যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই প্রক্রিয়া আটকে যাওয়ায় দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বর্তমানে দেশজুড়ে হামের মহামারি দেখা দিয়েছে।
প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহ চিত্র ও মানবিক সংকট
২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে দেশ এখন চরম সংকটের মুখোমুখি। বর্তমানে সন্দেহভাজন সংক্রমণ নিয়ে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ অসুস্থ এবং প্রাণ হারিয়েছে ২৫০ জনেরও বেশি, যাদের বড় অংশই শিশু। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সংকটের কারণে শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘদিনের অর্জনের একটি বড় ‘পশ্চাৎপদতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
টিকাদান ব্যাহত হওয়ার কারণসমূহ
বাংলাদেশে সাধারণত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতি পরিবর্তনের কারণে ২০২৪ সালে নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তা আমলে নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অপুষ্টি এবং ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু করেছে। ডব্লিউএইচও ও গ্যাভি-র সহায়তায় গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান সংক্রমণের গতি যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে এই জরুরি কর্মসূচি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না।
এই সংকট নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে এই পরিস্থিতির জন্য সাবেক ও অন্তর্বর্তী—উভয় সরকারকেই দায়ী করেছেন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা স্বীকার করে শিশুদের এই মৃত্যুকে একটি ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 























