ঢাকা ০৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

এপ্রিল মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি: নির্যাতনের শিকার ২৯৪ নারী ও শিশু, মব সন্ত্রাসে ২২ প্রাণহানি

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রতিবেদনে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মাসে সারাদেশে ২৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২২ জন।

মঙ্গলবার (৫ মে) ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যম ও নিজস্ব ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। এপ্রিল মাসে মোট ৬৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩০টি ছিল গণধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া ৭৯ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪ জন নারী এবং যৌতুকের নিষ্ঠুরতায় নিহত হয়েছেন আরও ৮ জন। শিশুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ; ১৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির উদ্বেগজনক বর্ণনা। এপ্রিল মাসে চুরি, ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ধর্মীয় অবমাননার মতো বিভিন্ন অভিযোগে ৪৪টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২২ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রেও এপ্রিল মাস ছিল উত্তাল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ মাসে ৯৮টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই ৪০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৪ জন নিহত ও ২৪৭ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং দলীয় কোন্দলই ছিল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। এছাড়া সাংবাদিক নির্যাতনের ৪০টি ঘটনায় ৭৫ জন সংবাদকর্মী হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সীমান্তের অস্থিরতা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ৮টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন আহত এবং ৩টি মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে হামলায় পীর আব্দুর রহমান নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে ২ জন বাংলাদেশি নিহত ও ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রেও চিত্রটি হতাশাজনক; কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮০টি নির্যাতনের ঘটনায় ১৩ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। সার্বিকভাবে এপ্রিল মাসের এই প্রতিবেদন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানবিক মর্যাদার চরম অবনতিকে নির্দেশ করছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

তিস্তা চুক্তি: দীর্ঘ দেড় দশকের অচলাবস্থা নিরসনে নতুন আশার আলো

এপ্রিল মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি: নির্যাতনের শিকার ২৯৪ নারী ও শিশু, মব সন্ত্রাসে ২২ প্রাণহানি

আপডেট সময় : ১২:৩১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রতিবেদনে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মাসে সারাদেশে ২৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২২ জন।

মঙ্গলবার (৫ মে) ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যম ও নিজস্ব ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। এপ্রিল মাসে মোট ৬৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩০টি ছিল গণধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া ৭৯ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪ জন নারী এবং যৌতুকের নিষ্ঠুরতায় নিহত হয়েছেন আরও ৮ জন। শিশুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ; ১৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির উদ্বেগজনক বর্ণনা। এপ্রিল মাসে চুরি, ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ধর্মীয় অবমাননার মতো বিভিন্ন অভিযোগে ৪৪টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২২ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রেও এপ্রিল মাস ছিল উত্তাল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ মাসে ৯৮টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই ৪০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৪ জন নিহত ও ২৪৭ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং দলীয় কোন্দলই ছিল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। এছাড়া সাংবাদিক নির্যাতনের ৪০টি ঘটনায় ৭৫ জন সংবাদকর্মী হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সীমান্তের অস্থিরতা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ৮টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন আহত এবং ৩টি মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে হামলায় পীর আব্দুর রহমান নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে ২ জন বাংলাদেশি নিহত ও ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রেও চিত্রটি হতাশাজনক; কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮০টি নির্যাতনের ঘটনায় ১৩ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। সার্বিকভাবে এপ্রিল মাসের এই প্রতিবেদন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানবিক মর্যাদার চরম অবনতিকে নির্দেশ করছে।