ঢাকা ০৯:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: জনমত জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪.৭ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ৩৩.৬ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রেখেছেন। দুই দলের মধ্যে জনসমর্থনের ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ, যা আগামী নির্বাচনে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক এই প্রাক-নির্বাচনী জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)। প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১৭ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো নির্দিষ্ট দলকে বেছে নিতে পারেননি অর্থাৎ তারা সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) ৭.১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে মত দিয়েছেন ৩.১ শতাংশ এবং অন্যান্য দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৪.৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন লাভ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮৬.৩ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের আনুপাতিক হারে বিন্যাস করলে বিএনপির সম্ভাব্য সমর্থন দাঁড়ায় ৪৩.২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ৪০.৮ শতাংশ।

গবেষণাটির কারিগরি দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনে এই জরিপ চালানো হয়। এতে মোট ২২,১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন। শহর ও গ্রামের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এতে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (স্ট্রার্টিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন) অনুসরণ করা হয়েছে।

দলের সমর্থনের নেপথ্যে ভোটারদের যুক্তি:
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটাররা তাদের পছন্দের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ৭২.১ শতাংশ মনে করেন, দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম ভোটার এবং কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির পেশাজীবীদের মধ্যে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে দলটির ‘সততার ভাবমূর্তি’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি’। ৪৪.৮ শতাংশ সমর্থক দলটিকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্ম এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণাতেও দলটি এগিয়ে রয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়।

নতুন শক্তি ও জুলাই বিপ্লবের প্রভাব:
রাজনীতিতে নতুন আসা ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) সমর্থনের পেছনে জুলাই বিপ্লবে দলটির ভূমিকার কথা জানিয়েছেন ৩৬.৭ শতাংশ ভোটার। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ১৭ শতাংশ সিদ্ধান্তহীন ভোটারকে নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন মূলত বিএনপির ‘অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ বনাম জামায়াতের ‘সততা ও ন্যায়বিচারের’ এক আদর্শিক লড়াই হতে যাচ্ছে। ভোটাররা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুশতাক খান এবং বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে খেলতে অনীহা, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনে আইসিসির জবাবের অপেক্ষায় বিসিবি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: জনমত জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

আপডেট সময় : ০৫:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪.৭ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ৩৩.৬ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রেখেছেন। দুই দলের মধ্যে জনসমর্থনের ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ, যা আগামী নির্বাচনে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক এই প্রাক-নির্বাচনী জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)। প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১৭ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো নির্দিষ্ট দলকে বেছে নিতে পারেননি অর্থাৎ তারা সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) ৭.১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষে মত দিয়েছেন ৩.১ শতাংশ এবং অন্যান্য দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৪.৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন লাভ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮৬.৩ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের আনুপাতিক হারে বিন্যাস করলে বিএনপির সম্ভাব্য সমর্থন দাঁড়ায় ৪৩.২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ৪০.৮ শতাংশ।

গবেষণাটির কারিগরি দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনে এই জরিপ চালানো হয়। এতে মোট ২২,১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন। শহর ও গ্রামের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এতে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (স্ট্রার্টিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন) অনুসরণ করা হয়েছে।

দলের সমর্থনের নেপথ্যে ভোটারদের যুক্তি:
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটাররা তাদের পছন্দের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ৭২.১ শতাংশ মনে করেন, দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম ভোটার এবং কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির পেশাজীবীদের মধ্যে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে দলটির ‘সততার ভাবমূর্তি’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি’। ৪৪.৮ শতাংশ সমর্থক দলটিকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্ম এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণাতেও দলটি এগিয়ে রয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়।

নতুন শক্তি ও জুলাই বিপ্লবের প্রভাব:
রাজনীতিতে নতুন আসা ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) সমর্থনের পেছনে জুলাই বিপ্লবে দলটির ভূমিকার কথা জানিয়েছেন ৩৬.৭ শতাংশ ভোটার। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ১৭ শতাংশ সিদ্ধান্তহীন ভোটারকে নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন মূলত বিএনপির ‘অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ বনাম জামায়াতের ‘সততা ও ন্যায়বিচারের’ এক আদর্শিক লড়াই হতে যাচ্ছে। ভোটাররা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুশতাক খান এবং বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।