ঢাকা ০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

তীব্র তাপদাহে দেশের মানুষের আয় হ্রাস ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিমুখী সংকট

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশ কেবল দিন দিন আরও বেশি উষ্ণই হয়ে উঠছে না, বরং এই চরম আবহাওয়া দেশের কোটি কোটি পরিবারকে এক গভীর ও অভূতপূর্ব আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনবরত ও তীব্র তাপদাহের কারণে একদিকে যেমন বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের দৈনন্দিন ও মাসিক আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে রোগব্যাধি বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্যসেবার পেছনে সাধারণ মানুষের খরচের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

গতকাল ১৯ জুলাই ২০২৬ (রবিবার) আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাডেলফি গ্লোবাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই উদ্বেগজনক ও করুণ পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। “হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং – এ কল ফর অ্যাকশন” (Heat, Health and the Increasing Costs of Living – A Call for Action) শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপদাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে—সমগ্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত এবং নাইজেরিয়াকে সবচেয়ে বেশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মর্যাদায় রাখা হয়েছে। যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—এই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানের ব্যাপকতা, চিকিৎসা সেবায় উচ্চ নিজস্ব ব্যয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমানতা।

বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা—এই আটটি ভিন্ন দেশের ওপর পরিচালিত বিশেষ গবেষণায় জলবায়ুজনিত তীব্র তাপদাহ কীভাবে একই সাথে একটি পরিবারের মোট আয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে এটিই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সমন্বিত গবেষণা প্রতিবেদন।

কর্মঘণ্টা ও আয় হ্রাসের উদ্বেগজনক পূর্বাভাস: উক্ত প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ বা অনুমান অনুযায়ী, চরম তাপদাহ ও অসহ্য গরমে তৈরি হওয়া শারীরিক অবশতা ও ক্লান্তির (হিট স্ট্রেস) কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের সাধারণ শ্রমিকরা বছরে গড়ে প্রায় ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজের মূল সময় হারাবেন। এমনকি কম কার্বন নিঃসরণের ইতিবাচক পরিবেশগত পরিবেশেও— এই দুটি প্রধান খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বর্তমানের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশের সব খাত মিলিয়ে বার্ষিক কর্মঘণ্টা হারানোর এই হার বর্তমানের ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে। এর সরাসরি ফলে দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া শ্রমিকের সার্বিক আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। বিশেষত শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত প্রতিদিনের মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা, যাদের কোনো প্রকার বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা বা আয়ের ন্যূনতম সরকারি বা বেসরকারি নিরাপত্তা নেই— তারাই এই তাপদাহজনিত অর্থনৈতিক ধ্বসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবেন।

এর পাশাপাশি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে খরচের (আউট অব পকেট স্পেন্ডিং) ওপর মাত্রাতিরিক্ত ও বিপজ্জনক নির্ভরতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিগত ২০২৩ সালের সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থই সাধারণ পরিবারগুলোকে সরাসরি নিজেদের পকেট থেকে মেটাতে হয়েছে, যা গবেষণায় পর্যালোচিত আটটি দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে নিজ অর্থে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় ৮৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জলবায়ুজনিত তীব্র গরমে কাজ করতে না পেরে আয় হারানো পরিবারগুলোর ওপর এক চরম ও নির্মম আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা থাকবে ৩০ ডিগ্রির ওপরে: আগামী দশকগুলোতেও বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবেই অবস্থান করবে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যবর্তী এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল উচ্চ থেকে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা-ভিত্তিক তীব্র তাপ-ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। দেশের অনেক অঞ্চলে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিনই গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে অবস্থান করবে।

গ্রীষ্মকাল ও চরম তাপদাহের পুরো সময়টিতে দেশের কিছু কিছু শিল্প ও উৎপাদন খাতে উৎপাদনশীলতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে, যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকা এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির জন্য এক বিশাল ও ক্রমবর্ধমান হুমকি।

এই সমস্ত ক্ষতিকর প্রভাবগুলো বাংলাদেশে আরও বেশি মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার প্রধান কারণ হলো দেশের শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল বাহুল্য। বিশেষত দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত প্রায় শতভাগ নারী শ্রমিকই সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কাজ করে থাকেন। নির্মাণশিল্পের মতো অন্যান্য প্রচণ্ড তাপদাহ-ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর বর্তমান অবস্থাও ঠিক একই রকম। যেহেতু কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ছাতা তাঁদের মাথার ওপর নেই, তাই প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রতিটি কর্মঘণ্টা বা কাজের দিন হারানোর অর্থ হলো তাঁদের জন্য সরাসরি দৈনিক আয় হারিয়ে ফেলা।

