গুণ হিসেবে বিবেচনা করে লেখকসত্তাকে আমরা যে দুটো ভাগে ভাগ করে ফেলতে পারি, তার এক ভাগে থাকবেন সেইসব লেখক, যাঁদের হাতে ভাষা পাখি হয়ে যায়। ভাষার উপমা হিসেবে ‘পাখি’ হয়তো ঠিক শব্দ নয়। তবে, যে কথাটি বলা প্রয়োজন, তা বোঝানোর জন্য পাখি উপমাটি সহজবোধ্য হতে পারে। কেননা, এই লেখকদের ভাষা এমন যে, তা যেন পাখির মতো উড়ে উড়ে আমাদের কাছে আসে আর আমরা উচ্ছ্বসিত হই, আলোকিত হই; তাঁদের রচিত শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটি, চিৎকার করি, কাঁদি, হাসি। আবার এমনকিছু লেখক আছেন, যাঁদের হাতে পড়ে ভাষার পাখিটি পাথর হয়ে যায়। পাথর এখানে ‘ভারী’র বা ‘অস্বস্তি’র বা ‘ঠান্ডা’র উপমা। এই দুই দল লেখকই শব্দ দিয়ে আঘাত করেন—প্রথম দল সশব্দে, দ্বিতীয় দল শব্দ কমিয়ে, কমিয়ে মানে, যেহেতু তাঁদের ভাষা পাথরের মতো, পাথরের আঘাত গুরুতর হলেও শব্দ কমই হয়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় দলভুক্ত লেখক।
ইলিয়াসের লেখায় শব্দ চেঁচায় না, কান ঝাঁঝরা হয় না, চোখ ভিজে ওঠে না। কিন্তু তাঁর লেখা পড়তে পড়তে আমাদের বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি জমে ওঠে, হাঁসফাঁস লাগে। যেন কোথাও বাতাস কমে যাচ্ছে। এই অস্বস্তির নামই ইলিয়াস।
তিনি এমনভাবে লেখেন, যেন শব্দের ভিতরে আরেকটি শব্দহীনতা দাঁড়িয়ে থাকে—কাঁটা হয়ে, গলার কাছে এসে। ফলে, ইলিয়াসপাঠ অনেক সময় আনন্দদায়ক অনুভূতি দেয় না, বরং চাপের পরিস্থিতি তৈরি করে। তাঁর লেখা পড়ে আমরা বুকের ওপর পাতলা একটা ভার অনুভব করি। সে-ভার কখনো খুব শাঁসালো, খুব বাস্তব, খুব নাছোড় এবং অনিবার্য।
আমরা বহুদিন ধরে তাঁকে ‘রাজনৈতিক কথাশিল্পী’ অভিধায় অভিহিত করে এসেছি। এই পরিচয় ভুল নয়, কিন্তু তাঁকে এভাবে ভাবাটা আমাদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক। কারণ এই পরিচয়ের ভেতরে আমরা ধরে নিই, ইলিয়াস মানে মিছিল, আন্দোলন, দমননীতি, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। আমরা ধরে নিই, সহিংসতা মানে দৃশ্যমান কিছু। কিন্তু প্রকৃতঅর্থে ইলিয়াস আমাদের সেই আরাম ভেঙে দেন। তিনি দেখান, সবচেয়ে কার্যকর সহিংসতা চোখে পড়ে না। সবচেয়ে ভয়ংকর সহিংসতা শব্দ করে না। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা মানুষকে হত্যা করে না, মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়।
ফলে, এই লেখার প্রস্তাবনা এই যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য আসলে নীরব সহিংসতার জার্নাল।
(কিন্তু বলে রাখা ভালো, এ লেখাটির পরিসর বিস্তৃত নয়, ইলিয়াসের লেখাপত্রের খণ্ডাণুখণ্ডই কেবল এ লেখার আওতায় আসবে।)
