ঢাকা ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

কালশীতে স্বপ্নভঙ্গ: আগুনের গ্রাসে ঈদের আনন্দ, সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হাজারো মানুষ

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, ঠিক তখনই এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড রাজধানীর মিরপুরের কালশী বস্তির শত শত মানুষের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে লাগা এই আগুন উৎসবের আমেজকে রূপান্তর করেছে বুকফাটা কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে। সোমবার (২৫ মে) রাতের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে খেটে খাওয়া মানুষের বহু বছরের জমানো স্বপ্ন, বাসস্থান এবং আয়ের একমাত্র উৎস।

সাধারণ এক সোমবারে মাগরিবের আজান শেষে দোকানে তালা লাগিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন আমেনা বেগম। তিনি তখন কল্পনাও করতে পারেননি যে আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তার জীবনভর কষ্টের একমাত্র সম্বলটি আগুনে বিলীন হয়ে যাবে। ছোট ছেলের আকুল ফোনকল পেয়ে যখন তিনি কালশী বস্তির দিকে ছুটে আসেন, ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নিয়েছে তার ভাঙারির দোকানটি। বাতাসে তখন কেবল কালো ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদ। কান্নায় ভেঙে পড়ে আমেনা বেগম জানান, মাগরিবের আজানের পর তিনি বাসায় গিয়েছিলেন। এরপর ছোট ছেলে ফোন দিয়ে আগুন লাগার খবর জানালে তিনি দ্রুত ছুটে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন সব শেষ হয়ে গেছে, নিজের দোকান থেকে কোনো কিছুই আর বের করতে পারেননি।

একই রকম চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী রহমান। অগ্নিকাণ্ডে তার দোকানে থাকা প্রায় ৫০ লক্ষাধিক টাকার মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চোখের সামনে নিজের সর্বস্ব ধ্বংস হতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রহমান জানান, নামাজ পড়তে যাওয়ার সময়ও সব ঠিক ছিল, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। পথে বসে যাওয়া এই ব্যবসায়ী অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, এর আগেও এই এলাকায় আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। গত রবিবারও একই ধরনের একটি নাশকতার চেষ্টা স্থানীয়দের তৎপরতায় নস্যাৎ হলেও, এবার আর শেষ রক্ষা হলো না।

অসহায়ত্বের এই মিছিলে যোগ হয়েছে মুদি দোকানি কুলসুমের নামও। তিনি অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান যে শাশুড়িকে নিয়ে এই দোকানটি চালিয়েই তাদের সংসার চলতো। ঈদ উপলক্ষে দোকানে অনেক নতুন মালামাল তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় এখন তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই বাকি রইল না।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটার দিকে প্রথম একটি বাঁশের স্তূপে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেই আগুন পার্শ্ববর্তী প্লাস্টিক ও ভাঙারির দোকানে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তিনি তখন কালশী বাসস্ট্যান্ডে ছিলেন এবং একের পর এক ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে দেখেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার জানান, সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে তারা অগ্নিকাণ্ডের খবর পান এবং ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের মোট ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার একযোগে কাজ করেন। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় জনগণ, ভলান্টিয়ার, পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

তবে উদ্ধারকাজে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। বস্তি এলাকার অত্যন্ত সরু রাস্তা, পানির তীব্র সংকট এবং ভাঙারি, প্লাস্টিক ও কাগজের মতো দ্রুত দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় প্রায় ১,২০০ ঘর ও দোকান রয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস।

অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কেউ ছাইয়ের স্তূপের মধ্য থেকে তার পোড়া স্মৃতি বা কোনো মূল্যবান জিনিস খুঁজে পাওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন, কেউবা সব হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন, আবার কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগুনের প্রকৃত কারণ এবং সঠিক ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং এটি নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তবে এই তদন্ত বা সরকারি সহায়তার আশ্বাসের মাঝেও, কালশী বস্তির শত শত পরিবারের সামনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—ঈদের আনন্দ তো দূরে থাক, মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নতুন করে কীভাবে শুরু হবে তাদের জীবন?