সমন্বিত আইনি ও নীতিগত সংস্কারের জরুরি আহ্বান: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ের আর্থিক ক্ষতির সীমানা ছাড়িয়ে, এই তীব্র তাপদাহ বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের একটি মারাত্মক ধাক্কা দিয়ে চলেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০২৪ সালে কেবল তাপদাহের কারণে বাংলাদেশ শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতার খাত থেকে আনুমানিক প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিশাল অর্থ হারিয়েছে। এর ওপর তাপদাহের সময় সারাদেশে ঘন ঘন লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি হওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এতে কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকেরা চার দেয়ালের ঘরের ভেতরেই প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করেন এবং শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। একই সাথে শরীর ঠাণ্ডা রাখার বা বিশ্রামের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এখন আর জলবায়ু অভিযোজন (ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন), সাধারণ জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা আলাদা আইনি ও নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার মতো বিলাসিতা দেখানোর অবস্থায় নেই। এর পরিবর্তে দেশের সরকারি জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষকে রেখে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রদত্ত মূল ও জরুরি সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. সাধারণ নাগরিকদের নিজস্ব পকেটের চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ শক্তিশালী করা, ২. কার্যক্ষেত্রে তীব্র তাপদাহের প্রত্যক্ষ সম্মুখীন হওয়া সকল শ্রমিকদের সামাজিকভাবে ও শ্রম আইনের আওতায় এনে সুরক্ষার পরিধি বহুলাংশে বাড়ানো, ৩. বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপদাহজনিত সমস্ত জনস্বাস্থ্য ও শারীরিক ঝুঁকিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, এবং ৪. দেশের জনস্বাস্থ্য খাত ও শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষার তাগিদে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন (ক্লাইমেট ফাইন্যান্স) নিশ্চিত করা।

পরিবেশ, অর্থনীতি ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষণের বিশ্বখ্যাত স্বাধীন থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে যে, ভবিষ্যতে তাপদাহের পুনরাবৃত্তি ও স্থায়িত্ব যত বৃদ্ধি পাবে, ততই দ্রুততার সাথে দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা ও সাধারণ পরিবারের আয় সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন এজেন্ডার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হাটহাজারীর আনন্দবাজার সেতু: দুই বছরেও শেষ হয়নি নির্মাণ, জনদুর্ভোগ চরমে

তীব্র তাপদাহে দেশের মানুষের আয় হ্রাস ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিমুখী সংকট

আপডেট সময় : ১১:৩৭:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশ কেবল দিন দিন আরও বেশি উষ্ণই হয়ে উঠছে না, বরং এই চরম আবহাওয়া দেশের কোটি কোটি পরিবারকে এক গভীর ও অভূতপূর্ব আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনবরত ও তীব্র তাপদাহের কারণে একদিকে যেমন বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের দৈনন্দিন ও মাসিক আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে রোগব্যাধি বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্যসেবার পেছনে সাধারণ মানুষের খরচের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

গতকাল ১৯ জুলাই ২০২৬ (রবিবার) আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাডেলফি গ্লোবাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই উদ্বেগজনক ও করুণ পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। “হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং – এ কল ফর অ্যাকশন” (Heat, Health and the Increasing Costs of Living – A Call for Action) শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপদাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে—সমগ্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত এবং নাইজেরিয়াকে সবচেয়ে বেশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মর্যাদায় রাখা হয়েছে। যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—এই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানের ব্যাপকতা, চিকিৎসা সেবায় উচ্চ নিজস্ব ব্যয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমানতা।

বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা—এই আটটি ভিন্ন দেশের ওপর পরিচালিত বিশেষ গবেষণায় জলবায়ুজনিত তীব্র তাপদাহ কীভাবে একই সাথে একটি পরিবারের মোট আয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে এটিই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সমন্বিত গবেষণা প্রতিবেদন।

কর্মঘণ্টা ও আয় হ্রাসের উদ্বেগজনক পূর্বাভাস: উক্ত প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ বা অনুমান অনুযায়ী, চরম তাপদাহ ও অসহ্য গরমে তৈরি হওয়া শারীরিক অবশতা ও ক্লান্তির (হিট স্ট্রেস) কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের সাধারণ শ্রমিকরা বছরে গড়ে প্রায় ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজের মূল সময় হারাবেন। এমনকি কম কার্বন নিঃসরণের ইতিবাচক পরিবেশগত পরিবেশেও— এই দুটি প্রধান খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বর্তমানের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশের সব খাত মিলিয়ে বার্ষিক কর্মঘণ্টা হারানোর এই হার বর্তমানের ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে। এর সরাসরি ফলে দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া শ্রমিকের সার্বিক আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। বিশেষত শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত প্রতিদিনের মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা, যাদের কোনো প্রকার বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা বা আয়ের ন্যূনতম সরকারি বা বেসরকারি নিরাপত্তা নেই— তারাই এই তাপদাহজনিত অর্থনৈতিক ধ্বসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবেন।

