়। এখানে নীরবতা কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি ক্ষমতার তৈরি এক মানসিক অবস্থা।
এই অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় কার্যক্ষমতার ভাঙন। কার্যক্ষমতা মানে কেবল সাহস নয়; কার্যক্ষমতা মানে কাজ করলে কিছু ঘটবে, এই বিশ্বাস। ইলিয়াস দেখান, ক্ষমতা প্রথমে এই বিশ্বাসটাই ভেঙে দেয়। ফলে, চরিত্রের ভেতরে জন্ম নেয় স্থায়ী অক্ষমতার বোধ। এই অক্ষমতা পুরুষতার সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, কারণ সমাজ পুরুষের কাছে ‘কিছু করা’-র প্রত্যাশা করে। যখন সে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, তখন তার নীরবতা কেবল রাজনৈতিক নয়, অস্তিত্বগত হয়ে ওঠে।
ইলিয়াস এখানে একটা রাজনৈতিক সত্যকে শিল্পে পরিণত করেন: চাপের ভেতরে ভাষা ধোঁয়াশা হয়। রাষ্ট্র-সমাজ-শ্রেণির চাপ মানুষকে প্রথমে চুপ করায় না, বরং মানুষকে এমনভাবে কথা বলায়, যাতে কথা বলেও যেন সে আসলে কিছু বলে না। যেন মানুষ ক্রমে নিজেই নিজের ভাষাকে নিরাপদ বানিয়ে ফেলে।
আর এখানেই পুরুষতার সংকট: পুরুষতা সমাজে স্পষ্ট উচ্চারণের প্রতীক, কিন্তু ওসমানের উচ্চারণ স্পষ্ট নয়। ফলে ওসমান পুরুষতার এক অদৃশ্য লজ্জার মধ্যে পড়ে যায়: সে সচেতন, সে শিক্ষিত—তবু তার কথার কোনো স্থিরতা নেই। তার কণ্ঠের ভিতরে যেন সারাক্ষণই পুলিশি প্রশ্ন: ‘এটা বলা যাবে তো?’
ইলিয়াস ওসমানকে নায়ক বানান না। তিনি ওসমানকে ব্যবহার করেন একটি শ্রেণির মানস-সত্তা হিসেবে। এই শ্রেণি জানে অনেককিছু, কিন্তু জানার মতো করে বাঁচতে পারে না। এটা রাজনৈতিক অক্ষমতা এবং পুরুষতার ভাঙনও বটে।
খোয়াবনামা-য় এই ভাঙন আরও নির্মমভাবে প্রকাশ পায়। গ্রামীণ সমাজে পুরুষতা ঐতিহ্যগতভাবে কর্তৃত্ব ও রক্ষার ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এখানে প্রথা, গুজব, সামাজিক অপবাদ এবং শ্রেণিগত ক্ষমতা পুরুষদের এমন অবস্থায় নিয়ে আসে, যেখানে তারা কথা বলতে ভয় পায়, সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। একজন ছেলে যখন বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি মুখ খোলো না কেন?’ তখন সেটি কেবল পারিবারিক সংলাপ থাকে না; সেটি পুরুষতার ভিতের ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। এই নীরবতা এখানে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি সামাজিক সহিংসতার ফল, যা পুরুষকে তার ঐতিহ্যগত কণ্ঠ ও কার্যক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এই কারণেই পুরুষতা ইলিয়াসের সাহিত্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ নীরব সহিংসতা যদি এমন মানুষদেরও কণ্ঠহীন করতে পারে, যাদের সমাজ ঐতিহাসিকভাবে ‘কণ্ঠবান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তবে সেই সহিংসতার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। ইলিয়াস এখানে নারীর নিপীড়নকে অস্বীকার করেন না; বরং দেখান, ক্ষমতা কতটা সর্বগ্রাসী যে, সে পুরুষতার সামাজিক ভিতকেও ভেঙে ফেলতে পারে।
এইভাবে কণ্ঠ ও কার্যক্ষমতার ভাঙন ইলিয়াসের সাহিত্যে নীরব সহিংসতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ হয়ে ওঠে। মানুষ চুপ থাকে শুধু ভয়ের কারণে নয়; মানুষ চুপ থাকে কারণ তার ভেতরে বিশ্বাস জন্মেছে, কথা বলে কিছু হয় না। এই বিশ্বাসই নীরব সহিংসতার চূড়ান্ত সাফল্য।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যে পুরুষতার ভিত (কণ্ঠ ও কার্যক্ষমতা) যখন ভেঙে পড়ে, তখনই নীরব সহিংসতা সবচেয়ে কার্যকর হয়। কারণ ক্ষমতা তখন মানুষের শরীর নয়, মানুষের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিটাই দখল করে নেয়।
ফলে, ‘নীরব সহিংসতা’কে কেবল ‘চুপ করানো’ বললে, তা অনেকখানি বিমূর্ত হয়ে পড়ে। এজন্যই আমাদের পুরুষতা, কণ্ঠ ও কার্যক্ষমতার ফ্রেমকে যুক্ত করে দেখানো দরকার। তাহলে তখন, সহিংসতা ব্যক্তিত্ব বদলে দেবে, অস্তিত্ব বদলে দেবে এবং এমনকি পরিচয়ও বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ, সহিংসতা তখন কেবল আর বাহ্যিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, সহিংসতা মানুষের ভেতরের কাঠামো ভেঙে দেয়। ইলিয়াসকে ‘নতুনভাবে চেনানো’ ঠিক এখানেই।
৭.