‘ইলিয়াস মানেই রাজনীতি’—এই প্রচলিত ন্যারেটিভে আমরা তাঁর সাহিত্যজুড়ে ব্যাপ্ত ভয়টা কেবল রাষ্ট্রের বাইরে খুঁজে বেড়াই: পুলিশ, মিলিটারি, দমননীতি, কারফিউ, মিছিল, মিটিং, গ্রেফতার কিংবা কোর্ট-কাচারির সদর-অন্দরে। এসব বিষয় ইলিয়াসের লেখাপত্রে বিস্তর আছে। কিন্তু ইলিয়াসের সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুতর জায়গাটা সম্ভবত অন্যখানে। তিনি দেখান, রাষ্ট্র যখন মানুষকে দমন করে, তখন সবকিছুর আগে কী করে? মানুষকে হত্যা করে? না। মানুষকে জেলে দেয়? না। মানুষকে গুম করে? সেটাও নয়। রাষ্ট্র সবচেয়ে আগে মানুষের গলার ভিতরে ঢুকে পড়ে। রাষ্ট্র সবচেয়ে আগে তৈরি করে একটি অদৃশ্য শাসন: মানুষ নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয়, নিজের বাক্যকে অর্ধেক করে, নিজের প্রশ্নকে গিলে ফেলে, নিজের সিদ্ধান্তকে কুজ্ঝটিকায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। এই প্রক্রিয়াটা ইলিয়াসের সাহিত্যকে একটা ধ্রুপদী ভিত্তি দেয় এবং সম্ভবত এখানেই তিনি অনন্য হয়ে ওঠেন। এ লেখায় আমরা সুনির্দিষ্ট এই জায়গাটায় তাঁকে নতুনভাবে চিনতে চাই। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বিষয়টি এমন যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সহিংসতা চিৎকারে নয়, ঘটে নীরবতায়; প্রকাশ্যে নয়, অন্তর্লীনে; রক্তে নয়, ভাষায় অথচ ভাষাহীনতায়।
এখানে সহিংসতা কেবল একটা ঘটনা নয়—একটা পরিবেশ, একটা অভ্যাস, একটা মানসিক পরিস্থিতি। ভয় এখানে রাষ্ট্রের বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে না, ভয় মানুষের অন্তর্গত অলিন্দে এসে বসে থাকে। এখানে বন্দুক দৃশ্যমান নয় অথচ প্রতিটি বাক্যের ওপর বন্দুকের ছায়া পড়ে।
২.
‘সহিংসতা’ শব্দটি শুনলেই আমাদের সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে রক্ত, লাঠি, বন্দুক, আগুন, দৌড়, আর্তচিৎকারের ভয়াবহ দৃশ্যপট। সহিংসতা যেন একটা নাটকীয় ঘটনার মুহূর্ত, একধরনের প্রত্যক্ষতা। কিন্তু সহিংসতার আরেকটি মাত্রা আছে, যা কেবলই ‘ঘটনা’ নয়, ‘স্থিতি’। স্থিতাবস্থা নিঃশব্দে কাজ করে যায়, চিৎকার করে না। এটা এমন একটা পরিস্থিতি করে, যে পরিস্থিতিকে খুন করার আগে মানুষকে নির্বাক করে দেয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই প্রতিবেশ ও পরিস্থিতিকে আমরা ‘নীরব সহিংসতা’ নামে সনাক্ত করতে চাই।
নীরব সহিংসতা আরও স্পষ্ট করে বোঝার জন্য একটা ছোট দৃশ্যপট কল্পনা করা যায়। একটা মানুষ, যে একসময় কথা বলতে পারত। প্রশ্ন করতে পারত। ‘না’ কথাটি স্পষ্ট করে বলতে পারত। কিন্তু এখন সে কথা বলার আগে ভাবে। ‘না’ বলার আগে থেমে যায়। প্রশ্ন করার আগে ভাবে, ‘বললে কী হবে?’ সত্য বলার আগে হিসাব কষে, ‘কারা শুনছে?’ সে নিজের বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি বলতে বলতেই দ্বিতীয় বাক্যটি নিজেই কেটে দেয়। আপাতভাবে তার মধ্যে কোনো সেন্সর নেই, তবু সে সেন্সরড। তার কণ্ঠে দৃশ্যমান কোনো তালা নেই, তবু সে তালাবদ্ধ। কারণ তালাটা বাইরে নয়, তালাটা তার ভেতরে এবং চাবিটির সন্ধান তার কাছে নেই।
