পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শুরু হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় গণযাত্রা। শনিবার (২৩ মে) ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো ঘরমুখো মানুষ। ঈদ সামনে রেখে সড়ক, রেল ও নৌপথে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। আগাম টিকিট বিক্রি, বিশেষ পরিবহন সার্ভিস, বাড়তি নিরাপত্তা এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভোর ৬টায় ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রেলপথে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদযাত্রা শুরু হয়। একই সময়ে বিআরটিসি ও বেসরকারি বাস বিভিন্ন জেলায় যাত্রা শুরু করে এবং সদরঘাট থেকেও দেশের বিভিন্ন রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়।
সড়কপথে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ঈদ স্পেশাল সার্ভিস চালু করেছে। রাজধানীর মতিঝিল, গাবতলী, কল্যাণপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন ডিপো থেকে দেশের প্রায় সব জেলায় বাস চলাচল করছে। পাশাপাশি গ্রিন লাইন, সোহাগ, হানিফ, শ্যামলী, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন ও দেশ ট্রাভেলসসহ বড় পরিবহন কোম্পানিগুলোও অগ্রিম টিকিটের ভিত্তিতে ঈদযাত্রা শুরু করেছে। যাত্রীদের স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কোরবানির পশুবাহী যান, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও তৈরি পোশাক পরিবহনকারী যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যানজট মোকাবিলায় দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে ৯৪টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ২৫টি করে স্পট। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৮টি, ঢাকা-আরিচায় ৭টি, ঢাকা-ময়মনসিংহে ৭টি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘনা টোলপ্লাজা, যমুনা সেতু টোল এলাকা, কাঁচপুর, কাঞ্চন সেতু, নবীনগর, বাইপাইল ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাড়তি নজরদারি থাকবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঈদের সাত দিন আগে থেকে ঈদের তিন দিন পর পর্যন্ত পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, মেঘনা সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন করা হবে। হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, টোলপ্লাজা, সড়ক মেরামত কাজ ও বিকল যানবাহনের কারণে যানজটের আশঙ্কা থাকলেও আগাম পরিকল্পনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
রেলপথে এবারও অগ্রিম টিকিট পুরোপুরি অনলাইনে বিক্রি করা হয়েছে। ঈদের আগে পাঁচ দিনে ঢাকা থেকে ২১৮টি ট্রেন চলাচল করবে এবং প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার যাত্রী বৈধ আসনে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। স্ট্যান্ডিং টিকিটের মাধ্যমে আরও ২৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনা টিকিটের যাত্রী ঠেকাতে ঢাকা, বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর স্টেশনে বাঁশের অস্থায়ী করিডর তৈরি করা হয়েছে। স্টেশনে প্রবেশের সময় যাত্রীদের টিকিট ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে র্যাব, জিআরপি, আরএনবি, বিজিবি ও স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে ১০টি বিশেষ ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা চাঁদপুর, দেওয়ানগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করবে। নাশকতা প্রতিরোধে স্টেশন, রেললাইন ও চলন্ত ট্রেনে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
নৌপথেও নেওয়া হয়েছে কড়াকড়ি ব্যবস্থা। যাত্রীদের ছাদে না ওঠা, অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা, অপরিচিত ব্যক্তির খাবার গ্রহণ না করা এবং নির্ধারিত পন্টুন ছাড়া অন্য কোথাও লঞ্চে ওঠানামা না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে ট্রলার ও নৌকা থেকে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সদরঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড। নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের যাত্রা বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিমুলিয়া-চাঁদপুর-ঈদগাহ এবং শিমুলিয়া-হরিণা-ইলিশা রুটে বিশেষ লঞ্চ ও ফেরি সার্ভিস চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এবারের ঈদে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ সড়কপথে যাতায়াত করবেন। এর সঙ্গে প্রায় এক কোটি কোরবানির পশু পরিবহনের বিষয়ও রয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এত বিপুল মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণের সহযোগিতা এবং অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবারের ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে।
রিপোর্টারের নাম 



