ইলিয়াস তাঁর সাহিত্যে কেবল মানসিক দ্বিধার রূপায়ণ করেন না, দ্বিধাকে দেহভাষায় রূপান্তর করেন। চিলেকোঠার সেপাই-এ ওসমানের অস্থির তৎপরতা দেখা যায়:
ওসমানের লাফ দেওয়ার গতি ও তীব্রতা ক্রমে বাড়ে। হাইজাম্পে ওর অসাধারণ দক্ষতা দেখে আনোয়ার ও আলতাফ মুগ্ধ। তবে এই দক্ষতা আরেকটু বাড়লেই ছাদের রেলিংটপকে ওসমান নির্থাৎ নিচে পড়ে যাবে। ওকে ধরার জন্য তাই ২ জনেই দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু ওসমান প্রতি পলকে জায়গা বদলাচ্ছে। তাছাড়া আরো মুশকিল আছে। পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহের অনুকরণে নিজের শরীরকে অক্ষ হিসাবে ব্যবহার করে ওসমান ঘোরে আহ্নিক গতিতে এবং এভাবে ঘুরতে ঘুরতে, বরং বলা যায় ঘুরপাক খেতে খেতে চক্রাকারে আবর্তিত হয় ছাদের অনেকটা জায়গা জুড়ে। এই শেষ তৎপরতাটিকে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহের বার্ষিক গতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে পৃথিবী ও অন্যন্য গ্রহ ওসমানের মতো ওপরদিকে লাফায় কি-না তা আনোয়ার বা আলতাফের জানা নাই। এরা ২ জনেই তার পিছে ঘুরছে, তার ২টো উপগ্রহের মতো তার মাধ্যাকর্ষণ এলাকার মধ্যেই থাকছে, কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে পাচ্ছে না।’(আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৩১৬)
ওসমানের এই লাফ এবং ঘূর্ণন নিছক স্টাইল নয়। ইলিয়াস হয়তো বলতে চান, আধুনিক পুরুষের ভিতরে একটা কেন্দ্র-হারানো ব্যাপার আছে। সে নিজের শরীরকে ‘অক্ষ’ বানায়, কারণ সামাজিক-রাজনৈতিক পৃথিবীতে তার আর কোনো নিশ্চিত অক্ষ নেই। যে পুরুষ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কেন্দ্র তৈরি করতে পারত, সে এখন কেন্দ্র বানাচ্ছে শরীরের অস্থিরতায়। এখানে নীরব সহিংসতা শরীরকে দখল করে। পুরুষতার পুরোনো সংজ্ঞা ছিল, ‘স্থিরতা, নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্ব’; ইলিয়াস সেখানে হাজির করেন, ‘অস্থিরতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা, ভাঙা ছন্দ’। ফলে পুরুষতা নিজেই নিজের বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়।
এখন প্রশ্ন হলো কেন এই পুরুষতা নিজের বিপরীতে দাঁড়ায়? ইলিয়াসের এর যে জবাব তৈরি করেন, পুরুষতা নিজের বিপরীতে দাঁড়ায়, কারণ ঝুঁকি নেওয়ার মূল্য মধ্যবিত্ত পুরুষের জন্য এক রকম, আর প্রান্তিক মানুষের জন্য আরেক রকম। মধ্যবিত্ত পুরুষের ঝুঁকি নেওয়া মানে চাকরি, ভদ্রতা, সামাজিক অবস্থান, সবকিছু একসঙ্গে বাজি রাখা। তাই সে ঝুঁকি নেয় না, না নেওয়ার ‘কারণ’ তৈরি করে।
