ঢাকা ১২:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মানবিক সংকটে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: নিরাময়ের পথে আবশ্যকতা ও নির্দেশিকা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহায়তার প্রচেষ্টাকে একত্রিত করার একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য— ‘বিপর্যয় ও জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা’— একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং জরুরি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

বর্তমান বিশ্ব যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। এর ফলস্বরূপ লাখ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। এই ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের পর অবকাঠামোগত ধ্বংস বা শারীরিক আঘাতের চিত্র সহজে চোখে পড়লেও, মানুষের মনে তৈরি হওয়া এর চেয়েও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত প্রায়শই অদৃশ্য এবং উপেক্ষিত থেকে যায়। এই আলোচনায় আমরা জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, এর সর্বজনীন প্রয়োজনীয়তা, সহায়তা লাভের উপায় এবং আরোগ্যের পথে সামাজিক সহমর্মিতার ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করব।

বন্যা, ভূমিকম্প বা যুদ্ধের মতো আকস্মিক বিপর্যয়ের পর আমাদের সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় আশ্রয়, খাদ্য এবং শারীরিক চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের দিকে। এটি অপরিহার্য হলেও, এই প্রক্রিয়ায় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, যারা এই ভয়াবহতার সাক্ষী, তাদের মনের ভেতরেও এক প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যায়। প্রিয়জন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা, সারা জীবনের সঞ্চয় ও জীবিকা হারানোর ভয় এবং ভবিষ্যতের ঘোর অনিশ্চয়তা—এই সবকিছু মিলে এক গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি করে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগের হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), তীব্র বিষণ্নতা এবং উদ্বেগজনিত সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। মূল সমস্যাটি হলো, সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এই মানসিক যন্ত্রণাগুলোকে ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ বা ‘বিলাসিতা’ হিসেবে দেখে। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্যটি এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি সমাজের প্রকৃত পুনরুদ্ধার কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক পুনরুদ্ধার ছাড়া সেই সমাজ কখনই পুরোপুরি সুস্থ হতে পারে না। একটি ভাঙা ঘর পুনরায় নির্মাণ করা গেলেও, একটি বিধ্বস্ত মন নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব।

আমাদের সমাজে বিদ্যমান একটি বড় বাধা হলো মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত স্টিগমা বা ভ্রান্ত ধারণা। অনেকেই মনে করেন, মানসিক চিকিৎসা কেবল গুরুতর মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য প্রয়োজন। এই ভুল ধারণা বিপর্যয়ের সময়ে আরও প্রকট হয়, যখন মানুষ তার কষ্ট প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে। একজন দুর্যোগে সর্বস্বান্ত মানুষ যখন তার হতাশা প্রকাশ করে, তখন তাকে ‘দুর্বল’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতোই মানসিক সমস্যাও একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার যথাযথ চিকিৎসা ও যত্ন প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক চাপের শিকার হতে পারে যে কেউ—সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে উদ্ধারকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী বা সাংবাদিক পর্যন্ত। যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে দিনরাত কাজ করছেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সর্বজনীন অধিকার। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া কোনও অস্বাভাবিকতা নয়, বরং এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং স্থিতিস্থাপক (resilient) থাকার এক বলিষ্ঠ প্রকাশ।

মানবিক সংকটের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হলেও বিভিন্ন পথে সহায়তা গ্রহণ করা সম্ভব:

এটি সংকটের মুহূর্তে মানুষকে মানসিক সমর্থন দেওয়ার একটি মানবিক উদ্যোগ, যা পেশাদার কাউন্সেলিং না হলেও অত্যন্ত কার্যকর। এর মূল লক্ষ্য হলো বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ বোধ করানো, সহানুভূতির সাথে তার কথা শোনা এবং তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করা।

বড় দুর্যোগের পর সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলররা সেখানে বিনামূল্যে সেবা দেন। স্থানীয় প্রশাসন বা নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম থেকে এই কেন্দ্রগুলোর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ফোনে বা অনলাইনেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সংস্থা পরিচয় গোপন রেখে কথা বলার সুযোগ দেয়, যা স্টিগমার ভয়কে দূর করে।