নীরব সহিংসতা তাই কেবল রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ নয়; এটা আত্মসেন্সরশিপের রাজনৈতিক-উৎপাদ। এটা এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিজেই রাষ্ট্রের কাজ করে: নিজের উপর নজরদারি করে, নিজের ভাষাকে শাস্তি দেয়, নিজের ইচ্ছাকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করে। ইলিয়াসের চরিত্ররা এই সহিংসতার মধ্যে জন্মায়, বড়ো হয়, বেঁচে থাকে। তাই তাদের কাছে সহিংসতা কোনো বিশেষ মুহূর্ত নয়, প্রাত্যহিকতা; আর প্রাত্যহিক সহিংসতা সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ তা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ইলিয়াসের সাহিত্যে ইতিহাস ধ্রুবপদের মতো ফিরে ফিরে আসে। আর কখনোই তা ব্যাকড্রপ হিসেবে আসে না, সম্মুখভাগে দণ্ডায়মান থাকে। এখানে ইতিহাসকে বলা যায়, একটা হাত, যে হাত চরিত্রসমূহের কাঁধ চেপে ধরে রাখে। কিন্তু আশ্চর্য যে এই হাতটা সবসময় দেখা যায় না। তাঁর রচনার কোথাও ইতিহাস আসে গুজব হয়ে, কোথাও স্মৃতিনির্ভরতায়, কোথাও ভাঙা খবরের টুকরোতে, কোথাও আসে মানুষের চোখের ভাষায়। ইলিয়াস কখনো ইতিহাসকে নাটকীয় করে তোলেন না বরং ইতিহাসকে তিনি বিন্যাস করেন ঘটনা নয়, চাপ হিসেবে। বস্তুত এই চাপই হলো নীরব সহিংসতার প্রধান রূপ। ফলে ইলিয়াস-পাঠের একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দাঁড়ায়: ইলিয়াসকে যদি আমরা কেবল ঘটনাবহুল লেখক হিসেবে পড়ি, তাহলে আমরা মূলত অর্ধেক ইলিয়াসকে পড়ব। কেননা, ইলিয়াসকে পড়তে হবে চাপ-প্রধান লেখক হিসেবে: চাপ হলো সেই পরিস্থিতি, যা মানুষের শ্বাসকে হ্রস্ব করে, বাক্যকে কেটে দেয়, সিদ্ধান্তকে শিথিল করে দেয় এবং কখনো প্রতিবাদকে ‘অসময়ে বলা কথা’ বানিয়ে রাখে।
সম্ভবত এ কারণে ইলিয়াসের গদ্যে একটা গুমোট আবহ বিরাজমান থাকে। মনে হয়, বাতাস কম। মনে হয়, জানালা বন্ধ। মনে হয়, গলায় শব্দ জমে আছে, কিন্তু বেরোচ্ছে না। এই গুমোট ভাবটাকে বলতে হবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
৩.
চিলেকোঠার সেপাই—নামের মধ্যেই একধরনের ট্র্যাজেডি আছে। চিলেকোঠা মানে বাড়ির ওপরের ঘর—আলো কম, বাতাস কম, সংকীর্ণ, খানিকটা লুকোনো। সেপাই মানে সৈনিক, যার কাজ চলা, আক্রমণ করা, ভূমিতে নামা। কিন্তু এখানে সেপাইকে রাখা হয়েছে চিলেকোঠায়। মানে, যার নামার কথা, তাকে উঠিয়ে রাখা হয়েছে। যার এগোনোর কথা, সে আটকে আছে। এই নামই উপন্যাসের ভেতরের সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো প্রতীক: বিপ্লবের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সে সম্ভাবনাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে, মাত্র একটি ঘরে, মাত্র একজনের মাথায়, মাত্র একটি মধ্যবিত্ত জীবনে।
চিলেকোঠার এই ওসমানকে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত বলেন। কেননা, মধ্যবিত্তের চারিত্র্যে একটা গুণের মতো ‘দ্বিধা’ বিষয়টা জড়িয়ে থাকে। কিন্তু এখানে ওসমানের দ্বিধা কেবলই ব্যক্তিগত নয়। এটা হয়তো ব্যক্তিসত্তা ছাপিয়ে সময়ের সন্তান হয়ে ওঠে। কেননা, ওসমান এমন সময়ে এমন এক শ্রেণির মানুষ হিসেবে বড়ো হয়, যার শিক্ষা আছে, বোধ আছে, ক্ষোভ আছে, কিন্তু সামাজিকভাবে সে নিরাপত্তা পায়। ফলে, তার স্নায়ুতন্ত্র কোনোরকম ‘ঝুঁকি’তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না। আর এজন্য বিপ্লব তার কাছে কেবল রাজনৈতিক প্রকল্পনা নয়; বিপ্লব তার কাছে অস্তিত্বগত বিপদ। তাই সে যতই জানুক যে অন্যায় হচ্ছে, তার আরামপ্রিয় শরীর ততই তাকে থামিয়ে দেয়।