চিলেকোঠার সেপাই-এ আনোয়ারের ভেতরের ক্লান্ত চিন্তার ধারাটা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সে প্রতিরোধের মানসিক হিসাব করতে করতে অবসাদে পড়ে। এভাবে ইলিয়াস পুরুষতার রোমান্টিসিজম ভেঙে দেন। প্রতিরোধ কোনো সিনেমাটিক নায়কোচিত ব্যাপার নয়; এটা দীর্ঘ শ্রম, দীর্ঘ অপমান, দীর্ঘ ব্যর্থতার সমষ্টি। যারা এই দীর্ঘতার ভেতরে দাঁড়াতে পারে না, তারা নীরব হয়ে যায়। নীরবতা এখানে কাপুরুষতা নয়, এটা ক্লান্তির, অবসাদের এবং নিজের নিরাপত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার রাজনীতি।
খোয়াবনামা-তে ইলিয়াস পুরুষতার সংকটকে গ্রামীণ পরিসরে টেনে নেন। এখানে পুরুষতার মাপকাঠি ভিন্ন, এখানে পুরুষ মানে শুধু কথা বলা নয়; পুরুষ মানে সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অপমানকে ভাষায় রূপ দেওয়া। কিন্তু সেই ভাষাও সহজে আসে না। এক জায়গায় তমিজ তার বাবাকে ঝাঁকিয়ে বলে, ‘বাজান, তুমি মুখ খোলো না কিসক গো? তোমার ভয় কী? অতো ভয়পাদুরা হলে ক্যাংকা করা হবি? (আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৫২৪) এই বাক্যটি শুধু পারিবারিক দৃশ্য নয়; এটা এক ধরনের সামাজিক আদালত। ছেলে বাবাকে পুরুষতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে: তুমি কেন চুপ? তুমি কেন ভয় পাও? আর ঠিক এখানেই ইলিয়াস দেখান, পুরুষতার সবচেয়ে ভয়ংকর সহিংসতা: নিজের লোকের কাছে অপদস্থ হওয়া।
তমিজের বাবার নীরবতা আসলে এক ধরনের ট্রমা-লক। সে বলতে গেলে ‘গলা তার নিচু হতে হতে এতই ঝাপসা হয়ে আসে যে শ্রোতাদের ধৈর্য থাকে না, কে একজন চেঁচিয়ে বলে, গলা ছাড়া কথা কও গো। চিপা চিপা আও করো, কানোত সান্ধায় না।’? (আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৫২৫)
এখানে সহিংসতা কীভাবে কাজ করছে দেখা যাক। একজন মানুষ আঘাতের স্মৃতি বলতে চাইছে; কিন্তু তার গলা নিচু, অর্থাৎ ভাষা আটকে যাচ্ছে; সমাজ তাকে ‘ঠিকমতো বলো’ বলে চাপ দিচ্ছে; ফলে স্মৃতি বলা নয়, স্মৃতি বলা হয়ে ওঠে আরেক দফা বিচার। এটাই নীরব সহিংসতার পুনরুৎপাদন। আঘাতের পরে সমাজ যখন আঘাতের বয়ান চায়, তখন সেই বয়ানও একটা শাস্তি হয়ে ওঠে।
খোয়াবনামার ওই অধ্যায়ে আরও তীব্র জায়গা আছে: তমিজের বাবা বর্ণনা দেয়, তার ঘাড়ে বাড়ি পড়েছে, তাকে গালি দেওয়া হয়েছে; আর তার কথা উচ্চকণ্ঠে বয়ান করে কেরামত। সেখানে উঠে আসে অপমানের ভাষা: ‘শালা, মাঝির বাচ্চা, ডাইঙা শালা, ছোটোলোকের জাত, মাছ চুরি না করলে প্যাটের ভাত হজম হয় না।’? (আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৫২৬)
ইলিয়াসের সাহিত্যে বড়ো সত্য শ্রেণি-অপমান পুরুষতাকে এক লহমায় ধসিয়ে দেয়। কারণ গ্রামীণ পুরুষতার ভিত্তিকে বলা যায় ‘ইজ্জত’, আর শ্রেণি-অপমান সেই ইজ্জতকে কেড়ে নেয়। এখানে সহিংসতা কিন্তু বন্দুক নয়; সহিংসতা হলো ভাষা, যে ভাষা মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, ‘ছোটোলোক’ হিসেবে ট্যাগিং করে দেয়। আর মানুষ যখন ‘ছোটোলোক’ হয়ে যায়, তখন তার কথাও ছোট হয়, তার কণ্ঠের সামাজিক মূল্য কমে যায়। ফলে নীরবতা তৈরি হয়, কণ্ঠকে সমাজ গুরুত্ব দেয় না বলে।
