সাবেক বিডিআর প্রধান জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড একটি সামরিক সমস্যা হিসেবে দ্রুত সমাধানযোগ্য হলেও, তা রাজনৈতিক অদক্ষতা, সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল।
প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা মূল ব্যর্থতা ও কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত ও সময়ক্ষেপণ
বিদ্রোহ শুরু হওয়ার মুহূর্তে সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব রাজনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেয়। হত্যা ও নৃশংসতার প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হলেও, আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হয় অনভিজ্ঞ নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলকে।
- রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময়ক্ষেপণ: এই সময়ক্ষেপণই হত্যাকারীদের তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়। বেলা আড়াই ঘটিকায় সেনা অফিসারের লাশ উদ্ধারের পরও রাজনৈতিক সমাধানের ‘অযৌক্তিক যুক্তিতে’ সেনা ও র্যাবকে সরিয়ে রাখা হয়। কমিশন এই ভুল সিদ্ধান্তকেই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ: প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীকে পিলখানার দৃষ্টিসীমার বাইরে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলে, হত্যাকারীরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালায় এবং দেয়াল বা গেট ব্যবহার করে সহজে পালিয়ে যায়।
সামরিক বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও কমান্ড চেইনের বিভ্রাট
সামরিক নেতৃত্ব অপারেশন পরিচালনায় বিলম্ব এবং সমন্বয়ের অভাবে মারাত্মক ব্যর্থতা দেখায়।
- অপারেশন বিলম্ব: ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড পিলখানার কাছে পৌঁছালেও তাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কমান্ডাররা অপেক্ষা ও সময় ক্ষেপণ করায় অপারেশন ‘রেস্টোর অর্ডার’ বিলম্বিত হয়।
- অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ: ট্যাংক এবং ভারী অস্ত্র শহরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
- কমান্ড চেইন ভাঙন: সেনাপ্রধান সঠিক সময়ে অপারেশন পরিচালনার জন্য উপস্থিত ছিলেন না, ফলে কমান্ড চেইন ভেঙে যায়।
- কার্যকর কর্ডন না থাকা: পিলখানার চারপাশে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি কোনো কার্যকর কর্ডন স্থাপন করা যায়নি, যা হত্যা, লাশ গুম ও আলামত ধ্বংসের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়।
পুলিশ ও র্যাবের কার্যকর ব্যর্থতা
র্যাব এবং পুলিশ বাহিনীও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।
- আক্রমণে বাধা: র্যাবের অগ্রগামী দলগুলো ঠিক সময়ে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিলেও তাদের ভিতরে প্রবেশ বা গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। র্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার ও এডিজি মেজর জেনারেল রেজানূর খান কার্যকর পদক্ষেপে বাধা দেন।
- আটক কার্যক্রমে ব্যর্থতা: পুলিশ ও র্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সঠিক পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন, ফলে অপরাধীরা পিলখানা থেকে পালাতে এবং লাশ ও আলামত ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
৪. উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
- অস্বাভাবিক উপস্থিতি: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী ও লে. কর্নেল (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) আজিজ আহমেদ পিলখানা বা যমুনায় অস্বাভাবিকভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং রাজনৈতিক নেতা ও সংসদ সদস্যদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
- সুবিধাজনক পদোন্নতি: পরবর্তীতে এই কর্মকর্তারা উচ্চ পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং তদন্ত প্রভাবিত করার সুযোগ পান।
পরিকল্পিত হত্যা ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমর্থন
কমিশন এই ঘটনাকে কেবল বিদ্রোহ নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
- পরিকল্পনার প্রমাণ: দরবারের আগে অস্ত্রাগার ও ম্যাগাজিনে হামলা, অফিসারদের হত্যার জন্য দ্রুত সমবেত হওয়া এবং ডিজির বাংলো ও অফিসারদের বাসস্থানে হামলা—সবই পরিকল্পিত ছিল বলে মনে করা হয়।
- স্থানীয় রাজনৈতিক সহায়তা: স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পূর্ণ সমর্থন ও মিছিল আয়োজন হত্যাকারীদের পিলখানা থেকে বের হতে সাহায্য করে। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি যেমন তোরাব আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা এতে সক্রিয় ভূমিকা নেন।
মিডিয়ার দায়িত্বহীনতা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা
- মিডিয়ার ভূমিকা: কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও পক্ষপাতমূলক প্রচারণা চালায়। বিদ্রোহীরা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য চিরকুট সাংবাদিকদের হাতে হস্তান্তর করে, যা যাচাই না করেই প্রচার করা হয়। কমিশন মুন্নী সাহা, মনজুরুল আহসান বুলবুল ও জহিরুল ইসলাম মামুনের নেতৃত্বে চালানো এই প্রচারণাকে ষড়যন্ত্রের অংশ বলে প্রতীয়মান করে।
- গোয়েন্দা ব্যর্থতা: এনএসআই, ডিজিএফআই, র্যাব বা এসবি কোনো কার্যকর তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি এবং পালিয়ে যাওয়া বিডিআর সদস্যদের চিহ্নিত ও আটক করা সম্ভব হয়নি।
কমিশনের মতে, এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে সংযুক্ত ব্যর্থতার চরম উদাহরণ হিসেবে আজও রয়ে গেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























