ঢাকা ১২:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

পলাশী-পরবর্তী বাংলার রাজনীতি ও বিভাজন নিয়ে ঢাবিতে বিশেষ সেমিনার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘পলাশী-উত্তর বাংলা: ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভাজনের রাজনীতির বিকাশ’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিএস)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক, শিক্ষক, চিন্তক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বক্তারা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের ঘটনা কেবল একজন নবাবের পতন বা একটি কোম্পানির বিজয় ছিল না; এটি ছিল বাংলার বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা।”

মূল প্রবন্ধ ও আলোচনা পর্বে তিনজন গবেষক পলাশী-পরবর্তী বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রথম বক্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন সমসাময়িক ফার্সি ভাষায় রচিত ঐতিহাসিক গ্রন্থের আলোকে সিরাজউদ্দৌলার ভাবমূর্তি নির্মাণের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে ব্রিটিশরা সিরাজউদ্দৌলাকে কখনো ‘খলনায়ক’, কখনো ‘ট্র্যাজিক নায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, লর্ড ক্লাইভ, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ ও উমিচাঁদদের ভূমিকা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, বরং তা ছিল উদীয়মান বণিক পুঁজি ও ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক শক্তির রাজনৈতিক সমঝোতার বহিঃপ্রকাশ।

দ্বিতীয় বক্তা জান্নাতে গুলশান তার আলোচনায় মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ভূমি সংস্কার এবং ইংরেজি শিক্ষার সুযোগকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলেও অন্য অংশকে প্রান্তিক করে রাখা হয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়।

তৃতীয় বক্তা ইমরুল হাসান বলেন, ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা, ভাষা ও চিন্তার জগতে সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মানসিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। এই প্রক্রিয়ায় নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীন এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

২০৩৮ ফুটবল বিশ্বকাপের একক আয়োজক হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

পলাশী-পরবর্তী বাংলার রাজনীতি ও বিভাজন নিয়ে ঢাবিতে বিশেষ সেমিনার

আপডেট সময় : ১০:৩৮:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘পলাশী-উত্তর বাংলা: ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভাজনের রাজনীতির বিকাশ’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিএস)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক, শিক্ষক, চিন্তক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বক্তারা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের ঘটনা কেবল একজন নবাবের পতন বা একটি কোম্পানির বিজয় ছিল না; এটি ছিল বাংলার বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা।”

মূল প্রবন্ধ ও আলোচনা পর্বে তিনজন গবেষক পলাশী-পরবর্তী বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রথম বক্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন সমসাময়িক ফার্সি ভাষায় রচিত ঐতিহাসিক গ্রন্থের আলোকে সিরাজউদ্দৌলার ভাবমূর্তি নির্মাণের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে ব্রিটিশরা সিরাজউদ্দৌলাকে কখনো ‘খলনায়ক’, কখনো ‘ট্র্যাজিক নায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, লর্ড ক্লাইভ, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ ও উমিচাঁদদের ভূমিকা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, বরং তা ছিল উদীয়মান বণিক পুঁজি ও ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক শক্তির রাজনৈতিক সমঝোতার বহিঃপ্রকাশ।

দ্বিতীয় বক্তা জান্নাতে গুলশান তার আলোচনায় মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ভূমি সংস্কার এবং ইংরেজি শিক্ষার সুযোগকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলেও অন্য অংশকে প্রান্তিক করে রাখা হয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়।

তৃতীয় বক্তা ইমরুল হাসান বলেন, ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা, ভাষা ও চিন্তার জগতে সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মানসিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। এই প্রক্রিয়ায় নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীন এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।