ঢাকা ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

“নিচে নামতে পারিনি, বন্ধু জানালা ভেঙে বাঁচালো”: কাটিং মাস্টার নাজমুলের মুখে মিরপুরের আগুনের বিভীষিকা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে অগ্নিদুর্ঘটনা কবলিত পোশাক কারখানার একজন কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন নাজমুল। অন্যান্য দিনের মতোই তিনি মঙ্গলবার সকালে কর্মস্থলে যোগ দেন। এর মধ্যেই এক বিকট শব্দে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।

এই ভয়াবহতার মধ্যেই এক বন্ধুর সহযোগিতায় কারখানার জানালা ভেঙে তিনি প্রাণ নিয়ে ফিরতে সক্ষম হন। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলের পাশ থেকে নাজমুল নিজেই সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।

নাজমুল জানান, তিনি এক বছর ধরে ‘আর এন ফ্যাশন’ নামে ওই গার্মেন্টসটির চতুর্থ তলায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করছিলেন। আগুন লাগার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই আমি একটা বিকট শব্দ শুনতে পাই। তখন জানালা খুলে দেখি সামনের কেমিক্যাল আর ওয়াস ফ্যাক্টরির মাঝখান দিয়ে আগুন বের হচ্ছে এবং সেই আগুন আমাদের ফ্যাক্টরির দিকেই দ্রুত এগিয়ে আসছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা নিচে নামার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। আমরা তখন চতুর্থ তলায় আটকে পড়ি। পরে আমার বন্ধু বাইরে থেকে আমাদের দেখতে পেয়ে পেছনের দিকের জানালা ভেঙে আমাদের বের করে। বের হওয়ার সময় আমরা পাশের টিনশেডের ওপর গিয়ে পড়ি।”

নাজমুল জানান, “চতুর্থ তলায় আমরা সাতজন লোক ছিলাম এবং আমরা সবাই বের হতে পেরেছি। তবে তিনতলা থেকে লোক বের হতে পেরেছে কি না, আমি বলতে পারি না। এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো খবর জানি না।”

অন্যান্য তলায় কতজন লোক ছিল জানতে চাইলে তিনি অনুমান করে বলেন, “প্রতি ফ্লোরে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন করে ছিল। এটি পাঁচতলা ভবন ছিল। পঞ্চম তলার লোক সবাই বের হয়েছেন। আর তিনতলা থেকে দুইজন বের হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। দোতলায় ছিল একটি প্রিন্ট ফ্যাক্টরি (‘স্মার্ট প্রিন্টিং’) যার ছুটি ছিল। সেখানে ছয়জন লোক ছিল বলে শুনেছি, তারাও বের হয়ে গেছেন।”

নাজমুল আরও জানান, পাঁচতলা ভবনটির তিনতলা ও চারতলায় ছিল ‘আর এন ফ্যাশন’ (গার্মেন্টস), যার মালিক রেজাউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম। পাঁচতলার গার্মেন্টসের নাম ছিল ‘বিসমিল্লাহ ফ্যাশন’ এবং এর মালিকের নাম রাজীব। দোতলায় ছিল টি-শার্ট প্রিন্ট ফ্যাক্টরি ‘স্মার্ট প্রিন্টিং’, আর নিচতলা খালি ছিল।

এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। দগ্ধ আরও বেশ কয়েকজন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তালহা বিন জসিম বলেন, “সব মরদেহ পোশাক কারখানার ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।” তিনি আরও জানান, এখনও কেমিক্যাল গোডাউন ভবনের আগুন নেভানোর কাজ চলছে।

আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসের কাছে আগুনের খবর পৌঁছায়। খবর পাওয়ার পর প্রথম ইউনিট ১১টা ৫৬ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রথমে পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পরে আরও সাতটি ইউনিট যোগ দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করে পোশাক কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তেই আগুন পাশের রাসায়নিকের গোডাউনেও ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করলে ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। পরে তাদের সঙ্গে সহায়তায় যোগ দেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি সদস্যরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরাকান আর্মির প্রধানের অভিনন্দন, নতুন বন্ধুত্বের বার্তা