এই পর্যায়ে এসে ইলিয়াস পাঠের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা দাঁড়ায়:
চুপ থাকা কি তবে কাপুরুষতা? নাকি চুপ থাকা কখনো কখনো আত্মরক্ষা? ইলিয়াস কোনো উপদেশ দেন না। তিনি বরং বর্ণনা করেন, চুপ থাকা যেখানে একইসঙ্গে লজ্জা এবং বাঁচার কৌশল। খোয়াবনামায় আছে:
মুনসির দাড়ির আগুনে পোড়া আকাশের আঁচে তমিজের বাপের গলা শুকিয়ে আসে, শুকনা গলায় সে আওয়াজ করে, হামাক কয়, তুই আমার মাছ লিস? কয়া তার হাতের নোয়ার পান্টিখান দিয়া বাড়ি মারলো হামার ঘাড়োত, হামি আগে বাঘাড়টাকে ঠেলা বিলের মধ্যে ফ্যালা দিছি। হামাক পান্টির বাড়ি মারলো তো দেখি, পান্টির মাথাত ঐ বাঘাড়ের লকশা ফুটা উঠিছে। তার গলার শিকল ঝনঝন করা বাজে। বলতে বলতে তমিজের বাপ হঠাৎ চুপ করে, তার কানে তখন বাজছে ফকির চেরাগ আলির গলা, হাতেতে লোহার পান্টি গলাতে শেকল।?(আখতারুজ্জামান, ২০০৮: ৫২৫-৫২৬)
‘বলতে বলতে তমিজের বাপ হঠাৎ চুপ করে’—এই থেমে যাওয়াটার গুরুত্ব আমাদের বুঝতে হবে। কেননা, কিছু অভিজ্ঞতা আছে যা ভাষা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; কিন্তু সমাজ ভাষা চায়, তাই মানুষ চুপ করে। এখানে নীরবতা কোনো নৈতিক অবস্থান নয়, এটা এমন অসম্ভাব্যতা অসম্ভাব্যতা যে, বলা সম্ভব নয়। আর ইলিয়াসের সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই: তিনি দেখান, ক্ষমতা মানুষকে শুধু চুপ করায় না; ক্ষমতা মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে মানুষ চুপ না থাকলেও তখন ভাষা কাজ করে না।
ইলিয়াসকে নিয়ে যে অভিযোগটা ঘুরে ফিরে আসে—তাঁর লেখায় আশা নেই। এই অভিযোগের ভিতরে হয়তো একধরনের পাঠক-আকাঙ্ক্ষা আছে যে, তাঁর সাহিত্য আমাদের সান্ত্বনা দেবে। কিন্তু ইলিয়াস কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে বরং নির্মম স্বচ্ছতা দেন।
কারণ হয়তো এই যে, ইলিয়াস জানতেন, ভুয়া আশা নীরব সহিংসতারই আরেক রূপ। যে সমাজে মানুষ কথা বলতে পারে না, সেখানে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলা মানে মানুষকে আরেক দফা চুপ করিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা। তাই ইলিয়াসের কাজ আশা উৎপাদন নয়; সত্য উন্মোচন। সত্য উন্মোচনই প্রথম রাজনৈতিক পদক্ষেপ। যদি জানা যায়, নীরবতা কোথা থেকে আসে, তাহলে নীরবতা ভাঙা সম্ভব।
ইলিয়াসের পুরুষ চরিত্ররা ‘ব্যক্তিগতভাবে’ দুর্বল নয়; তারা একটি ব্যবস্থার মধ্যে অক্ষম হয়ে ওঠে; অক্ষমতার চাপ তাদের কণ্ঠকে ধোঁয়াশা বানায়; ধোঁয়াশা পুরুষতাকে ভাঙে, কারণ পুরুষতার সামাজিক ভিত্তি ‘কার্যক্ষমতা’। ফলে নীরবতা জন্মায়, লজ্জা, ক্লান্তি, আত্মরক্ষা, ট্রমার মধ্য দিয়ে। ইলিয়াস তাই পুরুষতাকে নিন্দা করেন না; পুরুষতাকে তিনি পরীক্ষা করেন। তিনি দেখান, পুরুষতার সবচেয়ে বড়ো শত্রু নারীশক্তি নয়, বরং ক্ষমতার এমন কাঠামো, যা পুরুষকেও কণ্ঠহীন করে দেয়।
