রাত দুইটায় বাসায় গেলেন, ভোর ছয়টায় মায়ের শেষ সময়ে শয্যাপাশে, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা সেরে বাসভবন থেকে বেরিয়ে সোজা রাজনৈতিক কার্যালয়ে। অংশ নিলেন স্থায়ী কমিটির বৈঠকে, যে বৈঠকে আলোচনা হবে মায়ের জানাজা, দাফন আর দলীয় আয়োজন নিয়ে।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরের দিকে তারেক রহমান যখন গুলশানের কার্যালয়ে আসেন, কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে তখন নতুন পরিবেশ। সেই বৃহস্পতিবার থেকে দেশে তার ১৭ বছর পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটিকে যেভাবে উদযাপন হচ্ছিল, ঠিক তার উল্টো পরিবেশ মঙ্গলবারে। কার্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া। নেতাকর্মী, অনুসারীদের চোখে-মুখে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারানোর শোক।
এই শোকের পুরো একটি চিত্র যেন তারেক রহমানের ফর্সা মুখ। কয়েক ঘণ্টা আগেও রাতে তার মুখ হাসিমুখে হাসপাতাল ছেড়েছিলেন, আর ভোর এনে দিলো মাকে হারানোর চিরস্থায়ী বেদনার গাঁথা। পাথরমুখো হয়ে বসেছিলেন বৈঠকে তারেক রহমান। সন্তান হয়ে মায়ের মরদেহ বহনের সমগ্র আলোচনা যখন টেবিলে, তারেক রহমানের চোখেমুখে কী এক হারানোর ব্যথা।
খালেদা জিয়া যখন বিএনপির নেতৃত্ব পান তখনও তার কারণ ছিল— তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার। ১৯৮১ সালের ৩০ মে যখন জিয়াউর রহমানকে খুন করা হয়, তারপরেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া।
সন্তানের পাশে বরাবরই উদার খালেদা জিয়া। নানা সময়ে বিতর্ক থাকলেও তারেক রহমানকে নিয়ে তিনি মাতাসম স্নেহ সবসময় দেখিয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তারেক রহমানের মুক্তি ও তার সুচিকিৎসা নিশ্চিতের বিষয়টি ছিল সন্তান হিসেবে খালেদা জিয়ার বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নিজে বিদেশে না গিয়ে দেশে থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা বলছেন, ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন খালেদা জিয়া। ওই রাতেই কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুইজন সদস্যকে তারেক রহমানকে আন্তরিক সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন।
মূলত খালেদা জিয়া কারাগারের যাওয়ার পর থেকে দলের চেয়ারম্যানের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়া অন্তরালে পরামর্শ দিয়েছেন।
বিএনপিসংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, জিয়াউর রহমানের মারা যাওয়ার পর যেমন করে খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। এরপরও রাজনৈতিক ও দেশের জন্য তিনি রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ আট বছরের আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও।
এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানও একই পরিস্থিতির মুখে পড়লেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ মাকে খুব কাছ থেকে দেখার খুব কম সময় পেলেন তিনি। তবে তারেক রহমানের স্ত্রী ও কন্যা রয়েছেন। নিশ্চিতভাবেই এই নিঃসঙ্গতা থেকে তিনি জনগণের সামনে খালেদা জিয়াকে পাবেন, এমন মন্তব্য একজন দায়িত্বশীলের।
লন্ডনে মায়ের সঙ্গে তারেক রহমান এই ইঙ্গিত মিলেছে স্বয়ং তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসেও। তিনি লিখেছেন, ‘আমার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন দেশনেত্রী, আপোষহীন নেত্রী; অনেকের কাছে গণতন্ত্রের মা, বাংলাদেশের মা। আজ দেশ গভীরভাবে শোকাহত এমন একজন পথপ্রদর্শককে হারিয়ে, যিনি দেশের গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় অনিঃশেষ ভূমিকা রেখেছেন।’
‘আমার কাছে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য। আজীবন লড়েছেন স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে; নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ত্যাগ ও সংগ্রামে ভাস্বর হয়েও, তিনি ছিলেন পরিবারের সত্যিকারের অভিভাবক; এমন একজন আলোকবর্তিকা যাঁর অপরিসীম ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি ও প্রেরণা যুগিয়েছে। তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সর্বোচ্চ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও যন্ত্রণা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তিনি অদম্য সাহস, সহানুভূতি ও দেশপ্রেম সঞ্চার করেছিলেন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে।’
‘দেশের জন্য তিনি হারিয়েছেন স্বামী, হারিয়েছেন সন্তান। তাই এই দেশ, এই দেশের মানুষই ছিল তাঁর পরিবার, তাঁর সত্তা, তাঁর অস্তিত্ব। তিনি রেখে গেছেন জনসেবা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
এ প্রসঙ্গে শায়রুল কবির খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় চির অম্লান আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম ও একদলীয় শাসন বাকশাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুণঃপ্রবর্তনে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এর ভিত্তিতে জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধারে দীর্ঘ সংগ্রামে বিজয়গাঁথার প্রতিক একমাত্র আপসহীন নেত্রী। তাদের দেখানো পথ ধরে রক্তের ও রাজনৈতিক দর্শনের উত্তরাধিকার বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘৩১ দফা’র ভিত্তিতে আগামীর কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন বলে আশা করি।’
রিপোর্টারের নাম 
























