ঢাকা ০৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

বন্যা-পাহাড়ধসে ঘরছাড়া ৩৮ হাজার, স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শঙ্কায় অনেকে

আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণা বলছে, গত ১৭ বছরে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর চলতি বন্যায় ৩৮ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একটি অংশ স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শিকার হবে। সহায়-সম্বল হারানোর পাশাপাশি প্রায় ২০ শতাংশ পরিবার হারাবে পেশাও। এতে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষ হবে অতিদরিদ্র।

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসে গত এক সপ্তাহে দেশে প্রাণ গেছে ৫৪ জনের। পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় লাখের বেশি। সবচেয়ে বেশি বিপদে ঘরবাড়ি ছেড়ে সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ।

জেনেভাভিত্তিক ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) এবং ঢাকাভিত্তিক রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, দুর্যোগে ঘরবাড়ি ছেড়ে এই যে বাস্তুচ্যুত হওয়া—এর প্রভাব শুধু কয়েক দিনের কষ্ট বা তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর মাশুল গুনতে হয়।

গত ৯ জুলাই প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন (১৭০ কোটি) ডলার।

চট্টগ্রামে বন্যাকবলিত বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ যখন ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, ঠিক সেই সময় দুর্যোগের অদৃশ্য ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতির এই চিত্র সামনে এল।

গবেষকেরা বলছেন, চলতি বন্যায় অনেক মানুষ তাঁদের স্থায়ী আবাস হারাবেন। আপাতত ৩৮ হাজারের যে সংখ্যা দেখানো হচ্ছে, এটি মূলত অস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি। এখানকার একটি অংশ পরে স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শিকার হবেন। বাস্তুচ্যুতরা তাঁদের সহায়-সম্বল হারান। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষেরা হন অতিদরিদ্র। এ ছাড়া দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ জীবিকা হারান।

আগামী দিনে এমন দুর্যোগ আরও বাড়বে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে নদীভাঙন ও বন্যায় বছরে ২২ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি খারাপ হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটি ১৭৬ মিলিয়ন ডলারে ঠেকতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লক্ষাধিক, পানিবন্দী দেড় লাখ পরিবার

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সোমবার বিকেল ৪টায় প্রকাশিত সবশেষ প্রতিবেদনে এবারের বন্যার ভয়াবহতার নতুন চিত্র পাওয়া গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরাসরি ক্ষতির শিকার ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন পার করছে। তাদের জন্য খোলা ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত গেছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা চট্টগ্রাম জেলার। সেখানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় ১৬ হাজার ৮২১ জন অবস্থান করছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস ও বন্যার পেছনে অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে, গাছপালা ধ্বংস করা হয়েছে। পর্যটক টানার জন্য পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করা হলো, তার ফলেই আজকের এই ভয়াবহ দুর্যোগ। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুতই করে।’

বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত

দুর্যোগ শেষে ভিটায় ফিরলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কত দিন লাগে সেই উত্তরও খোঁজা হয়েছে আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণায়।

‘ইমপ্যাক্টস অব ডিসপ্লেসমেন্ট: দ্য হিউম্যান কস্ট অব ডিজাস্টার ডিসপ্লেসমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর ও সাতক্ষীরা—এই চার জেলার ছয় হাজার মানুষের ওপর সরাসরি জরিপ চালানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গত ১৭ বছরে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার ৯৯ শতাংশই আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত কারণে। গবেষকেরা এই ক্ষতি পরিমাপ করতে ‘লাইফ-ইয়ার্স লস্ট’ বা ‘জীবনের হারানো সময়’–এর একটি গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করেছেন। দেখা গেছে, দুর্যোগে বাংলাদেশিদের প্রায় ৮৯ হাজার ‘লাইফ-ইয়ার’ নষ্ট হয়েছে।এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রামরুর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মাহমুদুল হাসান রকি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতির মতো দৃশ্যমান হিসাব করিনি। মানুষ যখন বাস্তুচ্যুত হয়, তখন তার মানসিক ট্রমা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা বা সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অদৃশ্য ক্ষতিও হয়। আমরা এসব মানবিক ক্ষতিকে একটি গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে আর্থিক মূল্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর এতেই ক্ষতির বিশাল ও ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে।’

দরিদ্ররা হন হতদরিদ্র

আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণায় বলা হয়, দুর্যোগের পর অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহর বা নতুন এলাকায় আশ্রয় নেন। সেখানে হয়তো তাঁদের আয় কিছুটা বাড়ে, কিন্তু জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের কারণে তাঁরা মূলত দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যান।