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের প্রথম দিনেই সাভার ট্যানারিতে প্রবেশ করলো ২ লক্ষাধিক কাঁচা চামড়া

কালশীতে স্বপ্নভঙ্গ: আগুনের গ্রাসে ঈদের আনন্দ, সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হাজারো মানুষ

আপডেট সময় : ০৯:২০:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, ঠিক তখনই এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড রাজধানীর মিরপুরের কালশী বস্তির শত শত মানুষের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে লাগা এই আগুন উৎসবের আমেজকে রূপান্তর করেছে বুকফাটা কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে। সোমবার (২৫ মে) রাতের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে খেটে খাওয়া মানুষের বহু বছরের জমানো স্বপ্ন, বাসস্থান এবং আয়ের একমাত্র উৎস।

সাধারণ এক সোমবারে মাগরিবের আজান শেষে দোকানে তালা লাগিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন আমেনা বেগম। তিনি তখন কল্পনাও করতে পারেননি যে আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তার জীবনভর কষ্টের একমাত্র সম্বলটি আগুনে বিলীন হয়ে যাবে। ছোট ছেলের আকুল ফোনকল পেয়ে যখন তিনি কালশী বস্তির দিকে ছুটে আসেন, ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নিয়েছে তার ভাঙারির দোকানটি। বাতাসে তখন কেবল কালো ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদ। কান্নায় ভেঙে পড়ে আমেনা বেগম জানান, মাগরিবের আজানের পর তিনি বাসায় গিয়েছিলেন। এরপর ছোট ছেলে ফোন দিয়ে আগুন লাগার খবর জানালে তিনি দ্রুত ছুটে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন সব শেষ হয়ে গেছে, নিজের দোকান থেকে কোনো কিছুই আর বের করতে পারেননি।

একই রকম চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী রহমান। অগ্নিকাণ্ডে তার দোকানে থাকা প্রায় ৫০ লক্ষাধিক টাকার মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চোখের সামনে নিজের সর্বস্ব ধ্বংস হতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রহমান জানান, নামাজ পড়তে যাওয়ার সময়ও সব ঠিক ছিল, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। পথে বসে যাওয়া এই ব্যবসায়ী অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, এর আগেও এই এলাকায় আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। গত রবিবারও একই ধরনের একটি নাশকতার চেষ্টা স্থানীয়দের তৎপরতায় নস্যাৎ হলেও, এবার আর শেষ রক্ষা হলো না।

অসহায়ত্বের এই মিছিলে যোগ হয়েছে মুদি দোকানি কুলসুমের নামও। তিনি অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান যে শাশুড়িকে নিয়ে এই দোকানটি চালিয়েই তাদের সংসার চলতো। ঈদ উপলক্ষে দোকানে অনেক নতুন মালামাল তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় এখন তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই বাকি রইল না।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটার দিকে প্রথম একটি বাঁশের স্তূপে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেই আগুন পার্শ্ববর্তী প্লাস্টিক ও ভাঙারির দোকানে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তিনি তখন কালশী বাসস্ট্যান্ডে ছিলেন এবং একের পর এক ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে দেখেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার জানান, সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে তারা অগ্নিকাণ্ডের খবর পান এবং ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের মোট ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার একযোগে কাজ করেন। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় জনগণ, ভলান্টিয়ার, পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

তবে উদ্ধারকাজে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। বস্তি এলাকার অত্যন্ত সরু রাস্তা, পানির তীব্র সংকট এবং ভাঙারি, প্লাস্টিক ও কাগজের মতো দ্রুত দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় প্রায় ১,২০০ ঘর ও দোকান রয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস।

অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কেউ ছাইয়ের স্তূপের মধ্য থেকে তার পোড়া স্মৃতি বা কোনো মূল্যবান জিনিস খুঁজে পাওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন, কেউবা সব হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন, আবার কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগুনের প্রকৃত কারণ এবং সঠিক ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং এটি নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তবে এই তদন্ত বা সরকারি সহায়তার আশ্বাসের মাঝেও, কালশী বস্তির শত শত পরিবারের সামনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—ঈদের আনন্দ তো দূরে থাক, মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নতুন করে কীভাবে শুরু হবে তাদের জীবন?