রাজশাহীর তানোর উপজেলায় গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যাওয়া দুই বছরের শিশু সাজিদকে ৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হলেও বাঁচানো যায়নি। শিশুটিকে উদ্ধার করে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মৃত ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাতে মাটির ৫০ ফুট নিচের গর্ত থেকে শিশু সাজিদকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। এমন অবহেলাজনিত মৃত্যু আর কত? দেশে প্রায়ই এমন অসতর্কতার কারণে ঘটে নানান দুর্ঘটনা, একপর্যায়ে হৃদয়বিদারক মৃত্যু। এমন অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা শুধু এখন নয়, আগেও দেখা গেছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জিহাদ নামে এক শিশু ঢাকার শাহজাহানপুরে একটি পরিত্যক্ত গভীর পাইপে পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হয়। ওই মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় প্রথমে ৪ জন দোষী সাব্যস্ত হলেও পরবর্তীতে হাইকোর্ট তাদের খালাস দেন। তবে রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ শিশু জিহাদের পরিবারকে আদালতের নির্দেশে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।
ঢাকাতেই ২০১৬ সালে চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার খালিদ মাহমুদ মিঠু রিকশায় করে নিজ অফিস থেকে ফেরার পথে রিকশার ওপরে কৃষ্ণচূড়া গাছ পড়ে মারা যান। যদিও শিশু জিহাদের মামলার মতো এটি সরাসরি অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা (৩০৪ক ধারা) হিসেবে তেমনভাবে সামনে আসেনি বা এই ঘটনায় কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযোগ দায়েরের খবর পাওয়া যায়নি। তবে তখন প্রশ্ন উঠেছিল গাছটি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অবহেলা ছিল কিনা।
এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ও অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আলহাজ মো. বোরহান উদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর ৩০৪(ক)সহ যেসব ধারা রয়েছে সেগুলো মূলত ১৮৬০ সালের। প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে এমন অনেক আইন আছে। তবে এটি পরিবর্তন হবে কিনা সেটি নির্ভর করে অপরাধ, অবহেলা অসতর্কতার (ক্লাসিফিকেশন) প্রকারভেদের ওপর। আর এ আইনটি বিভিন্ন সময়ে; যেমন এরশাদ সরকারের আমলে জামিন অযোগ্য করা হয়েছিল। পরে রিকশাচালকদের আন্দোলনের মুখে আবার পরিবর্তন করা হয়। সুতরাং আমাদের দেশে এগুলো খুব জটিল ব্যাপার। দেখা গেলো ফুটপাত উচ্ছেদ করা হলো জনগণের স্বার্থে, কিন্তু ঠিক পরদিনই আবার হকাররা রাস্তায় নামলো। তাই পরিবর্তন এবং বাস্তবায়ন সবই সর্বশ্রেণির সঙ্গে ব্যালেন্স করেই করতে হয়। অবহেলাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ছাড়া পেয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কঠোরতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারোটি ঘোড়া দৌড়াতে থাকে’ এমন কথা প্রচলিত রয়েছে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোরভাবে প্রয়োগ ও পরিবর্তন হতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই অপরাধের ধরন ও প্রকারভেদের সঠিক বিচার বিশ্লেষণের পরই কেবল করা যেতে পারে।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবহেলিতজনিত মৃত্যুর ব্যাপারটি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এখানে মূল ব্যাপার হচ্ছে-মেনসিয়া। অর্থাৎ অবহেলাজনিত কারণে যদি কারও মৃত্যু হয় সেক্ষেত্রে অবহেলার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে শাস্তিযোগ্য। তবে এর কারণে যদি কারোর মৃত্যু হয় সেখানে অবহেলাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের (মেনসিয়া) হত্যার করার ইচ্ছে বা উদ্দেশ্য ছিল কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আদালতের বিচারকার্য কিছু দুর্বলতর নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত যায়। এমনকি হাইকোর্টে গিয়েও কিছু মামলার বিচার নিয়ে কথা ওঠায় আপিলেট ডিভিশন পর্যন্ত যেতে হয়।’
কূপের ঢাকনা খোলা থাকায় ২০১৪ সালে শিশু জিহাদ সেখানে পড়ে একপর্যায়ে মৃত্যু হয়। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তা যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত দায়িত্বে এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারা যেন দায়িত্বে অবহেলা না হয় সে জন্য আইনের কড়া বাস্তবায়ন জরুরি কিনা জানতে চাইলে এ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘অবশ্যই এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া উচিত না। কারণ এক্ষেত্রে যদি আইন আদালতের শিথিলতা থাকে তাহলে অপরাধী বা যারা এসব কাজে ঠিকাদারি নেয় তারা লাগামহীন হয়ে যাবে, আর এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। তবে এক্ষেত্রে হত্যার ব্যাপারটি এবং উদ্দেশ্য নিশ্চিত করে শাস্তি দেওয়া একটু কঠিন ব্যাপারই। কারণ একই ঘটনার অনেক ধরনের বিচার হতে পারে। যেমন কেউ মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে যে শাস্তি, সেটি অনিচ্ছাকৃত স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হলে ভিন্ন শাস্তি আদালত দিয়ে থাকেন। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সুষ্ঠু তদন্ত ও (মেনসিয়া) হত্যার ইচ্ছার ওপর।’
এ বিষয়ে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত পিপি) মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অবহেলাজনিত কারণে যদি রাষ্ট্রের কোনও নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং শাস্তিযোগ্য। তবে এক্ষেত্রে অপরাধীরা বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি হওয়ার কারণে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যেন ছাড় না পেয়ে যায় সে জন্য সচেতন থাকতে হবে। আইন আদালতের কঠোরতা অবশ্যই সাধারণ নাগরিকদের বা ভুক্তভোগী যেকোনও নাগরিকদের আইনের প্রতি আস্থা যোগাবে। এজন্য আলোচিত শিশু জিহাদের অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনাসহ এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য আইনের কঠোরতা দরকার। রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবহেলা নিয়ে অসতর্কভাবে কাজ করলে এমন দুর্ঘটনা হবেই, সেক্ষেত্রে আইনের বাস্তবায়ন থাকতে হবে।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খাদেমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের অবহেলাজনিত মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলেও সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর হওয়ায় দেখা যায়, মামলা হলেও দ্রুত জামিন হয়ে যায়। পরবর্তীতে বাদী-বিবাদী পক্ষের আগ্রহ তেমনভাবে না থাকার কারণে এসব মামলা নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আর আগ্রহ থাকে না। এছাড়াও এসব মামলায় কোনও কারণে ট্রায়াল কোর্ট সাজা দিলেও তখন দেখা যায় সাক্ষ্য প্রমাণের দুর্বলতা আছে। এ কারণে আপিল কোর্টে জামিন হয়ে যায়।’
এ ধরনের মামলায় আসামি জামিন পেয়ে যায় কীভাবে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, ‘এ ধরনের মামলার আসামিরা তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তদন্তে প্রভাব ফেলে। এর কারণে তারা ধীরে ধীরে জামিন পেয়ে যায়। এসব মামলায় সাক্ষীদের প্রভাবিত করেও প্রভাবশালীরা পার পেয়ে যায়।’
রিপোর্টারের নাম 