এর পাশাপাশি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে খরচের (আউট অব পকেট স্পেন্ডিং) ওপর মাত্রাতিরিক্ত ও বিপজ্জনক নির্ভরতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিগত ২০২৩ সালের সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থই সাধারণ পরিবারগুলোকে সরাসরি নিজেদের পকেট থেকে মেটাতে হয়েছে, যা গবেষণায় পর্যালোচিত আটটি দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে নিজ অর্থে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় ৮৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জলবায়ুজনিত তীব্র গরমে কাজ করতে না পেরে আয় হারানো পরিবারগুলোর ওপর এক চরম ও নির্মম আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা থাকবে ৩০ ডিগ্রির ওপরে: আগামী দশকগুলোতেও বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবেই অবস্থান করবে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যবর্তী এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল উচ্চ থেকে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা-ভিত্তিক তীব্র তাপ-ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। দেশের অনেক অঞ্চলে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিনই গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে অবস্থান করবে।

গ্রীষ্মকাল ও চরম তাপদাহের পুরো সময়টিতে দেশের কিছু কিছু শিল্প ও উৎপাদন খাতে উৎপাদনশীলতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে, যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকা এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির জন্য এক বিশাল ও ক্রমবর্ধমান হুমকি।

এই সমস্ত ক্ষতিকর প্রভাবগুলো বাংলাদেশে আরও বেশি মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার প্রধান কারণ হলো দেশের শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল বাহুল্য। বিশেষত দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত প্রায় শতভাগ নারী শ্রমিকই সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কাজ করে থাকেন। নির্মাণশিল্পের মতো অন্যান্য প্রচণ্ড তাপদাহ-ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর বর্তমান অবস্থাও ঠিক একই রকম। যেহেতু কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ছাতা তাঁদের মাথার ওপর নেই, তাই প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রতিটি কর্মঘণ্টা বা কাজের দিন হারানোর অর্থ হলো তাঁদের জন্য সরাসরি দৈনিক আয় হারিয়ে ফেলা।

সমন্বিত আইনি ও নীতিগত সংস্কারের জরুরি আহ্বান: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ের আর্থিক ক্ষতির সীমানা ছাড়িয়ে, এই তীব্র তাপদাহ বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের একটি মারাত্মক ধাক্কা দিয়ে চলেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০২৪ সালে কেবল তাপদাহের কারণে বাংলাদেশ শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতার খাত থেকে আনুমানিক প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিশাল অর্থ হারিয়েছে। এর ওপর তাপদাহের সময় সারাদেশে ঘন ঘন লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি হওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এতে কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকেরা চার দেয়ালের ঘরের ভেতরেই প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করেন এবং শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। একই সাথে শরীর ঠাণ্ডা রাখার বা বিশ্রামের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এখন আর জলবায়ু অভিযোজন (ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন), সাধারণ জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা আলাদা আইনি ও নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার মতো বিলাসিতা দেখানোর অবস্থায় নেই। এর পরিবর্তে দেশের সরকারি জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষকে রেখে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রদত্ত মূল ও জরুরি সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. সাধারণ নাগরিকদের নিজস্ব পকেটের চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ শক্তিশালী করা, ২. কার্যক্ষেত্রে তীব্র তাপদাহের প্রত্যক্ষ সম্মুখীন হওয়া সকল শ্রমিকদের সামাজিকভাবে ও শ্রম আইনের আওতায় এনে সুরক্ষার পরিধি বহুলাংশে বাড়ানো, ৩. বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপদাহজনিত সমস্ত জনস্বাস্থ্য ও শারীরিক ঝুঁকিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, এবং ৪. দেশের জনস্বাস্থ্য খাত ও শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষার তাগিদে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন (ক্লাইমেট ফাইন্যান্স) নিশ্চিত করা।

পরিবেশ, অর্থনীতি ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষণের বিশ্বখ্যাত স্বাধীন থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে যে, ভবিষ্যতে তাপদাহের পুনরাবৃত্তি ও স্থায়িত্ব যত বৃদ্ধি পাবে, ততই দ্রুততার সাথে দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা ও সাধারণ পরিবারের আয় সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন এজেন্ডার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।