ঢাকা ০২:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

আদানির বিদ্যুতে পিডিবির বিশাল লোকসান: দুই বছরে গচ্চা ১৪ হাজার কোটি টাকা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:০৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে
ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা অসম বিদ্যুৎ চুক্তির কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), যেখানে কয়লার উচ্চমূল্য ও চড়া ক্যাপাসিটি চার্জে ডুবছে দেশের জ্বালানি খাত।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এমনকি ভারতের অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেশি। এই উচ্চমূল্যের কারণে গত দুই বছরে পিডিবির লোকসান হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে করা এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও কয়লা—উভয় ক্ষেত্রেই চরমভাবে ঠকছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খরচের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আদানির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে প্রায় ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা, যেখানে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি ও নেপাল থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় দাম মাত্র ৮ টাকা ৭১ পয়সা। এমনকি ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে টোরেন্ট পাওয়ারের মতো কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ দিচ্ছে মাত্র ৮ টাকা ২৫ পয়সায়। আদানির কয়লার দামও দেশের অন্যান্য বড় কেন্দ্রের (পায়রা, মৈত্রী বা এসএস পাওয়ার) তুলনায় টনপ্রতি প্রায় ১ থেকে ৫ ডলার বেশি।

আদানির চুক্তিতে বাংলাদেশের ক্ষতির চিত্র:

খাতের নামক্ষতির বিবরণ / ব্যয়
মোট লোকসানগত ৩ অর্থবছর মিলে ২১,১১৪ কোটি টাকা (শুধু আদানি থেকে ১৪ হাজার কোটি)।
মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জবিদ্যুৎ না কিনলেও প্রতি মাসে দিতে হচ্ছে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি।
২৫ বছরের দায়মোট ক্যাপাসিটি চার্জ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে (যা ৩টি পদ্মা সেতুর খরচের সমান)।
কয়লার মূল্যপ্রতি টন গড়ে ৭৬.৯১ ডলার (অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় সর্বোচ্চ)।

বকেয়া ও আইনি লড়াই:

কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে বর্তমানে আদানির সঙ্গে পিডিবির তীব্র বিরোধ চলছে। এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদানি গ্রুপ সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। গত মাসে বকেয়া পাওনা আদায়ের চাপে তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকিও দিয়েছিল। বর্তমানে পিডিবির কাছে তাদের বিপুল পরিমাণ পাওনা জমে আছে, যা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘বোঝা’। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, এই অসম চুক্তি থেকে বাঁচতে হলে আলোচনার মাধ্যমে দাম কমানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিডিবির একটি কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায়, দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই রক্তক্ষরণ থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আদানির বিদ্যুতে পিডিবির বিশাল লোকসান: দুই বছরে গচ্চা ১৪ হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০৪:০৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা অসম বিদ্যুৎ চুক্তির কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), যেখানে কয়লার উচ্চমূল্য ও চড়া ক্যাপাসিটি চার্জে ডুবছে দেশের জ্বালানি খাত।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এমনকি ভারতের অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেশি। এই উচ্চমূল্যের কারণে গত দুই বছরে পিডিবির লোকসান হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে করা এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও কয়লা—উভয় ক্ষেত্রেই চরমভাবে ঠকছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খরচের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আদানির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে প্রায় ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা, যেখানে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি ও নেপাল থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় দাম মাত্র ৮ টাকা ৭১ পয়সা। এমনকি ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে টোরেন্ট পাওয়ারের মতো কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ দিচ্ছে মাত্র ৮ টাকা ২৫ পয়সায়। আদানির কয়লার দামও দেশের অন্যান্য বড় কেন্দ্রের (পায়রা, মৈত্রী বা এসএস পাওয়ার) তুলনায় টনপ্রতি প্রায় ১ থেকে ৫ ডলার বেশি।

আদানির চুক্তিতে বাংলাদেশের ক্ষতির চিত্র:

খাতের নামক্ষতির বিবরণ / ব্যয়
মোট লোকসানগত ৩ অর্থবছর মিলে ২১,১১৪ কোটি টাকা (শুধু আদানি থেকে ১৪ হাজার কোটি)।
মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জবিদ্যুৎ না কিনলেও প্রতি মাসে দিতে হচ্ছে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি।
২৫ বছরের দায়মোট ক্যাপাসিটি চার্জ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে (যা ৩টি পদ্মা সেতুর খরচের সমান)।
কয়লার মূল্যপ্রতি টন গড়ে ৭৬.৯১ ডলার (অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় সর্বোচ্চ)।

বকেয়া ও আইনি লড়াই:

কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে বর্তমানে আদানির সঙ্গে পিডিবির তীব্র বিরোধ চলছে। এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদানি গ্রুপ সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। গত মাসে বকেয়া পাওনা আদায়ের চাপে তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকিও দিয়েছিল। বর্তমানে পিডিবির কাছে তাদের বিপুল পরিমাণ পাওনা জমে আছে, যা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘বোঝা’। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, এই অসম চুক্তি থেকে বাঁচতে হলে আলোচনার মাধ্যমে দাম কমানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিডিবির একটি কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায়, দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই রক্তক্ষরণ থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।