ঢাকা ০৭:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ছাত্ররাজনীতি: বিতৃষ্ণা থেকে প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত

‘আমি রাজনীতি ঘৃণা করি’ কিংবা ‘পলিটিকস আমার জন্য নয়’—বর্তমান প্রজন্মের বহু তরুণের মুখে এমন কথা প্রায়শই শোনা যায়। চারপাশের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, পেশিশক্তির আস্ফালন, দলীয় সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে তরুণদের এই বিমুখতা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেই মেধার বদলে রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে হলে একটি সিট পায়, তখন রাজনীতির প্রতি তার বিতৃষ্ণা আসাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, আপনি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও রাজনীতি কখনোই আপনার জীবন থেকে দূরে সরে যায় না। আপনার ক্যাম্পাসের ডাইনিংয়ের খাবারের মান, হলের নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার বাজেট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এমনকি পড়ালেখা শেষে কর্মসংস্থান—সবই রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো শত শত বছর আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তি হলো নিজের চেয়ে অযোগ্যদের দ্বারা শাসিত হওয়া।’ বর্তমান ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে রূঢ় সত্য আর কী হতে পারে!

রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু নেই; সচেতন, মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজনীতিকে ‘নোংরা’ বলে দূরে সরে যায়, তখন অযোগ্য ও পেশিশক্তিনির্ভর লোকরাই সেই জায়গা দখল করে নেয়। ইতালীয় চিন্তাবিদ অ্যান্টনিও গ্রামসি তার তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই চায় তরুণ সমাজ যেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। কারণ, রাজনীতিসচেতন তরুণরাই ক্যাম্পাসের অনিয়ম, রাষ্ট্রের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। আর তরুণরা যখন নীরব হয়ে যায়, সেই নীরবতার সুযোগেই গড়ে ওঠে স্বৈরতন্ত্র ও শোষণের কাঠামো।

আমরা এমন ছাত্ররাজনীতি চাই না, যেখানে শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার বদলে ভয় ও বিভাজনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গণরুম-গেস্টরুমের বিভীষিকা কিংবা রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ তোষামোদির যে সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে, তা মূলত শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির কারখানা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড়ঘর।

আমরা চাই মেধাবৃত্তিক ও অধিকারকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি। যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক নানা ইস্যু যেমন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ডেটা প্রাইভেসি বা মানবাধিকার নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের মনোজগতে প্রশ্ন করার সাহস জোগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয় এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। এমন ছাত্ররাজনীতিই পারে একটি উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গণমাধ্যম ও যুবসমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য: জবি উপাচার্য

ছাত্ররাজনীতি: বিতৃষ্ণা থেকে প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ১২:৪৩:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

‘আমি রাজনীতি ঘৃণা করি’ কিংবা ‘পলিটিকস আমার জন্য নয়’—বর্তমান প্রজন্মের বহু তরুণের মুখে এমন কথা প্রায়শই শোনা যায়। চারপাশের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, পেশিশক্তির আস্ফালন, দলীয় সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে তরুণদের এই বিমুখতা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেই মেধার বদলে রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে হলে একটি সিট পায়, তখন রাজনীতির প্রতি তার বিতৃষ্ণা আসাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, আপনি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও রাজনীতি কখনোই আপনার জীবন থেকে দূরে সরে যায় না। আপনার ক্যাম্পাসের ডাইনিংয়ের খাবারের মান, হলের নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার বাজেট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এমনকি পড়ালেখা শেষে কর্মসংস্থান—সবই রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো শত শত বছর আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তি হলো নিজের চেয়ে অযোগ্যদের দ্বারা শাসিত হওয়া।’ বর্তমান ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে রূঢ় সত্য আর কী হতে পারে!

রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু নেই; সচেতন, মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজনীতিকে ‘নোংরা’ বলে দূরে সরে যায়, তখন অযোগ্য ও পেশিশক্তিনির্ভর লোকরাই সেই জায়গা দখল করে নেয়। ইতালীয় চিন্তাবিদ অ্যান্টনিও গ্রামসি তার তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই চায় তরুণ সমাজ যেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। কারণ, রাজনীতিসচেতন তরুণরাই ক্যাম্পাসের অনিয়ম, রাষ্ট্রের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। আর তরুণরা যখন নীরব হয়ে যায়, সেই নীরবতার সুযোগেই গড়ে ওঠে স্বৈরতন্ত্র ও শোষণের কাঠামো।

আমরা এমন ছাত্ররাজনীতি চাই না, যেখানে শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার বদলে ভয় ও বিভাজনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গণরুম-গেস্টরুমের বিভীষিকা কিংবা রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ তোষামোদির যে সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে, তা মূলত শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির কারখানা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড়ঘর।

আমরা চাই মেধাবৃত্তিক ও অধিকারকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি। যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক নানা ইস্যু যেমন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ডেটা প্রাইভেসি বা মানবাধিকার নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের মনোজগতে প্রশ্ন করার সাহস জোগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয় এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। এমন ছাত্ররাজনীতিই পারে একটি উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।