দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা, কাঠামো, তদন্তপ্রক্রিয়া ও বিচারিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। সংসদ না থাকায় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করেন।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) জারি হওয়া অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদককে সরাসরি এজাহার দায়ের, গোপন অনুসন্ধান, এনফোর্সমেন্ট ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা, এমনকি অ-জামিনযোগ্য দুর্নীতি মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি, আর্থিক স্বাধীনতা, বিশেষ জজ আদালত স্থাপন ও প্রতিবেদন প্রকাশেও বাধ্যবাধকতা আনা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে প্রথমবারের মতো বলা হয়েছে— বাংলাদেশের নাগরিক ছাড়াও যেকোনও ব্যক্তি, তিনি বিদেশে অবস্থান করলেও যদি বাংলাদেশের ভেতরে সংঘটিত দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হন, তবে এই আইন তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে পরিচালিত দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বাজার কারসাজি আইনের আওতায় আনার পথ সুগম হলো।
আইনের সংজ্ঞা অংশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এখন কমিশনের কর্মকর্তার লিখিত প্রাথমিক বিবরণী বা স্পেশাল জজের নির্দেশেও এজাহার হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগ গ্রহণের পর তদন্ত রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তির পর শুরু হবে।
গোপনীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রেখে তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণ উদ্ঘাটনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
জ্ঞাত আয়কে বৈধ ও আইনসম্মত উৎস থেকে অর্জিত আয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, যেসব জেলায় দুদকের কার্যালয় থাকবে, সেখানে এক বা একাধিক স্পেশাল জজ আদালত স্থাপন বাধ্যতামূলক। এর ফলে দুর্নীতির মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কমবে।
নতুন আইনে দুদকের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সর্বোচ্চ ৫ জন কমিশনার দিতে হবে। যারমধ্যে অন্তত ১ জন নারী কমিশনার থাকতে হবে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ একজন কমিশনার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানসহ কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ দিতে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারকের নেতৃত্বে শক্তিশালী বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদ না থাকলে সংসদ সদস্য ছাড়াই কমিটি গঠন করা যাবে।
নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেলে কমিশনের সিদ্ধান্তে সরাসরি এজাহার দায়ের করা যাবে বলে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে। আদালতের আদেশ, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হলে যাচাই-বাছাই বা তদন্তপূর্ব অনুসন্ধান ছাড়াই মামলা করা যাবে। প্রয়োজন হলে কমিশন গোপন অনুসন্ধান পরিচালনা করতে পারবে
তদন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হলে বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ৬০ কর্মদিবস সময় বাড়ানো যাবে কমিশনের অনুমোদন ও কারণ উল্লেখ সাপেক্ষে।
অধ্যাদেশে আরেকটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। দুদকের তফসিলভুক্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, আপস অযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য বলা হয়েছে।
এছাড়া বিচার চলাকালে অপরাধ স্বীকার করে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে স্পেশাল জজ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সাজা আংশিক বা পুরোপুরি মওকুফ করতে পারবেন।
নতুন আইনে দুদককে সরাসরি এনফোর্সমেন্ট ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা আগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না।
দুদকের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত ধারা ২৫ অনুযায়ী দুদক তার বরাদ্দ অর্থ সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ব্যয় করতে পারবে। তবে সরকারি ব্যয়সংকোচন নীতিমালা প্রযোজ্য থাকবে এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষকের সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল থাকবে।
নতুন বিধানে দুদককে প্রতিবছর মার্চের মধ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে হবে। এরপর ৭ কর্মদিবসের মধ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
এছাড়া ষান্মাসিক ভিত্তিতে অভিযোগ, মামলা, অনুসন্ধান, অর্থ পাচার, বড় দুর্নীতির অগ্রগতি ও অভ্যন্তরীণ শুদ্ধাচার বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
মানিলন্ডারিং ও শেয়ারবাজার অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে। সংশোধিত তফসিলে অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক অপরাধ, জালিয়াতি ও প্রতারণা, ইনসাইডার ট্রেডিং ও মার্কেট ম্যানিপুলেশন যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাতে বড় দুর্নীতির তদন্তে দুদকের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