এখানে ইলিয়াস একদম নির্দয়: তিনি আমাদের দেখান যে, অনেক সময় মানুষ সত্য জানে, কিন্তু সত্য বলার ক্ষমতা তার থাকে না। ক্ষমতা মানে কেবল সাহস নয়, ক্ষমতা মানে ভাষা, পরিস্থিতি, সামাজিক পরিসর, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, এবং ভয়কে সামলানোর মানসিক অভ্যাস। ওসমান এত সাহসী নয়। তবে সাহসের অভাব থাকলেও ওসমানের ‘চিন্তা’ আছে। কিন্তু কেবল চিন্তা একা বিপ্লব তৈরি করতে পারে না। কেবল চিন্তা হয়তো চিন্তাকেই ভারী ও অনড় করে তোলে। ওসমান যখন কথা বলতে যায়, তার মধ্যে একটা হিসাব তো শুরু হয়: কেউ শুনছে কিনা? কে রিপোর্ট করবে কিনা? কে সম্ভাব্য শত্রু? এই দেয়াল, এই আড্ডা, এই রাস্তাকেও সে নিরাপদ মনে করতে পারে না। নীরব সহিংসতা ফাঁক পেয়ে এখানেই কাজ করতে শুরু করে। রাষ্ট্রকে আর লাঠি তুলতে হয় না, মানুষ নিজেই নিজেকে থামায়। জনগণ যখন পুলিশ ছাড়াই পুলিশের মতো আচরণ করে, নিজের বাক্যকে তল্লাশি করে; এখানেই রাষ্ট্র জিতে যায়।
চিলেকোঠার সেপাই-এ স্পষ্টত ‘ভয়’ টের পাওয়া যায়। ভয় যেন এখানে বাক্যের পূর্বশর্ত হিসেবে বিরাজমান। কথা বেরোবার আগে ভয় তার গলা চেপে ধরে রাখে। এখানে হয়তো ইলিয়াসকে কেবল রাজনৈতিক ও অস্তিত্বগত লেখক বলা যায়। কারণ এখানে প্রশ্নটা শুধুই ‘ক্ষমতায় কে’ নয়; প্রশ্নটা ‘মানুষ কীভাবে মানুষতা হারায়?’ আর মানুষতা হারানোর প্রথম ধাপই হলো নিজের কথা বলতে না পারা।
ইলিয়াসের সাহিত্য ‘ভয়’ কোনো সাধারণ আবেগ নয়। ভয় এখানে চরিত্রের ব্যক্তিগত মানসিক দুর্বলতা নয়; ভয় এখানে শ্রেণিগতভাবে উৎপাদিত একধরনের শৃঙ্খলা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ভয়, ইলিয়াসের আখ্যানকে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণি ঐতিহাসিকভাবে এমন এক শ্রেণি, যাদের কাছে কিছুই পুরো নেই, আবার যা আছে তার পুরোটা হারানোর ভয় আছে। তাদের আছে চাকরি, কিন্তু চাকরি অনিশ্চিত। আছে শিক্ষা, কিন্তু সেই শিক্ষা ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না। আছে বোধ, কিন্তু সেই বোধ প্রয়োগ করার সামাজিক জায়গা নেই। এই অসম্পূর্ণতা থেকেই জন্ম নেয় ইলিয়াসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব-চরিত্র: যে কেবল জানে যে এগোতে হবে, কিন্তু এগোয় না।
চিলেকোঠার সেপাই-এর ওসমান এই শ্রেণির প্রতীক। ওসমান যে সাহসী নয়, একথা পাঠকের অভিযোগ আকারে আমরা জানি। কিন্তু এ নিয়ে ইলিয়াস কোনো অভিযোগ করেন না। তিনি বরং ওসমানের সাহস না থাকার জন্য দায়ী কে, এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আর এখানে ইলিয়াসের একথা বলতে কোনো দ্বিধা দেখতে পাই না যে, সমাজ ও রাষ্ট্র এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে সাহস দেখানো মানে নিজের জীবনের সমস্ত ‘নড়বড়ে নিরাপত্তা’কেই অবিমৃষ্যকারীভাবে বাজি রাখা।