আর এর ফলে তৈরি হয় বৈষম্য, দরিদ্ররা হতদরিদ্র হয়ে ওঠেন বলে জানান মাহমুদুল হাসান রকি। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র মানুষেরা নতুন জায়গায় গেলে খাপ খাওয়াতে পারেন না। নিজেদের পুরোনো পেশা হারিয়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। সেই ঋণ তাঁরা কোনো উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারেন না, বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন খাবারেই তা খরচ হয়ে যায়। ফলে তাঁরা ঋণের এমন এক দুষ্টচক্রে পড়েন, যেখানে একপর্যায়ে টিকে থাকার জন্য সহায়সম্বল যা থাকে, তা-ও বিক্রি করে দিতে হয়।’

দুর্যোগে দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো অর্থ। যার হাতে টাকা আছে, সে যেকোনো জায়গায় গিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। ফলে বাস্তুচ্যুতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে এই হতদরিদ্র মানুষগুলোই, যাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না।’

সামনে বড় বিপদ

দুর্যোগের সময় পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কারণে বাংলাদেশে আগের চেয়ে প্রাণহানি অনেক কমেছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে, তা রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘আমরা ৩৫ কোটি টাকা খরচ করে একটি সাইক্লোন সেন্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র বানাই, যেখানে মানুষ যেতে চায় না। অথচ এই একই টাকায় বুয়েটের নকশা অনুসরণ করে অন্তত ৩৫টি দুর্যোগসহনশীল বাড়ি তৈরি করা সম্ভব। মানুষকে তাদের নিজ ভিটায় নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে না দিলে বাস্তুচ্যুতির এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঠেকানো যাবে না।’

গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, দুর্যোগঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির সময়কাল কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেদিকে এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে। টেকসই ঘরবাড়ি নির্মাণ, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের আর্থসামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে না পারলে চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপকূলের এই মানুষেরা শুধু দারিদ্র্যের চক্রেই ঘুরপাক খাবেন।

এসব সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে গওহার নঈম বলেন, ‘এর মূল সমাধান হলো সঠিক গণতন্ত্র এবং মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নামে যখন খাল-নদী দখল হয় বা পাহাড় কাটা হয়, তখন সাধারণ মানুষের জবাবদিহি চাওয়ার সুযোগ থাকে না। সুশাসন নিশ্চিত না হলে এই অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাস্তুচ্যুতির চক্র থামবে না।’

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় হামাসের নৌ-কমান্ডারসহ ৪ যোদ্ধা নিহত

বন্যা-পাহাড়ধসে ঘরছাড়া ৩৮ হাজার, স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শঙ্কায় অনেকে

আপডেট সময় : ০৩:১৭:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণা বলছে, গত ১৭ বছরে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর চলতি বন্যায় ৩৮ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একটি অংশ স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শিকার হবে। সহায়-সম্বল হারানোর পাশাপাশি প্রায় ২০ শতাংশ পরিবার হারাবে পেশাও। এতে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষ হবে অতিদরিদ্র।

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসে গত এক সপ্তাহে দেশে প্রাণ গেছে ৫৪ জনের। পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় লাখের বেশি। সবচেয়ে বেশি বিপদে ঘরবাড়ি ছেড়ে সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ।

জেনেভাভিত্তিক ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) এবং ঢাকাভিত্তিক রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, দুর্যোগে ঘরবাড়ি ছেড়ে এই যে বাস্তুচ্যুত হওয়া—এর প্রভাব শুধু কয়েক দিনের কষ্ট বা তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর মাশুল গুনতে হয়।

গত ৯ জুলাই প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন (১৭০ কোটি) ডলার।

চট্টগ্রামে বন্যাকবলিত বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ যখন ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, ঠিক সেই সময় দুর্যোগের অদৃশ্য ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতির এই চিত্র সামনে এল।

গবেষকেরা বলছেন, চলতি বন্যায় অনেক মানুষ তাঁদের স্থায়ী আবাস হারাবেন। আপাতত ৩৮ হাজারের যে সংখ্যা দেখানো হচ্ছে, এটি মূলত অস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি। এখানকার একটি অংশ পরে স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শিকার হবেন। বাস্তুচ্যুতরা তাঁদের সহায়-সম্বল হারান। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষেরা হন অতিদরিদ্র। এ ছাড়া দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ জীবিকা হারান।

আগামী দিনে এমন দুর্যোগ আরও বাড়বে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে নদীভাঙন ও বন্যায় বছরে ২২ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি খারাপ হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটি ১৭৬ মিলিয়ন ডলারে ঠেকতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লক্ষাধিক, পানিবন্দী দেড় লাখ পরিবার

