দেশে চলমান হামের ভয়াবহ প্রকোপ ও ত্রাহি অবস্থার মাঝেই এবার নতুন করে আতঙ্ক ও চোখ রাঙানি শুরু করেছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু জ্বর। দেশজুড়ে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ফলে কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমলেও, পাল্লা দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশার বংশবিস্তার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার করে বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন ও সংক্রমণের বিস্তার অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের নিখুঁত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা, যার মধ্যে আবার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ে নিবিড় গবেষণা করছেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিমত অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য একটি আদর্শ সময়। এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ হয়তো ২০২৩ সালের মতো অতটা ভয়াবহ ও রেকর্ড ব্রেকিং হবে না, তবে গত বছরের চেয়েও এর প্রকোপ ও তীব্রতা অনেক বেশি হওয়ার তীব্র শঙ্কা রয়েছে। তিনি দুই সিটি কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখনই যদি মাঠপর্যায়ে মশকনিধন অভিযান জোরদার এবং কীটনাশকের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা না হয়, তবে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
অন্যদিকে, দেশে ডেঙ্গু রোগ বিস্তারের পেছনে শুধু মশাকে দায়ী না করে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ নগর পরিকল্পনাকেও সমানভাবে দায়ী করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ঢাকা বর্তমানে একটি অত্যন্ত উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ শহর হওয়ায় এখানে মশা খুব দ্রুত এক শরীর থেকে অন্য শরীরে রোগ ছড়াতে পারে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা শহরের বিশেষ কিছু নির্দিষ্ট স্থানে অতিরিক্ত উষ্ণতা জমা হওয়ার কারণে মশার বংশবিস্তারের জন্য এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আদিল মুহাম্মদ বলেন, দুই সিটি করপোরেশন মশা মারার নামে মূলত শুধু ফগিং করে, যা সম্পূর্ণ লোক দেখানো এবং অকার্যকর। ফগিং করার মাধ্যমে উড়ন্ত মশা হয়তো ক্ষণিকের জন্য দূরে সরে থাকে, কিন্তু মশার মূল উৎস অর্থাৎ লার্ভা কোনোভাবেই ধ্বংস হয় না। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন না আসবে, ততক্ষণ শুধু রাসায়নিক দিয়ে মশা তাড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সরকারি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ডেঙ্গুর এই ভয়াবহতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালে সারা দেশে ১০৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যার মধ্যে রাজধানীর বাসিন্দা ছিলেন ১৫ জন। ২০২২ সালে এই মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ লাফিয়ে এক লাফে দাঁড়ায় ২৮১ জনে, যেখানে রাজধানীবাসী ছিলেন ১৭৩ জন। তবে ২০২৩ সাল ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী বছর, যখন রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জন মানুষ ডেঙ্গুর কামড়ে প্রাণ হারান। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও যথাক্রমে ৫৭৫ জন ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং চলতি নতুন মৌসুমের শুরুতেই ইতোমধ্যে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের মধ্যে দুজনই ঢাকার বাসিন্দা। ডেঙ্গুর এই আগাম চোখ রাঙানি সামাল দিতে এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সিটি করপোরেশনই বেশ নড়েচড়ে বসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম বহুগুণ জোরদার করেছে এবং শহরের বিভিন্ন ড্রেন, খাল ও জলাবদ্ধ স্থানে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। এমনকি নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে বাউল গানের মাধ্যমে অভিনব প্রচারের মতো উদ্যোগও হাতে নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে এখন বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকার ৭৫টি ওয়ার্ডে ‘প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ’ শুরু করেছে। ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মশকনিধনের মতো জরুরি দায়িত্বে অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তারা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নিয়মিত জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি প্রত্যেক শনিবার নগরবাসীকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখার বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সম্ভাব্য চাপ সামলাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগেভাগেই বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানান, দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডেডিকেটেড ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়েছে। হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাসামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রান্তিক হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, চলমান হাম বা অন্যান্য রোগের প্রকোপের কারণে ডেঙ্গুকে কোনোভাবেই কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কারণ তাদের কাছে প্রতিটি নাগরিকের প্রাণই সমভাবে মূল্যবান। এছাড়া একটি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক কাজ করছে, যাতে দেশের কোনো সুনির্দিষ্ট এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ামাত্রই দ্রুত সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে গত ১৭ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার বকুল বলেছিলেন যে, প্রতি শনিবার সারা দেশে একযোগে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মশানিধনে স্প্রে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, কেবল একক সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেজন্য সাধারণ মানুষকেও নিজ থেকে সচেতন হতে হবে এবং মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগের ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ক্ষতিকর এডিস মশা আর শুধু শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। একসময় একে কেবল শহরের অভিজাত এলাকার রোগ মনে করা হলেও, বর্তমানে এটি ব্যাপকভাবে দেশের গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। মশার এই নতুন ও গ্রামীণ বিস্তারের মুখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই বিপদ মোকাবিলায় কতটা সক্ষম ও প্রস্তুত, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















