ঢাকা ০৪:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

সরকারি ঋণের গ্যারান্টিতে এখন থেকে দিতে হবে ফি

এখন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থার ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি প্রদান করলে এককালীন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে গ্যারান্টি ফি আদায় করবে সরকার। সরকারি গ্যারান্টির আওতায় ঋণ গ্রহণে নির্ভরশীলতা কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) একটি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি নীতিমালা, ২০১৪-এর আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার অনুকূলে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ এককালীন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে গ্যারান্টি ফি আরোপ করতে পারবে। নির্ধারিত এই ফি সরকারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনও রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি বা যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান দেশি কিংবা বিদেশি কোনও উৎস থেকে ঋণ নিতে চাইলে এবং সেই ঋণের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টি প্রয়োজন হলে নতুন নিয়ম অনুযায়ী গ্যারান্টি ফি পরিশোধ করতে হবে।
তাদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকারি গ্যারান্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নতুন এই ফি আরোপের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হবে এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ব্যবহারও যৌক্তিক পর্যায়ে সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে সরকারের জন্য এটি অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের একটি উৎস হিসেবে কাজ করবে।
সাধারণত বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি কিংবা কৃষিখাতের অর্থায়নের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থাগুলো প্রায়ই ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের গ্যারান্টি চেয়ে থাকে। সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয় এই ধরনের গ্যারান্টি প্রদান করে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি ঋণের বিপরীতে সরকারের প্রদত্ত গ্যারান্টির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি ৫৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি ৪৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের মোট গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এছাড়া কৃষি খাত, জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এবং জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি গ্যারান্টি রয়েছে।
তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিদেশি উৎস থেকে যে ঋণ গ্রহণ করেছে, তার বিপরীতেও সরকারের গ্যারান্টি রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এর কৃষিঋণ কর্মসূচির বিপরীতেও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি কার্যকর রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি গ্যারান্টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে সরকারের ওপর একটি সম্ভাব্য দায় সৃষ্টি হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর বর্তাতে পারে। ফলে গ্যারান্টির বিপরীতে ফি আরোপের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্যারান্টি ব্যবহারে জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশু নয়, তরুণরাও আক্রান্ত; সিলেটে হামের বিস্তার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সরকারি ঋণের গ্যারান্টিতে এখন থেকে দিতে হবে ফি

আপডেট সময় : ০২:২৫:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

এখন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থার ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি প্রদান করলে এককালীন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে গ্যারান্টি ফি আদায় করবে সরকার। সরকারি গ্যারান্টির আওতায় ঋণ গ্রহণে নির্ভরশীলতা কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) একটি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি নীতিমালা, ২০১৪-এর আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার অনুকূলে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ এককালীন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে গ্যারান্টি ফি আরোপ করতে পারবে। নির্ধারিত এই ফি সরকারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনও রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি বা যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান দেশি কিংবা বিদেশি কোনও উৎস থেকে ঋণ নিতে চাইলে এবং সেই ঋণের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টি প্রয়োজন হলে নতুন নিয়ম অনুযায়ী গ্যারান্টি ফি পরিশোধ করতে হবে।
তাদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকারি গ্যারান্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নতুন এই ফি আরোপের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হবে এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ব্যবহারও যৌক্তিক পর্যায়ে সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে সরকারের জন্য এটি অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের একটি উৎস হিসেবে কাজ করবে।
সাধারণত বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি কিংবা কৃষিখাতের অর্থায়নের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থাগুলো প্রায়ই ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের গ্যারান্টি চেয়ে থাকে। সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয় এই ধরনের গ্যারান্টি প্রদান করে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি ঋণের বিপরীতে সরকারের প্রদত্ত গ্যারান্টির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি ৫৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি ৪৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের মোট গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এছাড়া কৃষি খাত, জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এবং জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি গ্যারান্টি রয়েছে।
তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিদেশি উৎস থেকে যে ঋণ গ্রহণ করেছে, তার বিপরীতেও সরকারের গ্যারান্টি রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এর কৃষিঋণ কর্মসূচির বিপরীতেও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি কার্যকর রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি গ্যারান্টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে সরকারের ওপর একটি সম্ভাব্য দায় সৃষ্টি হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর বর্তাতে পারে। ফলে গ্যারান্টির বিপরীতে ফি আরোপের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্যারান্টি ব্যবহারে জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হবে।