অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে একটি বড় ধরনের ‘কাঠামোগত বিভ্রান্তি’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা সব সময় যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার মনে করলেও বাস্তবে সেখানে আমাদের বাণিজ্য মাত্র ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আমাদের প্রকৃত বৃহত্তম বাজার। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ইউরোপের বদলে মার্কিন বিমান কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না এবং এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও এসেছে। রেহমান সোবহান জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন এশিয়া মহাদেশে, বিশেষ করে পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায়। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে এশিয়াকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির বাস্তবতাকে গ্রহণ করা এবং আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ওয়েবিনারে দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। রেহমান সোবহান বলেন, ঋণ খেলাপি সংকট কেবল ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করছে না, বরং এটি সমাজে চরম আয় বৈষম্য তৈরি করছে। সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণির হাতে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশ কর আদায় হচ্ছে, যা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উচ্চ আয়ের মানুষদের কাছ থেকে সঠিকভাবে কর আদায় না হওয়াকেই বৈষম্যের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় দ্বিগুণ করার দাবি জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের সামাজিক পটভূমিই নির্ধারণ করে তারা কর ফাঁকিবাজ ও ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর হতে পারবে।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সরকারের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়া, কোনো ধরনের জাতীয় আলোচনা বা রূপরেখা ছাড়াই পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্পষ্ট বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে বিএনপির প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং এর ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথকে জটিল করে তুলছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও টেকসই অর্থনীতি অর্থনীতিবিদরা সরকারের খাল খনন, গাছ রোপণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলোকে জনবান্ধব ও ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, এই সামাজিক কার্ড বা কর্মসূচির অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংক ও কর খাতে সমন্বিত কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি বা ‘অন্ধগলি’ থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের এই সমস্ত উদ্বেগের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আশ্বস্ত করেন যে, অতীতে এনবিআরের এসআরও (SRO) সংস্কৃতির মাধ্যমে যে লবিং ও স্বজনপ্রীতির অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, বর্তমান সরকার তা ভেঙে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 






















