২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডিতে ১২৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। এর প্রায় ১৬ বছর পর, ২০১৯ সালে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় কেমিক্যালের ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান ৭১ জন। বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বারবার সতর্ক করে আসছিলেন যে, এই ‘মৃত্যুপুরী’গুলো এখনও নিরাপদ নয়। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেই মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরে গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের প্রাণ গেল, আহত হলেন আরও অনেকে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের নয় ঘণ্টা পর আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, র্যাব এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
কেমিক্যাল গোডাউন ও অগ্নিকাণ্ড নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা এখন যেন ‘বোমার শহর’। তাদের আশঙ্কা, সতর্ক না হলে ঢাকার অলিগলিতে নীরবে আবারও এমন মৃত্যুপুরী জেগে উঠতে পারে।
বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত সরকারের আমলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) পুরান ঢাকা, মিরপুর ও উত্তরাসহ বেশ কিছু এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল, যা বর্তমানে আর দেখা যাচ্ছে না। যেহেতু মিরপুরও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, সরকারের উচিত ছিল আগে থেকেই সতর্ক থাকা। তাহলে হয়তো এই নতুন ট্রাজেডি এড়ানো যেত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক এক বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞের মতে, ঢাকা শহর এখন ‘এটম বোমার শহরের’ মতো, যেখানে মানুষ যেকোনো সময় পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে—যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে বিরল। তিনি আক্ষেপ করেন, কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেই চলেছে, কিন্তু আমরা সতর্ক হচ্ছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল হক বলেন, “ঢাকার মানুষ এক হিসেবে এটম বোমার সঙ্গে বসবাস করছে। এসব কেমিক্যাল সরানোর পদক্ষেপ বারবার ব্যর্থ হয় আর আমাদের বারবার শ্রমজীবী ও প্রিয়জনদের হারাতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “মিরপুরের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী। কিন্তু কর্তৃপক্ষের টনক কবে নড়বে? সাধারণ মানুষের এমন হাহাকার কি ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা দেখেন না?”
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ২৭,৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৭৯২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়। ২০২৪ সালে ২৬,৬৫৯টি ঘটনায় ১৪০ জন এবং ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ১৫৪ জন মানুষ মারা গেছেন আগুন ও বিস্ফোরণে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণা বলছে, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, যার মধ্যে ১৫ হাজারই বাসাবাড়িতে। সমগ্র ঢাকা শহরে এই সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থা ৪,৮৫০টিরও বেশি গোডাউনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে মিরপুর ও উত্তরা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, পুরান ঢাকাসহ পুরো ঢাকা শহরে প্রায় ৪ হাজার ব্যবসায়ী রাসায়নিক ব্যবসার সাথে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ গোডাউন চিহ্নিত করা হলেও দুর্ঘটনা এড়াতে হাতে নেওয়া অনেক পদক্ষেপই আলোর মুখ দেখেনি। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি স্বল্পমেয়াদি কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।
জানা গেছে, পুরান ঢাকায় ছোট-বড় মিলে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গুদামের মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামের ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন, বাকিগুলো অবৈধ। বিগত সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত রাসায়নিক ব্যবসা সরানোর কথা বলা হলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালে ডিএসসিসি উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলেও এফবিসিসিআইয়ের অনুরোধে তা স্থগিত হয় এবং আর শুরু হয়নি।
সম্প্রতি পুরান ঢাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, চকবাজারসহ বেশিরভাগ এলাকায় কেমিক্যালের দোকানগুলোতে সারি সারি প্লাস্টিকের ড্রাম, বস্তাভর্তি দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ঠাসা। তার ওপরেই রয়েছে বাসাবাড়ি এবং দোকানের ওপরে ঝুলছে এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার। এসব গোডাউনে গ্লিসারিন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার-সহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ মজুত থাকে, যা আগুনের সংস্পর্শে এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইকবাল খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কেমিক্যাল গুদাম অপসারণসহ ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়। তবে সেই সুপারিশমালা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফাইলবন্দি। ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পরও গঠিত তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। ফায়ার সার্ভিসের উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল: আবাসিক এলাকায় কোনো রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম স্থাপন করা যাবে না, পুরান ঢাকার রাস্তা কমপক্ষে ২০ ফুট প্রশস্ত করতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেই সুপারিশের পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটেনি আজও।
২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনার পর পুরান ঢাকার অবৈধ রাসায়নিক দ্রব্যের দোকান অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, ২০১৫ সালে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দায় ২০ একর জমিতে কেমিক্যাল পল্লি গঠনের কথা থাকলেও প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সেই জমি আইটি পার্ক করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ীরাও চান পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল দ্রুত সরানো হোক। বাংলাদেশ প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ী পলাশ আহমেদ বলেন, “মিরপুরের মতো ফের কোনো বড় ঘটনা ঘটুক, সেটা দেশের মানুষ দেখতে চায় না, আমরাও চাই না।”
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, বর্তমানে ৯ ধরনের কেমিক্যাল আমদানির মধ্যে মাত্র ৩ ধরনের বহন, ব্যবহার ও সংরক্ষণের নীতিমালা রয়েছে। বাকি ৬ ধরনের কেমিক্যালের আড়ালে বিভিন্ন বিস্ফোরক ও নেশাজাতীয় কেমিক্যাল আমদানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, “সারা ঢাকায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এগুলো না সরালে কিছুতেই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।”
বুয়েটের অধ্যাপক ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ আশিকুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো ঘটনার পরও সতর্ক হই না। সতর্ক না হওয়ার কারণে দিনের পর দিন আপনজনদের হারাচ্ছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে একটি ঘটনা ঘটার পর মানুষ কিছুদিন সতর্ক থাকেন, পরে এসব ঘটনাকে কিছু মনে করেন না। আমরা নিমতলী, চুড়িহাট্টাসহ অনেক ঘটনা ভুলে গিয়েছি। মিরপুরের ঘটনাও সতর্ক না হয়ে ভুলে যাবো।”
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বেশকিছু সুপারিশ জানালেও কেউ তা আমলে নেয়নি। যদি আমলে নিতো তাহলে এসব ঘটনা অনেকটাই কমে আসতো। আমরা কেউ এসব বিষয়ে সতর্ক নই। বরং নিজের মতো সবকিছু গড়ি এবং আইন না মেনেই অনেকেই বছরের পর বছর চলছে। যার কারণে ঘটছে এসব বড় বড় দুর্ঘটনা।”
রিপোর্টারের নাম 


