“নিচে নামতে পারিনি, বন্ধু জানালা ভেঙে বাঁচালো”: কাটিং মাস্টার নাজমুলের মুখে মিরপুরের আগুনের বিভীষিকা

আপডেট সময় : ১০:৩৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে অগ্নিদুর্ঘটনা কবলিত পোশাক কারখানার একজন কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন নাজমুল। অন্যান্য দিনের মতোই তিনি মঙ্গলবার সকালে কর্মস্থলে যোগ দেন। এর মধ্যেই এক বিকট শব্দে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।

এই ভয়াবহতার মধ্যেই এক বন্ধুর সহযোগিতায় কারখানার জানালা ভেঙে তিনি প্রাণ নিয়ে ফিরতে সক্ষম হন। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলের পাশ থেকে নাজমুল নিজেই সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।

নাজমুল জানান, তিনি এক বছর ধরে ‘আর এন ফ্যাশন’ নামে ওই গার্মেন্টসটির চতুর্থ তলায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করছিলেন। আগুন লাগার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই আমি একটা বিকট শব্দ শুনতে পাই। তখন জানালা খুলে দেখি সামনের কেমিক্যাল আর ওয়াস ফ্যাক্টরির মাঝখান দিয়ে আগুন বের হচ্ছে এবং সেই আগুন আমাদের ফ্যাক্টরির দিকেই দ্রুত এগিয়ে আসছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা নিচে নামার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। আমরা তখন চতুর্থ তলায় আটকে পড়ি। পরে আমার বন্ধু বাইরে থেকে আমাদের দেখতে পেয়ে পেছনের দিকের জানালা ভেঙে আমাদের বের করে। বের হওয়ার সময় আমরা পাশের টিনশেডের ওপর গিয়ে পড়ি।”

নাজমুল জানান, “চতুর্থ তলায় আমরা সাতজন লোক ছিলাম এবং আমরা সবাই বের হতে পেরেছি। তবে তিনতলা থেকে লোক বের হতে পেরেছে কি না, আমি বলতে পারি না। এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো খবর জানি না।”

অন্যান্য তলায় কতজন লোক ছিল জানতে চাইলে তিনি অনুমান করে বলেন, “প্রতি ফ্লোরে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন করে ছিল। এটি পাঁচতলা ভবন ছিল। পঞ্চম তলার লোক সবাই বের হয়েছেন। আর তিনতলা থেকে দুইজন বের হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। দোতলায় ছিল একটি প্রিন্ট ফ্যাক্টরি (‘স্মার্ট প্রিন্টিং’) যার ছুটি ছিল। সেখানে ছয়জন লোক ছিল বলে শুনেছি, তারাও বের হয়ে গেছেন।”

নাজমুল আরও জানান, পাঁচতলা ভবনটির তিনতলা ও চারতলায় ছিল ‘আর এন ফ্যাশন’ (গার্মেন্টস), যার মালিক রেজাউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম। পাঁচতলার গার্মেন্টসের নাম ছিল ‘বিসমিল্লাহ ফ্যাশন’ এবং এর মালিকের নাম রাজীব। দোতলায় ছিল টি-শার্ট প্রিন্ট ফ্যাক্টরি ‘স্মার্ট প্রিন্টিং’, আর নিচতলা খালি ছিল।

এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। দগ্ধ আরও বেশ কয়েকজন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তালহা বিন জসিম বলেন, “সব মরদেহ পোশাক কারখানার ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।” তিনি আরও জানান, এখনও কেমিক্যাল গোডাউন ভবনের আগুন নেভানোর কাজ চলছে।

আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসের কাছে আগুনের খবর পৌঁছায়। খবর পাওয়ার পর প্রথম ইউনিট ১১টা ৫৬ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রথমে পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পরে আরও সাতটি ইউনিট যোগ দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করে পোশাক কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তেই আগুন পাশের রাসায়নিকের গোডাউনেও ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করলে ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। পরে তাদের সঙ্গে সহায়তায় যোগ দেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি সদস্যরা।