কিন্তু ইলিয়াসের সাহিত্যে পুরুষতা কেবল ভাঙে না, পুরুষতা ভাগ হয়।
এই বিভাজনটি খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত রাজনৈতিক। এর একদিকে আছে ভদ্রলোক, শিক্ষিত পুরুষ, নৈতিক ভাষায় কথা বলে, আদর্শে বিশ্বাসী, ভবিষ্যতের উপর আস্থা রাখে, নেতৃত্বকে সম্মান করে। অন্যদিকে আছে, প্রান্তিক পুরুষ অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত, সরাসরি কথা বলে, বিশ্বাসের বদলে অভিজ্ঞতায় আস্থা রাখে, ক্ষমতার ভাষা চেনে শরীর দিয়ে। চিলেকোঠার সেপাই-এ এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটে হাড্ডি খিজির ও চেংটুদের উপস্থিতিতে। এই চরিত্ররা ইলিয়াসের উপন্যাসে কোনো আদর্শবাদী নায়ক নয়। কিন্তু তারা একটা বড় সত্য বহন করে, ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, সেটা তারা জানে। আর এই জানাটা ভদ্রলোক পুরুষদের নেই। হাড্ডি খিজিরের কণ্ঠে উচ্চারিত একটি আপাত-সাধারণ বাক্য ইলিয়াসের রাজনীতিকে উন্মোচন করে দেয়, ‘মানষেক এত বিশ্বাস করো কিসক?’
এই প্রশ্নটা কোনো নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটা রাজনৈতিক বোধের প্রশ্ন।
হাড্ডি খিজির এখানে বিশ্বাসকে সন্দেহ করছে, কারণ বিশ্বাস তার কাছে বিমূর্ত নয়, বিপজ্জনক। ভদ্রলোক পুরুষেরা বিশ্বাস করে, নেতা ঠিক করবেন; সংগঠন জানে কী করছে; সময় এলে কাজ হবে; ‘এখন চুপ থাকাই কৌশল’ এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় অপেক্ষা। আর অপেক্ষা থেকেই জন্ম নেয় নীরবতা।
হাড্ডি খিজিরদের বাস্তবজ্ঞান বলে, নেতা বিপদে সরে যাবে; সংগঠন টিকে থাকার হিসাব করবে; সময় এলে ‘সময়’ আসবেই—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই তারা বিশ্বাস করে না। তারা সতর্ক। তারা সন্দেহপ্রবণ।
ইলিয়াস এখানে কোনো পক্ষ নেন না। কিন্তু একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট করেন: বিশ্বাস রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিলাসিতা। ভদ্রলোক পুরুষেরা এই বিলাসিতা বহন করতে পারে, কারণ তাদের হারানোর কিছু সুরক্ষা আছে। প্রান্তিক পুরুষেরা পারে না, কারণ তাদের হারানোর মানে সরাসরি শরীর, জীবন, অস্তিত্ব।
ভদ্রলোক পুরুষদের আরেকটি বড়ো বৈশিষ্ট্য—ভদ্রতা। ভদ্রতা এখানে শালীন আচরণ নয়; ভদ্রতা হলো সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়ার নীতি। ভদ্রলোক পুরুষ ভাবে, উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা ঠিক না; সরাসরি অভিযোগ ভদ্রতা নয়; উত্তেজনা বিপজ্জনক; ‘ডিসিপ্লিন’ বজায় রাখা জরুরি। এই ভদ্রতা বাইরে থেকে সভ্যতা মনে হয়। কিন্তু ইলিয়াস দেখান, এই ভদ্রতাই এক ধরনের নীরব সহিংসতা। কারণ ভদ্রতা প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে বাতিল করে দেয়। যে মানুষ শরীর দিয়ে ক্ষমতা চিনেছে, তার কথা ভদ্রলোকের ভাষায় ‘অপরিণত’, ‘উগ্র’, ‘অদূরদর্শী’ হয়ে যায়।
ফলে কী ঘটে?
