পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার অন্তর্গত নাফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে ভাসমান কয়েকটি সাধারণ মাছ ধরার নৌকার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সখিনা খাতুন। ওই ভাসমান নৌকাগুলোর আশপাশেই একসময় ছিল তাঁর নিজের মাথা গোঁজার বসতভিটা, পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি আর ছোট শিশুদের কোলাহলে মুখরিত একটি প্রাণবন্ত জনপদ।
তবে আজ সেখানে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই, চারদিকে শুধু নদীর প্রমত্তা ঢেউ। সমুদ্র ও নাফ নদীর অব্যাহত মারাত্মক ভাঙনে গত দেড় দশকে টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে দেড় হাজারের বেশি বসতঘরবাড়ি। ভিটেমাটি হারিয়ে সম্পূর্ণ ছিন্নমূল ও নিঃস্ব হয়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। অনেকেই নিরুপায় হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও, যাওয়ার মতো নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় এখনও শত শত পরিবার নদী ও সাগরের অতি বিপজ্জনক কিনারায় চরম ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন বসবাস করছেন।
শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা সখিনা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ওই যে দূর নদীতে ভাসমান নৌকাগুলো দেখছেন, ঠিক সেখানেই একসময় আমাদের প্রায় ৩০০ পরিবারের বিশাল একটি জমজমাট পাড়া ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সেই পুরো এলাকাটি এক রাতেই নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে আর কখনোই এই নদীর ভাঙন থামেনি।
তিনি আরও জানান, গত প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে তিনি নিজে পাঁচ-পাঁচবার নিজ বসতি হারিয়েছেন। তবুও মায়া ও উপায় না থাকায় দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি। সখিনা খাতুন বলেন, আমাদের আর যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা বা সম্বল নেই। তাই প্রতিনিয়ত ভিটে হারানোর ভয় নিয়েই প্রতিদিন নদী-সাগরের সাথে বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছি।
একই কঠোর ও করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম। বর্তমানে তিনি বিপজ্জনক নাফ নদীঘেঁষা নড়বড়ে বেড়িবাঁধের ঠিক পাশে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন। নদীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বলেন, একসময় ঠিক ওই গভীর পানিপ্রবাহের জায়গাতেই আমার নিজের বসতবাড়ি ছিল। নদীর নিষ্ঠুর ভাঙনে সব হারিয়ে বাধ্য হয়ে আজ বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রয় নিয়েছি। স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার নিয়ে এভাবে আর কতদিন নদীকূলে টিকে থাকতে পারব, তা ঈশ্বরই জানেন।
টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সর্বমোট ১৩টি ছোট-বড় গ্রাম নিয়ে ঐতিহ্যবাহী শাহপরীর দ্বীপে আনুমানিক প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে গত মাত্র এক দশকের ভয়াবহ নদী ও সাগরভাঙনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তাঁদের পৈতৃক ঘরবাড়ি হারিয়ে টেকনাফ পৌরসভা, ছোট হাবিরপাড়া, মহেশখালীপাড়া, ডেইলপাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া, হ্নীলা, উখিয়ার পাইন্ন্যাসা, পালংখালী এবং কুতুপালংসহ বিভিন্ন দূর-দূরান্তের নিরাপদ এলাকায় বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু বাসস্থানই নয়, এর পাশাপাশি বহু মানুষ হারিয়েছেন তাঁদের উপার্জনের একমাত্র জীবিকার উৎসও।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যমতে, পূর্বে সীমানা ঘেঁষে চঞ্চল নাফ নদী এবং পশ্চিমে উত্তাল বঙ্গোপসাগর অবস্থান করায় ভৌগোলিক বিচারে শাহপরীর দ্বীপ সমগ্র দেশের অন্যতম অতি ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৯১ সালের ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে নদী ও তীব্র সাগরভাঙনে দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি স্থানীয় পরিবার পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত ও সর্বস্বান্ত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে দ্বীপের পশ্চিম পাশের মূল বেড়িবাঁধটি ভেঙে সাগরে তলিয়ে যাওয়ার পর থেকে পশ্চিমপাড়া, জালিয়াপাড়া ও মাঝপাড়ার একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে যায়।
সমুদ্রভাঙনে নিজেদের ভিটামাটি ও সম্বল হারিয়ে কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকায় পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেওয়া মনোয়ারা বেগম কষ্টের কথা স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন সব হারিয়ে নিস্ব হয়ে গেলাম, তখন বাধ্য হয়েই ভিটে ছেড়ে এখানে চলে আসি। কিন্তু পরবর্তীতে এই এলাকায় বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে ওঠে। ফলে নতুন জায়গায় এসেও আমরা আমাদের আগের স্বাভাবিক ও শান্ত জীবন আর কখনোই ফিরে পাইনি।
বর্তমানে ডেইলপাড়ায় বসবাসকারী আব্দুল আমিন নামের অপর এক অধিবাসী বলেন, আগে দ্বীপে থাকার সময় ঘরের পাশে নদী বা সাগরে গিয়ে মাত্র আধা ঘণ্টা ছিপ ফেলে বা জাল দিয়ে মাছ ধরেই অনায়াসে চার-পাঁচশত টাকা আয় করা যেত। কিন্তু এখন ভাঙনের পর সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বসতবাড়ির সাথে সাথে আমরা আমাদের নিশ্চিত জীবিকাও হারিয়ে ফেলেছি।
সাগরভাঙনের সরাসরি শিকার হয়ে সব হারানো সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিন চরম আক্ষেপের সাথে বলেন, আমার নিজস্ব সংরক্ষিত ওয়ার্ডের দুটি বিশাল পাড়া পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। যার প্রভাবে প্রায় ৩০০ পরিবার মুহূর্তেই মাথা গোঁজার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। আমার নিজের শেষ পৈতৃক ভিটেমাটি এবং আট একর দামি চাষের জমি সাগরের পেটে তলিয়ে গেছে। যে আমি একসময় স্থানীয় মানুষের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি ছিলাম, আজ আমি নিজেই এক সর্বহারা মানুষ।
শাহপরীর দ্বীপের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য আবদুস সালাম আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা জানিয়ে জানান, তাঁর নিজের ওয়ার্ডেই এখনও প্রায় ৫০০ সাধারণ মানুষ নদীর অতি ঝুঁকিপূর্ণ তীরঘেঁষে মারাত্মক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে সেখানে প্রায় ৩০০টি বসতঘর সরাসরি নদীগর্ভে তলিয়ে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি অবিলম্বে এই সকল চরম ঝুঁকিতে থাকা নদীর কূলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন করা এবং টেকসই আন্তর্জাতিক মানের বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো দাবি জানান।
সার্বিক সংকট ও স্থানীয় অধিবাসীদের চরম দুর্ভোগের বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, শাহপরীর দ্বীপের নদী ও সমুদ্রপাড়ের মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো খুব শিগগিরই সরেজমিন সরাসরি পরিদর্শন করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রিপোর্টারের নাম 






















