দেশের অর্থনীতি বর্তমানে গুরুতর সংকটে রয়েছে। ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, রফতানিতে টানা পতন, অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ বাড়ছে। শেয়ার বাজারে লেনদেন কমে গেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে অন্তত নয়টি প্রধান সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
১. রফতানিতে ধারাবাহিক পতন ও পাল্টা শুল্কের প্রভাব
পণ্য রফতানিতে টানা চার মাস ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। নভেম্বর মাসে রফতানি আয় গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা (২৩ কোটি ডলার) কমে ৩৮৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাব: ৭ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর প্রভাবে আগস্টে রফতানি ৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৫ শতাংশ এবং অক্টোবরে ৭ শতাংশ কমে।
- পণ্যভিত্তিক নেতিবাচক চিত্র (নভেম্বর): তৈরি পোশাকে রফতানি কমেছে ৫ শতাংশ, কৃষিপণ্যে ২৫ শতাংশ, ওষুধে ৯ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৮ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ১০ শতাংশ, এবং হিমায়িত মাছ খাতে ৯ শতাংশের বেশি।
- চ্যালেঞ্জ: বিজিএমইএ পরিচালক এবিএম শামসুদ্দীন আহমেদের মতে, ইইউ বাজারে চীনের আগ্রাসী রফতানি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমাচ্ছে। ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন রুবেল নতুন বাজার, নতুন পণ্য এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছেন।
২. করের অতিরিক্ত চাপ এবং রাজস্ব ঘাটতি
ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, জ্বালানির চড়া মূল্য, নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কঠিন পরিবেশে উদ্যোক্তা থেকে সাধারণ মানুষ—সবার কাঁধেই করের বোঝা বাড়ছে।
- রাজস্ব ঘাটতি ও লক্ষ্যবৃদ্ধি: চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রাজস্ব ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরপরও আইএমএফের শর্ত পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার ওপরে নির্ধারণ করেছে।
- ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: অর্থনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর আবু আহমেদ এই অতিরিক্ত করের চাপকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও উৎসে কর (টিডিএস) সংক্রান্ত অতিরিক্ত চাপকে ‘কর সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে এর অবসানের দাবি জানিয়েছেন।
৩. ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া এখনও জটিল
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া এখনও বেশ জটিল। উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দফতরে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হওয়ায় দুর্নীতি ও হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হয়। তার মতে, সরকারি সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এনে এই দুর্ভোগ কমানো জরুরি।
৪. আস্থা নেই দেশের পুঁজিবাজারে
দেশের শেয়ার বাজার টানা সংকটে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ঘন ঘন দরপতন, লেনদেনের তীব্র খরা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এখন বাজারের প্রধান চিত্র।
- আস্থাহীনতার কারণ: বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতীতের অনিয়ম, দুর্নীতি, তদন্তে শিথিলতা এবং বড় বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আস্থা তলানিতে নেমেছে।
- লেনদেনে খরা: লেনদেন নেমে এসেছে ছয় মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। রবিবার ডিএসইতে লেনদেন হয় মাত্র ২৬৭ কোটি টাকার, যা গত ১৫ জুনের পর সর্বনিম্ন।
- বিশেষজ্ঞদের মত: অনিশ্চয়তা দূর না হলে বাজারে আস্থা ফিরবে না এবং এই পরিবেশে পতন থামানো কঠিন।
৫. অর্থনীতির গতি আবার ধীর হয়েছে (পিএমআই পতন)
নভেম্বরে দেশের অর্থনীতির সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমা, রফতানি প্রতিযোগিতায় চাপ, অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং বিনিয়োগ স্থগিত রাখার প্রবণতা এই ধীরগতির কারণ।
- পিএমআই পতন: মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের নভেম্বর মাসের পিএমআই (পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স) সূচক এক মাসে ৭.৮ পয়েন্ট কমে ৫৪-এ দাঁড়িয়েছে (অক্টোবরে ছিল ৬১.৮)। সূচক ৫০-এর ওপরে থাকলে সম্প্রসারণ নির্দেশ করে।
- খাতভিত্তিক ধীরগতি: উৎপাদন খাত (৫২.৩), নির্মাণ খাত (৫১.২) এবং সেবা খাত (৫১.৬)—এই তিনটি প্রধান খাতেই সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
৬. আবারও বেড়েছে মূল্যস্ফীতি
নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
- খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: নভেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
- গ্রামীণ ও শহুরে চাপ: মূল্যস্ফীতির বাড়তি চাপ গ্রাম (৮.২৬ শতাংশ) ও শহর (৮.৩৯ শতাংশ)—উভয় অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছে।
- দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ চাপ: প্রায় তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বজায় আছে।
৭. ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে
বিশ্বব্যাংকের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ৪২ শতাংশ বেড়েছে। দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পরিমাণ এই সময়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
- ঋণ বৃদ্ধির কারণ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নেওয়া বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ।
- ঝুঁকি বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, বাংলাদেশ ঋণের স্থিতিশীলতা সূচকে ‘লো’ ঝুঁকির দেশ থেকে এখন ‘মডারেট’ ক্যাটাগরিতে উঠে এসেছে।
৮. উচ্চ সুদ হার (অর্থনীতির গতিশীলতায় বাধা)
ঋণের উচ্চ সুদ হার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এত উচ্চ সুদ ব্যবসায়ীরা সহ্য করতে পারছেন না এবং এটি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হচ্ছে।
৯. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট
জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চলমান সংকট উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের উপর গুরুতর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ।
রিপোর্টারের নাম 



