কিন্তু মধ্যবিত্ত ভয় কীভাবে কাজ করে? মধ্যবিত্ত ভয় এভাবে কাজ করে যে, তুমি জানো অন্যায় হচ্ছে; কিন্তু তুমি ভাবো, ‘আমি বললে কী বদলাবে?’; তুমি হিসাব করো, পরিবার, চাকরি, ভবিষ্যৎ; তুমি নিজেকে বোঝাও, ‘সময় এখন ঠিক না।’ আর এই বোঝানোই ধীরে ধীরে নীতিতে পরিণত হয়। এই জায়গাটাতেই ইলিয়াস সবচেয়ে নির্মম পর্যবেক্ষণ হাজির করেন: মধ্যবিত্ত মানুষ চুপ থাকে নৈতিকতার অভাবে নয়, চুপ থাকে কারণ তার ভয়কে যুক্তি দিয়ে সাজানো যায়। এই ‘যুক্তিযুক্ত ভয়’ই আত্ম-সেন্সরশিপের জন্ম দেয়। এটা কোনো আদেশে আসে না। এটা আসে অভ্যাসে। অর্থাৎ মানুষ প্রথমে চুপ থাকে নিরাপত্তার জন্য। পরে চুপ থাকাই তার স্বভাব হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সে ভুলেই যায়, সে কখনো কথা বলতে পারত। ইলিয়াসের কৃতিত্ব এখানেই: তিনি মধ্যবিত্ত ভয়কে নৈতিকতা দিয়ে ঢেকে দেন না। তিনি এটাকে মহৎ করে তোলেন না। তিনি দেখান, এই ভয় কীভাবে ক্ষমতার সবচেয়ে সাশ্রয়ী অস্ত্র।
অথচ রাষ্ট্র এখানে কিছুই করে না, রাষ্ট্র শুধু অপেক্ষা করে, মানুষ নিজে নিজেই নিজের কণ্ঠ বন্ধ করে দেয়। এই আত্ম-সেন্সরশিপের রাজনীতিই সম্ভবত ইলিয়াসের সাহিত্যের সবচেয়ে আধুনিক দিক। কারণ আজকের পৃথিবীতেও মানুষকে চুপ করাতে লাঠি লাগে না, লাগে চাকরির ভয়, সামাজিক বয়কটের আশঙ্কা, অপ্রয়োজনীয় ঝামেলার আতঙ্ক। ইলিয়াস আমাদের শেখান, মধ্যবিত্ত ভয় কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটা একটা রাজনৈতিক সাফল্য।
ইলিয়াস একজন লেখক হিসেবে কত ভালো, তা বোঝা যায় তাঁর উপস্থাপনের ধরনে। সহিংসতাকে তিনি নাটকের মতো সাজিয়ে তোলেন না। আধুনিক রাজনৈতিক আখ্যানগুলোতে যেমন আমরা প্রায়ই দেখি: একটা বড়ো ঘটনা যেমন, দমন, গ্রেফতার, মৃত্যু বা গুলির ঘটনা ঘটলেই গল্পটি ‘রাজনৈতিক’ হয়ে ওঠে। কিন্তু ইলিয়াস সেখানেই থেমে যান না। তিনি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখান যে, ঘটনা ঘটার আগেই রাজনীতি শুরু হয় মানুষের ভেতরে, মানুষের দৈনন্দিন আচরণে, মানুষের ছোট ছোট ভয়ে। সহিংসতার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা সেটাই, যেখানে সহিংসতা রক্তাক্ত করে না, বরং স্বাভাবিক করে তোলে। ফলত, আমরা অন্যায়কে ‘এভাবেই হয়’ বলে মেনে নিই। আমরা ভয়কেও ‘সাধারণ’ বলে ধরে নিই। আর চুপ থাকাকে ‘বুদ্ধিমানের কাজ’ বলে প্রশংসা করি। ইলিয়াস আমাদের প্রথাবদ্ধ বিশ্বাস ও প্রশংসার প্রলেপকে সরিয়ে দেন। তিনি দেখান যে, চুপ থাকা কখনো কখনো বুদ্ধিমত্তা নয়; চুপ থাকা কখনো কখনো সহিংসতার সঙ্গে আপস। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই আপসটা মানুষ বাধ্য হয়ে করে, কারণ তার সামনে বিকল্প নেই বা বিকল্পের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা নেই। একারণে ইলিয়াসের গদ্য উত্তেজিত নয়; তার মধ্যে একটা ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা আছে। তিনি কাঁদিয়ে কাজ সারেন না; তিনি আমাদের বুকের মধ্যে ছোট ছোট পাথর রেখে দেন, যাতে আমরা পাঠকেরা পাঠের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে টের পাই, কিছু একটা আটকে আছে।
৪.
