জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবইয়ের মান, প্রাসঙ্গিকতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এসব বইয়ের মাধ্যমে মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত হলেও প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও তার প্রয়োগের দক্ষতা অর্জনে তারা পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের বয়স, জ্ঞানীয় দক্ষতা ও ভাষাগত বোধের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর অসংগতি প্রকট। অপ্রয়োজনীয় জটিল বাক্য ও ধারণা শিশুদের শেখার আগ্রহকে নষ্ট করছে এবং তাদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করছে। এমনকি প্রাথমিক স্তরের বইয়ের ভাষাও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের মতো জটিল, যা শিশুদের জন্য দুর্বোধ্য। যেমন, তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ে ‘ফটোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় ক্লোরোপ্লাস্টের ভূমিকা’ নিয়ে আলোচনা করা হলেও শিশুরা কোষ বা ক্লোরোপ্লাস্ট কী, তা জানে না। এর ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা না বুঝেই কেবল মুখস্থ করে যায়। এই অসংগতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং উচ্চতর শ্রেণিতে গিয়ে বিমূর্ত ধারণার এক জটলা তৈরি করে, যা কিশোর মনে হজম করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান পাঠ্যবইগুলো মূলত মুখস্থবিদ্যা বা ‘রোট লার্নিং’ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত, যেখানে ইন্টারঅ্যাকটিভ লার্নিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। ‘চিন্তা করো’, ‘বিশ্লেষণ করো’, ‘পরীক্ষা করো’—এমন ধরনের নির্দেশিকা খুবই বিরল। বরং ‘নিচের উত্তরগুলো লেখো’ বা ‘খালি ঘর পূরণ করো’-এর মতো নির্দেশনাই বেশি দেখা যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের একঘেয়ে ও নিরানন্দ অধ্যয়নে ব্যস্ত থাকতে হয়। ব্যয়িত সময় ও শ্রমের তুলনায় প্রকৃত শিখনফল খুবই নগণ্য। একটি পরীক্ষণে দেখা গেছে, একই অধ্যায় পড়ে শিক্ষার্থীরা অর্থপূর্ণভাবে মাত্র ১৫ শতাংশ বিষয় ধারণ করতে পারে, বাকিটা ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিতে থাকে এবং পরীক্ষা শেষ হতেই তা উবে যায়। মুখস্থবিদ্যার এই সংস্কৃতি কখনোই উদ্ভাবক, সমালোচক এবং স্বাধীন চিন্তক তৈরি করতে পারে না।
বইয়ের মুদ্রণ, লেআউট ও ডিজাইনও অত্যন্ত নিম্নমানের। হরফ এত ছোট যে পড়তে চোখের ওপর চাপ পড়ে। বিরতিহীন ও ক্লান্তিকরভাবে ঠাসা টেক্সট শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব করে তোলে। দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনার অভাবে শেখার আগ্রহ আরও হ্রাস পায়। উন্নত দেশের পাঠ্যবইয়ে রঙিন চিত্র, ইনফোগ্রাফিক, মার্জিনে টিপস, প্রশ্ন ও প্রয়োগের উদাহরণ থাকে অঢেল। সেখানে অর্ধেক পাতা টেক্সট এবং বাকি অর্ধেক দৃশ্যায়নের মাধ্যমে বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় করে তোলা হয়, যা আমাদের দেশের পাঠ্যপুস্তকে অনুপস্থিত।
রিপোর্টারের নাম 





















