ঢাকা ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন পিএসসি, আন্তর্জাতিক কোম্পানি আকর্ষণে শর্ত শিথিল

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। আগের দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় এবার তাদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট (পিএসসি) ২০২৬ প্রস্তুত করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগের দরপত্রে ডকুমেন্ট কিনেও যারা বিড জমা দেয়নি, তাদের কাছ থেকে কারণ ও সুপারিশ নেওয়া হয়। সেই মতামত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরামর্শকদের পরামর্শ বিবেচনায় রেখেই নতুন চুক্তির কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটির আশা, এতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে। নতুন দরপত্রে বঙ্গোপসাগরের ১১টি অগভীর (Shallow Sea) এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র (Deep Sea) ব্লক উন্মুক্ত করা হচ্ছে। অগভীর ব্লকগুলো এসএস-০১ থেকে এসএস-১১ এবং গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো ডিএস-০৮ থেকে ডিএস-২২ নামে চিহ্নিত। কোম্পানিগুলো এককভাবে বা যৌথভাবে একাধিক ব্লকের জন্য দরপত্রে অংশ নিতে পারবে।

নতুন পিএসসিতে কী কী সুবিধা থাকছে

নতুন চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ কিছু আকর্ষণীয় সুবিধা রাখা হয়েছে। আগের মতোই কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় থাকবে এবং কোম্পানির করপোরেট আয়করও বহন করবে পেট্রোবাংলা। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো পাইপলাইন ট্যারিফ সংযোজন। পাইপলাইন নির্মাণে বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে এই ট্যারিফ ক্রেতা পরিশোধ করবে। এছাড়া আগে অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট সময় শেষে ব্লকের ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হতো, এখন তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো ৮০ শতাংশ এলাকায় আরও দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালাতে পারবে। চুক্তিতে শতভাগ কস্ট রিকভারি বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় তুলে নেওয়া যাবে। অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণভাবে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার অনুমতিও থাকবে।

গ্যাস ও তেলের মূল্য নির্ধারণ

নতুন ব্যবস্থায় গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর ও সিলিং মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তেলের মূল্য নির্ধারিত হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। পেট্রোলিয়াম মুনাফা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে আর-ফ্যাক্টর ভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, যেখানে দরদাতা কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রস্তাবে লাভ বণ্টনের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে।

বিদেশি কোম্পানির জন্য আরও সুযোগ

যদি পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ঠিকাদার কোম্পানি তাদের অংশের গ্যাস দেশের অভ্যন্তরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। একই শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও থাকবে। তবে পেট্রোবাংলার অগ্রাধিকার অধিকার বহাল থাকবে। প্রথম অনুসন্ধান কূপে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাস না মিললে পরবর্তী কূপের ক্ষেত্রে কোম্পানির মুনাফার অংশ বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। অগভীর সমুদ্র ব্লকে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ ক্যারিড ইন্টারেস্ট সংরক্ষিত থাকবে।

কারা অংশ নিতে পারবে

দরপত্রে অংশ নিতে হলে কোম্পানিকে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের অপারেটর হতে হবে। অগভীর সমুদ্রের জন্য দৈনিক কমপক্ষে ৫ হাজার ব্যারেল তেল বা ৭৫ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। গভীর সমুদ্রের জন্য এ সীমা ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। পাশাপাশি নিজ দেশের বাইরে অন্তত একটি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কেন এই পরিবর্তন

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে এখনো বড় আকারের বাণিজ্যিক তেল-গ্যাস আবিষ্কার হয়নি। ২০২৪ সালের দরপত্রে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি। গ্যাসের দাম, পাইপলাইন ব্যয়, কস্ট রিকভারি এবং লাভ ভাগাভাগির শর্তকে তাদের অনীহার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

দরপত্র জমার সময়সীমা

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে বেসিক ইনফরমেশন প্যাকেজ পাওয়া যাবে। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর দুপুর ১টা, এবং একই দিন দুপুর ২টায় পেট্রোবাংলা কার্যালয়ে দরপত্র খোলা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশকে আর্থিক ও নীতিগত সুবিধা দিতে হচ্ছে। তবে সফলভাবে গ্যাস আবিষ্কার হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে এবং আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের প্রথম দিনেই সাভার ট্যানারিতে প্রবেশ করলো ২ লক্ষাধিক কাঁচা চামড়া

