সেদিন একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বর। দৈনিক শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ট্রাইব্যুনালে এক সাক্ষীর বয়ানে উঠে আসে অপহরণের সময়ের নির্মম বিবরণ— কীভাবে হত্যা করা হয় এই সাংবাদিককে। সন্তানের জন্য সেলিনা পারভীন সেইদিন প্রাণ ভিক্ষা চান, তাকে ছেড়ে দিতে বলেন। তার ছোট একটি ছেলে রয়েছে, যাকে দেখাশুনা করার আর কেউ ছিল না। কিন্তু নিষ্ঠুর হত্যাকারীরা তাকে ছাড়েনি। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
শহীদ চিকিৎসক আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে বলেন, যে নৃশংসভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। চোখের চিকিৎসকের চোখ তুলে নেওয়া, হৃদরোগের চিকিৎসকের হার্ট খুবলে নেওয়া, এসব যারা দেখেননি— তারা বিশ্বাসও করতে পারবেন না।’ সাক্ষী শেষে ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও তিনি বলতে থাকেন, ওরা এতই নৃশংস ছিল যে, যারা চোখের চিকিৎসক ছিলেন তাদের চোখ তুলে নেওয়া, হার্ট বিশেষজ্ঞদের হার্ট খুবলে নিয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। ওরা এদেশ আর যেন উঠে দাঁড়াতে না পারে, সে কারণে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চেয়েছিল।
আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিন দখলদার পাকিস্তানি, হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারআল-বদর, আল-শামসরা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। বিজয় দিবসের ঠিক আগে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী করা হয় জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের দুই কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন হয়। সেখানে বলা হয়, তাদের প্রত্যক্ষ মদদে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক ও ৩ জন চিকিৎসকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণেরপর হত্যা করা হয়। পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে আছেন যুক্তরাষ্ট্রে, আর মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে। রায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের পর পুলিশ প্রহরায় মুঈনুদ্দীনকে দেশে আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। আত্মগোপনে গিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এই আসামিকে দেশে এনে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেন বিচারকেরা।
১৯৭১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা। হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল আলবদর বাহিনী। ১৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে একযোগে অনেক বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। গবেষকরা দাবি করেন, কেবল আজকের দিনেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল তা নয়, ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে দেশজুড়ে হত্যা-ধর্ষণ লুটতরাজের পাশাপাশি বাছাই করে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিধনপর্বও চলছিল প্রায় প্রতিদিনই, এমনকি বিজয়ের পরেও। স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো ৯ মাসই সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বুদ্ধিজীবী হত্যা চলতে থাকে। পাকিস্তানি ঘাতকদের আত্মসমর্পণের ঠিক দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরের বীভৎস-নারকীয়-পাশবিক হত্যাকাণ্ড ছিল ইতিহাসে এক জঘন্য বর্বর ঘটনা। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারির পর ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেওয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন করা হয় এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে বধ্যভূমিতে ফেলে রাখা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন— ড. আলীম চৌধুরী, অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবুতালেব, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এস এ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক ও সেলিনা পারভীন প্রমুখ।
বুদ্ধিজীবী সন্তান, স্বজন ও বিজয়ের পরের দিনের বিবরণ, সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলাতে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় অনেক নিথর দেহ। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত। হাত পেছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়িভুঁড়িও বের করে ফেলা হয়েছে অনেকের।
একাত্তর নিয়ে গবেষণাধর্মী বইগুলোতে সবসময়ই উঠে এসেছে অপহরণ ও কাদামাখা মাইক্রোবাসের কথা। কার্ফু এবং ব্লাক আউটের মধ্যে জিপে করে আলবদররা দিন-রাত বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ধরে এনে প্রথমে সারা গায়ে কাদা মাখা একটি বাসে তোলে। এরপর বাস বোঝাই বুদ্ধিজীবীসহ নানাস্তরের বন্দিকে প্রথম মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজের আলবদর হেডকোয়ার্টারে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এর প্রমাণ মেলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকালে শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে নুসরাত রাব্বী যখন বলেন— কীভাবে তার পিতাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৩টার দিকে আলবদরের লোকজন তাদের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তাদের সঙ্গে কাদামাখা একটি মাইক্রোবাস ছিল। ওই বাসে উঠিয়েই তার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
শহীদদের এতকিছু যখন ইতিহাসের পাতায় জীবন্ত, তখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণায় বিস্ময় প্রকাশ করেন বুদ্ধিজীবীদের সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকেরা। তারা বলছেন— রাজনৈতিক মাঠে কেউ চাইলেই ইতিহাস মিথ্যে হয়ে যায় না।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. এম হাসান বলেন, ‘‘বুদ্ধিজীবী হত্যার দিবস ১৪ তারিখ পালন করা হলেও হত্যাযজ্ঞ চলেছে লম্বা সময় ধরে। অনেক বুদ্ধিজীবীকে ১৯৭১ সালের মার্চে তুলে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান আমাদের মানুষই মনে করতো না। আমাদের সিংহভাগ আয়কে নিজেদের কাজে ব্যয় করতো। প্রতিটি স্তরে ছিল বৈষম্য ও বিদ্বেষ। মুক্তিযুদ্ধের আগে যখন আয়ুব খানকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তখন সেটার নেতৃত্বে শিক্ষকরা ছিলেন বলে তারা মনে করলো এবং তাদের টার্গেট করা শুরু করলো। যুদ্ধ শুরুর পরের ৯ মাস ধরে তারা বেছে বেছে হত্যা করেছে। কিন্তু এই এতগুলো বছরেও আমরা একটু পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারিনি। পাকিস্তান যে বিশাল গণহত্যা করেছে তার ভগ্নাংশও আমরা জানি না। এই নথিভুক্তি সঠিকভাবে করা যায়নি বলেই এখন মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারছে।’’
শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে নুসরাত রাব্বী দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনে আছেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার যখন বিচার চলছিল— তখন তিনি প্রবাস থেকে এসে সাক্ষ্য দিয়ে গিয়েছেন। তিনি আজও পিতার হত্যার বিচার চান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যখন বাবার হত্যার বিচার সম্পন্ন হলো, আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। আমরা এখনও অপেক্ষা করছি, রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে। আশা করি, কোনও একদিন সেটা হবে।’’
রিপোর্টারের নাম 

