ইলিয়াসের সাহিত্যের সুলুক-সন্ধান করে আমরা যে একসময় তাঁকে মূলত শহুরে রাজনৈতিক লেখক মনে করতাম, খোয়াবনামা আমাদের সেই ধারণাও নিদারুণভাবে ভেঙে দেয়। কেননা, এই উপন্যাসে রাষ্ট্র কোনো অফিসিয়াল মুখ নিয়ে আসে না। এখানে কোনো স্পষ্ট শাসক নেই। কোনো প্রকাশ্য দমনযন্ত্রও নেই। এবং স্পষ্টতই খোয়াবনামা-এর সহিংসতা চিলেকোঠার সেপাইয়ের মতোও নয়। কারণ এখানে শাহরিক রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও সহিংসতা আছে গ্রামজীবনের ভিতরে, মাটি, জল, জমি, সম্পর্ক, ধর্ম, প্রথা, আর গুজবের সুতোর মধ্যে। খোয়াবনামার পৃথিবীতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে কেবল অস্ত্র নয়; মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ, প্রথা, কথা-কানাঘুষা, অপবাদ, আর সবচেয়ে বেশি যেটা নিয়ন্ত্রণ করে—অপেক্ষা।
প্রশ্ন উঠতে পারে অপেক্ষা কীভাবে সহিংস হয়? অপেক্ষাও কখনো সহিংস হয়, যখন অপেক্ষা মানুষের সিদ্ধান্তক্ষমতাকেই কেড়ে নেয়। যখন মানুষ নিজের জীবনকে স্থগিত করে রাখে এই আশায় যে ‘কিছু একটা ঘটবে’, কিন্তু সেই ঘটনার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই স্থগিত জীবন, এটাই নীরব সহিংসতার এক রূপ। কারণ এখানে মানুষ বাঁচে ঠিকই, কিন্তু নিজের মতো করে বাঁচে না। জীবনটা যেন কারও হাতে রাখা, নিজেদের হাতে নয়। খোয়াবনামাতে মানুষ অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষা নিষ্ক্রিয় নয়, এটা শাসিত অপেক্ষা। অপেক্ষা মানুষকে বলে, এখন নয় আর একটু পরে সময় এলে হবে। এই সময়টা কখনো আসে না। কিন্তু মানুষ তার জীবন স্থগিত রেখেই বুড়িয়ে যায়। ইলিয়াস দেখান, সহিংসতা মানে শুধু আঘাত নয়, সহিংসতা মানে মানুষের সময়ের ওপর অধিকার কেড়ে নেওয়া।
খোয়াবনামার গ্রামীণ সমাজে গুজব কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়, গুজব এখানে ক্ষমতার বাহক। কারণ গুজবের উৎস স্পষ্ট নয়, কাউকে দায়ী করা যায় না, কিন্তু গুজব আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ জানে না, এই কথা কে বলেছে, কেন বলেছে, সত্য কিনা। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে, কারণ না বিশ্বাস করলে সে একা হয়ে যাবে। এইখানে নীরব সহিংসতা সবচেয়ে কার্যকর হয়। কারণ গুজব মানুষকে বাধ্য করে চুপ থাকতে, ‘ভুল কথা বললে বিপদ হতে পারে’।
গ্রামের মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কারণ সিদ্ধান্ত নিলে সামাজিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। এই সামাজিক শাস্তি রাষ্ট্রীয় শাস্তির মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু কার্যকারিতায় কোনো অংশে কম নয়। খোয়াবনামার মানুষ তাই বেঁচে থাকে একধরনের স্বপ্নঘেরা অন্ধকারে। কিন্তু স্বপ্ন এখানে মুক্তির নিশ্চায়ক নয়; স্বপ্ন বরং অনিশ্চয়তা ঘনীভূত করে তোলে। স্বপ্ন এখানে প্রত্যাশিত