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সোমবার বিকেল ৪টায় প্রকাশিত সবশেষ প্রতিবেদনে এবারের বন্যার ভয়াবহতার নতুন চিত্র পাওয়া গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরাসরি ক্ষতির শিকার ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন পার করছে। তাদের জন্য খোলা ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত গেছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা চট্টগ্রাম জেলার। সেখানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় ১৬ হাজার ৮২১ জন অবস্থান করছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস ও বন্যার পেছনে অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে, গাছপালা ধ্বংস করা হয়েছে। পর্যটক টানার জন্য পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করা হলো, তার ফলেই আজকের এই ভয়াবহ দুর্যোগ। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুতই করে।’

বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত

দুর্যোগ শেষে ভিটায় ফিরলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কত দিন লাগে সেই উত্তরও খোঁজা হয়েছে আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণায়।

‘ইমপ্যাক্টস অব ডিসপ্লেসমেন্ট: দ্য হিউম্যান কস্ট অব ডিজাস্টার ডিসপ্লেসমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর ও সাতক্ষীরা—এই চার জেলার ছয় হাজার মানুষের ওপর সরাসরি জরিপ চালানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গত ১৭ বছরে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার ৯৯ শতাংশই আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত কারণে। গবেষকেরা এই ক্ষতি পরিমাপ করতে ‘লাইফ-ইয়ার্স লস্ট’ বা ‘জীবনের হারানো সময়’–এর একটি গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করেছেন। দেখা গেছে, দুর্যোগে বাংলাদেশিদের প্রায় ৮৯ হাজার ‘লাইফ-ইয়ার’ নষ্ট হয়েছে।এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রামরুর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মাহমুদুল হাসান রকি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতির মতো দৃশ্যমান হিসাব করিনি। মানুষ যখন বাস্তুচ্যুত হয়, তখন তার মানসিক ট্রমা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা বা সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অদৃশ্য ক্ষতিও হয়। আমরা এসব মানবিক ক্ষতিকে একটি গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে আর্থিক মূল্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর এতেই ক্ষতির বিশাল ও ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে।’

দরিদ্ররা হন হতদরিদ্র

আইডিএমসি ও রামরুর গবেষণায় বলা হয়, দুর্যোগের পর অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহর বা নতুন এলাকায় আশ্রয় নেন। সেখানে হয়তো তাঁদের আয় কিছুটা বাড়ে, কিন্তু জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের কারণে তাঁরা মূলত দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যান।

আর এর ফলে তৈরি হয় বৈষম্য, দরিদ্ররা হতদরিদ্র হয়ে ওঠেন বলে জানান মাহমুদুল হাসান রকি। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র মানুষেরা নতুন জায়গায় গেলে খাপ খাওয়াতে পারেন না। নিজেদের পুরোনো পেশা হারিয়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। সেই ঋণ তাঁরা কোনো উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারেন না, বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন খাবারেই তা খরচ হয়ে যায়। ফলে তাঁরা ঋণের এমন এক দুষ্টচক্রে পড়েন, যেখানে একপর্যায়ে টিকে থাকার জন্য সহায়সম্বল যা থাকে, তা-ও বিক্রি করে দিতে হয়।’

দুর্যোগে দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো অর্থ। যার হাতে টাকা আছে, সে যেকোনো জায়গায় গিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। ফলে বাস্তুচ্যুতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে এই হতদরিদ্র মানুষগুলোই, যাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না।’

সামনে বড় বিপদ

দুর্যোগের সময় পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কারণে বাংলাদেশে আগের চেয়ে প্রাণহানি অনেক কমেছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে, তা রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘আমরা ৩৫ কোটি টাকা খরচ করে একটি সাইক্লোন সেন্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র বানাই, যেখানে মানুষ যেতে চায় না। অথচ এই একই টাকায় বুয়েটের নকশা অনুসরণ করে অন্তত ৩৫টি দুর্যোগসহনশীল বাড়ি তৈরি করা সম্ভব। মানুষকে তাদের নিজ ভিটায় নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে না দিলে বাস্তুচ্যুতির এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঠেকানো যাবে না।’

গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, দুর্যোগঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির সময়কাল কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেদিকে এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে। টেকসই ঘরবাড়ি নির্মাণ, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের আর্থসামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে না পারলে চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপকূলের এই মানুষেরা শুধু দারিদ্র্যের চক্রেই ঘুরপাক খাবেন।

এসব সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে গওহার নঈম বলেন, ‘এর মূল সমাধান হলো সঠিক গণতন্ত্র এবং মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নামে যখন খাল-নদী দখল হয় বা পাহাড় কাটা হয়, তখন সাধারণ মানুষের জবাবদিহি চাওয়ার সুযোগ থাকে না। সুশাসন নিশ্চিত না হলে এই অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাস্তুচ্যুতির চক্র থামবে না।’