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন পিএসসি, আন্তর্জাতিক কোম্পানি আকর্ষণে শর্ত শিথিল

আপডেট সময় : ০১:৫১:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। আগের দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় এবার তাদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট (পিএসসি) ২০২৬ প্রস্তুত করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগের দরপত্রে ডকুমেন্ট কিনেও যারা বিড জমা দেয়নি, তাদের কাছ থেকে কারণ ও সুপারিশ নেওয়া হয়। সেই মতামত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরামর্শকদের পরামর্শ বিবেচনায় রেখেই নতুন চুক্তির কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটির আশা, এতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে। নতুন দরপত্রে বঙ্গোপসাগরের ১১টি অগভীর (Shallow Sea) এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র (Deep Sea) ব্লক উন্মুক্ত করা হচ্ছে। অগভীর ব্লকগুলো এসএস-০১ থেকে এসএস-১১ এবং গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো ডিএস-০৮ থেকে ডিএস-২২ নামে চিহ্নিত। কোম্পানিগুলো এককভাবে বা যৌথভাবে একাধিক ব্লকের জন্য দরপত্রে অংশ নিতে পারবে।

নতুন পিএসসিতে কী কী সুবিধা থাকছে

নতুন চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ কিছু আকর্ষণীয় সুবিধা রাখা হয়েছে। আগের মতোই কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় থাকবে এবং কোম্পানির করপোরেট আয়করও বহন করবে পেট্রোবাংলা। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো পাইপলাইন ট্যারিফ সংযোজন। পাইপলাইন নির্মাণে বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে এই ট্যারিফ ক্রেতা পরিশোধ করবে। এছাড়া আগে অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট সময় শেষে ব্লকের ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হতো, এখন তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো ৮০ শতাংশ এলাকায় আরও দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালাতে পারবে। চুক্তিতে শতভাগ কস্ট রিকভারি বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় তুলে নেওয়া যাবে। অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণভাবে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার অনুমতিও থাকবে।

গ্যাস ও তেলের মূল্য নির্ধারণ

নতুন ব্যবস্থায় গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর ও সিলিং মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তেলের মূল্য নির্ধারিত হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। পেট্রোলিয়াম মুনাফা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে আর-ফ্যাক্টর ভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, যেখানে দরদাতা কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রস্তাবে লাভ বণ্টনের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে।

বিদেশি কোম্পানির জন্য আরও সুযোগ

যদি পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ঠিকাদার কোম্পানি তাদের অংশের গ্যাস দেশের অভ্যন্তরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। একই শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও থাকবে। তবে পেট্রোবাংলার অগ্রাধিকার অধিকার বহাল থাকবে। প্রথম অনুসন্ধান কূপে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাস না মিললে পরবর্তী কূপের ক্ষেত্রে কোম্পানির মুনাফার অংশ বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। অগভীর সমুদ্র ব্লকে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ ক্যারিড ইন্টারেস্ট সংরক্ষিত থাকবে।

কারা অংশ নিতে পারবে

দরপত্রে অংশ নিতে হলে কোম্পানিকে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের অপারেটর হতে হবে। অগভীর সমুদ্রের জন্য দৈনিক কমপক্ষে ৫ হাজার ব্যারেল তেল বা ৭৫ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। গভীর সমুদ্রের জন্য এ সীমা ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। পাশাপাশি নিজ দেশের বাইরে অন্তত একটি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কেন এই পরিবর্তন

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে এখনো বড় আকারের বাণিজ্যিক তেল-গ্যাস আবিষ্কার হয়নি। ২০২৪ সালের দরপত্রে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি। গ্যাসের দাম, পাইপলাইন ব্যয়, কস্ট রিকভারি এবং লাভ ভাগাভাগির শর্তকে তাদের অনীহার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

দরপত্র জমার সময়সীমা

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে বেসিক ইনফরমেশন প্যাকেজ পাওয়া যাবে। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর দুপুর ১টা, এবং একই দিন দুপুর ২টায় পেট্রোবাংলা কার্যালয়ে দরপত্র খোলা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশকে আর্থিক ও নীতিগত সুবিধা দিতে হচ্ছে। তবে সফলভাবে গ্যাস আবিষ্কার হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে এবং আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করবে।