নিজের পরিবার, বন্ধু এবং প্রতিবেশীরাই হতে পারেন সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস। একে অপরের সাথে কথা বলা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা এবং সহায়তাকারী দল (Support Group) গঠন করার মাধ্যমে মানসিক চাপ অনেকাংশে লাঘব করা যায়।

চরম সংকটের মাঝেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা, পছন্দের কোনও কাজে (যেমন—লেখা, আঁকা, প্রার্থনা) যুক্ত থাকা এবং নিজের অনুভূতির প্রতি মনোযোগী হওয়া মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

মানবিক বিপর্যয়ের পর মানুষ প্রায়ই লজ্জা বা ভয়ের কারণে তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু এই চেপে রাখা আবেগগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখন আমরা আমাদের আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের কষ্টগুলো স্বীকৃতি পায় এবং মানসিক ভার লাঘব হয়। কথা বলার মাধ্যমে চিন্তার স্বচ্ছতা আসে এবং আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শিখি, যা নিরাময় প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য। এর জন্য সবসময় পেশাদার সহায়তার প্রয়োজন হয় না; একজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু বা পরিবারের সদস্যও হতে পারেন সেই নিরাপদ আশ্রয়।

২০২৫ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি জরুরি কর্মপরিকল্পনার আহ্বান। এটি আমাদের শেখায় যে, দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অবশ্যই ত্রাণ কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উদ্ধারকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা শারীরিক সেবার পাশাপাশি প্রাথমিক মানসিক সেবাও প্রদান করতে পারেন। পরিশেষে, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের দূত হিসেবে কাজ করতে হবে। পরিবার ও সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাটা স্বাভাবিক এবং সাহায্য চাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়। একটি স্থিতিশীল ও সহমর্মী সমাজই যেকোনোও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে দৃঢ়ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ, ভাঙা দেয়াল জোড়া লাগানো সম্ভব, কিন্তু ভাঙা মনকে সারিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন মানবিকতা, সহমর্মিতা আর সম্মিলিত যত্ন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎ সংকটে বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে সৌরচালিত আধুনিক গ্যাজেট

মানবিক সংকটে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: নিরাময়ের পথে আবশ্যকতা ও নির্দেশিকা

আপডেট সময় : ০৮:২৩:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহায়তার প্রচেষ্টাকে একত্রিত করার একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য— ‘বিপর্যয় ও জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা’— একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং জরুরি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

বর্তমান বিশ্ব যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। এর ফলস্বরূপ লাখ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। এই ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের পর অবকাঠামোগত ধ্বংস বা শারীরিক আঘাতের চিত্র সহজে চোখে পড়লেও, মানুষের মনে তৈরি হওয়া এর চেয়েও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত প্রায়শই অদৃশ্য এবং উপেক্ষিত থেকে যায়। এই আলোচনায় আমরা জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, এর সর্বজনীন প্রয়োজনীয়তা, সহায়তা লাভের উপায় এবং আরোগ্যের পথে সামাজিক সহমর্মিতার ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করব।

বন্যা, ভূমিকম্প বা যুদ্ধের মতো আকস্মিক বিপর্যয়ের পর আমাদের সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় আশ্রয়, খাদ্য এবং শারীরিক চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের দিকে। এটি অপরিহার্য হলেও, এই প্রক্রিয়ায় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, যারা এই ভয়াবহতার সাক্ষী, তাদের মনের ভেতরেও এক প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যায়। প্রিয়জন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা, সারা জীবনের সঞ্চয় ও জীবিকা হারানোর ভয় এবং ভবিষ্যতের ঘোর অনিশ্চয়তা—এই সবকিছু মিলে এক গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি করে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগের হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), তীব্র বিষণ্নতা এবং উদ্বেগজনিত সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। মূল সমস্যাটি হলো, সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এই মানসিক যন্ত্রণাগুলোকে ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ বা ‘বিলাসিতা’ হিসেবে দেখে। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্যটি এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি সমাজের প্রকৃত পুনরুদ্ধার কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক পুনরুদ্ধার ছাড়া সেই সমাজ কখনই পুরোপুরি সুস্থ হতে পারে না। একটি ভাঙা ঘর পুনরায় নির্মাণ করা গেলেও, একটি বিধ্বস্ত মন নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব।