ভদ্রলোক নেতৃত্ব কথা বলে, সিদ্ধান্ত নেয়, বিবৃতি দেয়। আর প্রান্তিক মানুষ চুপ হয়ে যায়। কারণ তার ভাষা ‘গ্রহণযোগ্য’ নয়। এখানে নীরবতা কোনো ভয়ের ফল নয়, এটা অস্বীকৃতির ফল।
চেংটু চরিত্রটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সে নায়ক নয়। সে নৈতিক বক্তৃতা দেয় না। কিন্তু সে জানে—কখন পালাতে হয়; কখন বিশ্বাস করতে নেই;কখন শরীরকে বাঁচাতে হয়। এই জ্ঞান কোনো বই থেকে আসেনি। এই জ্ঞান এসেছে বারবার ঠকে গিয়ে। চেংটুর পুরুষতা তাই নৈতিক নয়, কার্যকর। এই কার্যকারিতা ভদ্রলোক পুরুষদের চোখে ‘স্বার্থপরতা’ বা ‘অনৈতিকতা’। কিন্তু ইলিয়াস এই বিচারকে প্রশ্ন করেন। তিনি যেন বলেন, নৈতিকতা যদি মানুষকে বারবার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সেই নৈতিকতার মূল্য কী? এখানে পুরুষতার নতুন বিভাজন তৈরি হয়, ভদ্রলোক পুরুষ বিশ্বাসে আস্থাশীল, প্রান্তিক পুরুষ সন্দেহে; ভদ্রলোক পুরুষ আদর্শে স্থির, প্রান্তিক পুরুষ অভিজ্ঞতায়; ভদ্রলোক পুরুষের রাজনীতি ভাষায়, প্রান্তিক পুরুষের রাজনীতি শরীরে। ভদ্রলোক পুরুষ নীরবতাকে কৌশল ভাবে প্রান্তিক পুরুষের কাছে নীরবতা বিপদ।
এই বিন্যাস কোনো সরল বাইনারি নয়। ইলিয়াস দেখান, ভদ্রলোক পুরুষ শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক পুরুষের কাঁধে ভর দিয়েই টিকে থাকে, কিন্তু তার কথা শোনে না। এই জায়গায় ইলিয়াস সবচেয়ে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন। ভদ্রলোক পুরুষেরা প্রান্তিক পুরুষদের সাহসের উপর ভর করে আন্দোলনের গল্প বানায়। কিন্তু বিপদ এলে তারাই প্রথম সরে যায়। এই প্রতারণা প্রকাশ্যে হয় না। এটা হয় নীরবে। বৈঠকের ভাষায়। বিবৃতির ভদ্রতায়। ‘পরিস্থিতি বিবেচনায়’—এই বাক্যের আড়ালে। প্রান্তিক পুরুষ তখন বোঝে, সে শুধু ব্যবহৃত হয়েছে। এই বোধই পুরুষতাকে ভেঙে দেয়। কারণ সে কেবল রাষ্ট্র দ্বারাই নয়, নিজের লোক দ্বারাও পরিত্যক্ত। এই পরিত্যাগের পর মানুষ আর কথা বলতে চায় না। এই নীরবতা জন্মায় ক্ষোভ থেকে, কিন্তু সেই ক্ষোভের ভাষা আর থাকে না।
ইলিয়াসের সাহিত্যে নীরবতা শুধু ভয় থেকে আসে না; নীরবতা আসে বিশ্বাসভঙ্গ থেকে, ভদ্রতার নামে অস্বীকৃতি থেকে এবং নেতৃত্বের নৈতিক ব্যর্থতা থেকে। হাড্ডি খিজির ও চেংটুরা আমাদের শেখায়, নীরবতা সবসময় দুর্বলতার চিহ্ন নয়; অনেক সময় নীরবতা হলো আর বিশ্বাস না করার সিদ্ধান্ত।
আর এই সিদ্ধান্তটা জন্মায় তখনই, যখন ভদ্রলোক রাজনীতি বারবার প্রমাণ করে— সে কেবল কথা বলে, কিন্তু দায়িত্ব নেয় না।
রিপোর্টারের নাম 

