ফুল নয়, আশঙ্কার ছায়া। স্বপ্নের ভেতর দিয়ে ইতিহাস ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে। মানুষ জানে না কী আসছে, কিন্তু সে জানে, কিছু একটা আসছে। এই ‘কিছু একটা’ যখন নির্দিষ্ট নয়, তখন তা আরও ভয়ংকর। কারণ নির্দিষ্ট শত্রুকে মানুষ প্রতিরোধ করতে পারে, অনির্দিষ্ট ভয়কে পারে না। অনির্দিষ্ট ভয় মানুষকে সারাক্ষণ প্রস্তুত রাখে। কিন্তু সে প্রস্তুতি কোনো কাজের নয়; সে প্রস্তুতি শুধু মানুষকে ক্লান্ত করে, ভেতর থেকে ফাঁপা করে ছেড়ে দেয়।
ইলিয়াসের বড়ো সাফল্য, তিনি প্রচলিত বিশ্বাসের মতো ‘সরল গ্রাম’কেও নির্দোষ বানিয়ে তোলেন না। তিনি দেখান, গ্রামও সহিংসতার উৎপাদক হতে পারে, যখন প্রথা প্রশ্নহীন হয়, যখন গুজব সত্যের জায়গা নেয়, যখন অপেক্ষা প্রতিরোধকে হত্যা করে। এইখানে খোয়াবনামা শহরের রাজনৈতিক উপন্যাসের চেয়েও বেশি গভীর। কারণ এখানে সহিংসতার কোনো মুখ নেই, শুধু ছায়া আছে। আর ছায়ার সঙ্গে লড়াই করা সবচেয়ে কঠিন।
ইলিয়াসের সাহিত্যে সহিংসতার আরেকটা রূপ আছে, যাতে মানুষের ‘মৃত্যু’ ঘটে না ঠিকই কিন্তু তা ‘জীবন’টাকে নিয়ে নেয়। ইলিয়াস আমাদের এভাবেই দেখান যে, মানুষ বেঁচে থাকে, অথচ তার জীবনটা অন্য কারও পরিকল্পনার সঙ্গে বাঁধা পড়ে যায়। এভাবেই ইতিহাস পায়ের শব্দ না করে মানুষের উঠোনে আসে।
ইলিয়াসের সাহিত্যে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা ব্যবস্থা। একটা মানসিক আবহ। একটা দৈনন্দিন শাসন। মধ্যবিত্ত ভয় আর গ্রামীণ অপেক্ষা, এই দুইয়ের মাঝখানেই ইলিয়াসের রাজনৈতিক জগৎ দাঁড়িয়ে আছে। তিনি দেখান, শহরে মানুষ চুপ থাকে নিরাপত্তার জন্য; গ্রামে মানুষ চুপ থাকে প্রথার জন্য। দুটোই সহিংসতা। দুটোই নীরব। দুটোই দীর্ঘস্থায়ী। এইখানেই ইলিয়াসকে নতুনভাবে চেনা সম্ভব। তিনি কেবল ক্ষমতার বিরুদ্ধে লেখেননি; তিনি দেখিয়েছেন ক্ষমতা কীভাবে মানুষের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
৫.
ইলিয়াসের ভাষা নিয়ে একটা ভুল ধারণা আছে। কেউ কেউ বলেন, তাঁর ভাষা ‘শুষ্ক’, ‘নির্লিপ্ত’, ‘ঠান্ডা’। এই কথার মধ্যে সত্য আছে, কিন্তু ব্যাখ্যাটা সবসময় ঠিক নয়। ইলিয়াসের গদ্য শুষ্ক নয়; ইলিয়াসের গদ্যকে বলা যেতে পারে, সংযত। আর এই সংযম একটা নান্দনিক সিদ্ধান্ত, তা কখনো রাজনৈতিক এবং নৈতিকও বটে।
যদি তিনি অতিরিক্ত আবেগে লেখেন, তাহলে পাঠকও আবেগে ভেসে যাবে, কিন্তু ইলিয়াস চান পাঠক আবেগে না ভেসে বরং ‘চাপ’ টের পাক। কেননা চাপ আবেগের চেয়েও গভীর। আবেগকে কখনো মুক্তির মতো লাগে; চাপ মুক্তি দেয় না। চাপ কেবল বোঝায়, তুমি কোথায় আটকে আছ।
ইলিয়াসের গদ্য তাই প্রায়ই শ্বাসকে ছোট করে। বাক্য যেন অল্প বাতাসে হাঁটে। এই শ্বাসকষ্টই তাঁর ন্যারেটিভের এক অংশ। পাঠক যখন পড়তে পড়তে অস্বস্তি বোধ করে, তখনই ইলিয়াসের কাজ সফল হয়, কারণ সেই অস্বস্তি আমাদের বুঝিয়ে দেয়: সহিংসতা মানে কেবল দৃশ্যমান ক্ষত নয়; সহিংসতা মানে শ্বাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
