বাংলাদেশের জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিপি) সংকটের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (ইউএসএআইডি) ফান্ড আগেই বন্ধ হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তাও শেষ হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে যক্ষা প্রতিরোধ প্রচেষ্টা বড় রকমের ধাক্কা খেতে পারে।
তহবিল ঘাটতির কারণে ৩৬২ জনের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি যক্ষার ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক কিটের অভাব দেখা দিয়েছে, যা জাতীয় যক্ষা প্রতিরোধ অভিযানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম স্থবির হয়ে যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশের ২০৩০ সালের মধ্যে যক্ষা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৩ লাখ ৭৯ হাজার যক্ষা রোগী শনাক্ত হয়। আর বছরে যক্ষায় ৪৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ৭০ হাজার এবং মৃত্যুহার ৬ হাজারে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে তথ্য বলছে, দেশে যক্ষায় আক্রান্ত রোগীদের ১৭ শতাংশ এখনও শনাক্ত হয় না, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৬০৭ জন যক্ষা রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ২৫৮ জন ড্রাগ-রেসিস্ট্যান্ট রোগী।
পরিষেবার ঝুঁকি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যক্ষা কর্মসূচির মাঠকর্মীরা গত ২৫ নভেম্বর জানতে পারেন, গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তা বন্ধ হচ্ছে এবং একই সঙ্গে তাদের চুক্তিও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
নতুন তহবিল না পেলে জানুয়ারি থেকে ৬৫০টি শনাক্তকরণ কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউএসএআইডি’র তহবিল বন্ধ হওয়ায় ইতোমধ্যেই ২ হাজার ২০০ জন চাকরি হারিয়েছেন। একাধিক স্থানে স্ক্রিনিং কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। ওষুধ ও কিটের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হলে ড্রাগ-রেসিস্ট্যান্ট যক্ষা রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। এ ধরনের যক্ষার চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও জটিল।
সরকারি তহবিলের সংকট
প্রায় ৩০ বছর ধরে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (সেক্টর প্রোগ্রাম) আওতায় ছিল জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। ২০২৪ সালের জুনে এই তহবিলের মেয়াদ শেষ হয়।
নতুন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে ১৮ মাস ধরে যক্ষা প্রতিরোধ কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় তহবিল ছাড়াই চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ডিপিপি অনুমোদন না হলে পুরো কর্মসূচি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্বমানের ঝুঁকি, দেশীয় বিপর্যয়
গত ১২ নভেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যক্ষা প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগ। তবে গত বছর বিশ্বজুড়ে এই রোগে ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ।
সাধারণত ফুসফুসকে আক্রান্ত করা যক্ষার ব্যাকটেরিয়া কাশি, হাঁচি বা থুতুর মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশসহ উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ দেশে চিকিৎসা কার্যক্রমে এমন ব্যাঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাৎক্ষণিক সহায়তার আহ্বান
বিপর্যয় এড়াতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদন ও তহবিল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি ডিরেক্টর ড. মো. শাফিন জব্বার মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) জানান, অনেক সমস্যার সমাধান ডিপিপি অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। তাই তারা ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা ১৮ মাস ধরে ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তা ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। তাই পুরো কর্মসূচি যত দ্রুত সম্ভব পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন।”
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে গ্লোবাল ফান্ড ও এনটিপির কর্মকর্তারা আসন্ন সংকট মোকাবিলায় কাজ করছেন। সীমিত পরিসরে সংকট সামাল দিতে কর্মসূচিতে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাককে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনটিপি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ডিপিপি অনুমোদন না হলে দেশে চলমান যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাফল্য গুরুতরভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 





