আমাদের সমাজে বিদ্যমান একটি বড় বাধা হলো মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত স্টিগমা বা ভ্রান্ত ধারণা। অনেকেই মনে করেন, মানসিক চিকিৎসা কেবল গুরুতর মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য প্রয়োজন। এই ভুল ধারণা বিপর্যয়ের সময়ে আরও প্রকট হয়, যখন মানুষ তার কষ্ট প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে। একজন দুর্যোগে সর্বস্বান্ত মানুষ যখন তার হতাশা প্রকাশ করে, তখন তাকে ‘দুর্বল’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতোই মানসিক সমস্যাও একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার যথাযথ চিকিৎসা ও যত্ন প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক চাপের শিকার হতে পারে যে কেউ—সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে উদ্ধারকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী বা সাংবাদিক পর্যন্ত। যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে দিনরাত কাজ করছেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সর্বজনীন অধিকার। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া কোনও অস্বাভাবিকতা নয়, বরং এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং স্থিতিস্থাপক (resilient) থাকার এক বলিষ্ঠ প্রকাশ।

মানবিক সংকটের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হলেও বিভিন্ন পথে সহায়তা গ্রহণ করা সম্ভব:

এটি সংকটের মুহূর্তে মানুষকে মানসিক সমর্থন দেওয়ার একটি মানবিক উদ্যোগ, যা পেশাদার কাউন্সেলিং না হলেও অত্যন্ত কার্যকর। এর মূল লক্ষ্য হলো বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ বোধ করানো, সহানুভূতির সাথে তার কথা শোনা এবং তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করা।

বড় দুর্যোগের পর সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলররা সেখানে বিনামূল্যে সেবা দেন। স্থানীয় প্রশাসন বা নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম থেকে এই কেন্দ্রগুলোর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ফোনে বা অনলাইনেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সংস্থা পরিচয় গোপন রেখে কথা বলার সুযোগ দেয়, যা স্টিগমার ভয়কে দূর করে।

নিজের পরিবার, বন্ধু এবং প্রতিবেশীরাই হতে পারেন সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস। একে অপরের সাথে কথা বলা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা এবং সহায়তাকারী দল (Support Group) গঠন করার মাধ্যমে মানসিক চাপ অনেকাংশে লাঘব করা যায়।

চরম সংকটের মাঝেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা, পছন্দের কোনও কাজে (যেমন—লেখা, আঁকা, প্রার্থনা) যুক্ত থাকা এবং নিজের অনুভূতির প্রতি মনোযোগী হওয়া মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

মানবিক বিপর্যয়ের পর মানুষ প্রায়ই লজ্জা বা ভয়ের কারণে তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু এই চেপে রাখা আবেগগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখন আমরা আমাদের আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের কষ্টগুলো স্বীকৃতি পায় এবং মানসিক ভার লাঘব হয়। কথা বলার মাধ্যমে চিন্তার স্বচ্ছতা আসে এবং আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শিখি, যা নিরাময় প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য। এর জন্য সবসময় পেশাদার সহায়তার প্রয়োজন হয় না; একজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু বা পরিবারের সদস্যও হতে পারেন সেই নিরাপদ আশ্রয়।

২০২৫ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি জরুরি কর্মপরিকল্পনার আহ্বান। এটি আমাদের শেখায় যে, দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অবশ্যই ত্রাণ কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উদ্ধারকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা শারীরিক সেবার পাশাপাশি প্রাথমিক মানসিক সেবাও প্রদান করতে পারেন। পরিশেষে, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের দূত হিসেবে কাজ করতে হবে। পরিবার ও সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাটা স্বাভাবিক এবং সাহায্য চাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়। একটি স্থিতিশীল ও সহমর্মী সমাজই যেকোনোও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে দৃঢ়ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ, ভাঙা দেয়াল জোড়া লাগানো সম্ভব, কিন্তু ভাঙা মনকে সারিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন মানবিকতা, সহমর্মিতা আর সম্মিলিত যত্ন।