এই কারণেই ইলিয়াস পাঠককে কাঁদাতে চান না; তিনি পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলতে চান। অস্বস্তি রাজনৈতিক চেতনার কাছাকাছি। কান্না অনেক সময় ব্যক্তিগত হয়ে যায়; অস্বস্তি মানুষকে প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়।
নীরবতাকে আমরা প্রায়ই ‘কিছু না’ ধরনের ভেবে আরাম পাই। কিন্তু ইলিয়াসের সাহিত্যে নীরবতা ‘কিছু না’ নয়; নীরবতা হলো ‘শব্দহীন নির্দেশ’, এক ধরনের ইনভিজিবল কমান্ড। যেমন: ‘এ কথা বলা যাবে না।’ ‘এটা এখানে বলা ঠিক হবে না।’ ‘এটা না বলাই ভালো।’ ‘এটা নিয়ে চুপ থাকো।’ ‘তুমি বুঝবে, কিন্তু বলবে না।’ এই নির্দেশগুলো কখনো কোনো অফিসিয়াল কাগজে লেখা থাকে না। কিন্তু সমাজে ছড়িয়ে থাকে। মানুষ শিখে নেয়, কোন কথা বিপজ্জনক, কোন কথা নিরাপদ, কোন কথা ‘সময়ের সঙ্গে যায়’, কোন কথা ‘অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা’ তৈরি করে। এই শেখার প্রক্রিয়াই নীরব সহিংসতার সিস্টেম।
ইলিয়াস দেখান, নীরবতার ভেতরেও অর্থ থাকে, রাজনীতি থাকে, শ্রেণি থাকে। কারা চুপ থাকবে? কারা কথা বলতে পারবে? যে শ্রেণির হাতে অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, তারা অনেক সময় নির্বিঘ্নে কথা বলে, তাদের কথা ‘বক্তৃতা’ হয়। আর যে শ্রেণির হাতে এসব নেই, তাদের কথা ‘অপরাধ’ হয়ে যায়। তারা চুপ করে, কারণ তাদের চুপ থাকা তাদের নিরাপত্তা, কিন্তু একইসঙ্গে তাদের পরাজয়। ইলিয়াস এই পরাজয়কে রোমান্টিক করেন না। তিনি এটাকে ‘গরিবের মহত্ত্ব’ বাচক বিশেষণে ভূষিত করে তোলেন না। তিনি বরং দেখান, এই পরাজয় কীভাবে উৎপাদিত হয় এবং কীভাবে পুনরুৎপাদিত হয়।
ইলিয়াসকে আজ নতুনভাবে চেনা জরুরি। কারণ আমাদের সময়েও সহিংসতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ অনেক সময় দৃশ্যমান নয়। আজও ‘বললে বিপদ’ ভাবনা অনেক মানুষকে থামিয়ে দেয়। কিন্তু আজ সেটা হয়তো শুধু রাষ্ট্রীয় ভয় নয়; হয় সামাজিক রোষ, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, ডিজিটাল নজরদারি, অপবাদ, অনলাইন লাঞ্ছনা, দলীয় গোষ্ঠীগত চাপের সম্মিলিত পরিবেশ। ফলে মানুষ নিজের চিন্তার ওপর নিজেরই পুলিশ বসায়।
ইলিয়াসের সাহিত্যে একটা বিষয় অনুচ্চারে থাকে যে, সেন্সরশিপ কেবল বাইরে থেকে আসা কাঁচি নয়; সেন্সরশিপ হলো ভিতরের ভয়, ভিতরের হিসাব, ভিতরের নিজেকে ছোট করে রাখা। এই জায়গায় ইলিয়াস শুধু ‘ঐতিহাসিক রাজনৈতিক লেখক’ নন, তিনি আমাদের বর্তমানেরও ভাষ্যকার। কারণ তিনি আমাদের শেখান, স্বাধীনতার প্রথম শর্ত হলো নিজের কণ্ঠকে ফেরত পাওয়া। আর কণ্ঠ ফেরত পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো, নিজের নীরবতার ভেতরে লুকোনো ভয়ের মানচিত্র চিনে নেওয়া।
রিপোর্টারের নাম 

























