ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-এর নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জোয়ার এসেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ, আবার কোথাও ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখনও চলছে।
প্রায় তিন যুগ পর আগামী ১৬ অক্টোবর রাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রথম কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হয় ১৯৬২ সালে এবং সর্বশেষ হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও গঠনতন্ত্র সংশোধনের অজুহাতে প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নির্বাচন বন্ধ ছিল, যার ফলে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একমাত্র প্ল্যাটফর্মটি কার্যত অচল ছিল। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবির মুখে প্রায় তিন যুগ পর আগামী ১৬ অক্টোবর রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত ৩১ জুলাই আচরণবিধি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল দেয়। এই নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, দীর্ঘদিন পর নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের যে গণতান্ত্রিক সুযোগ এসেছে, তা যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় এবং কোনোভাবে বিতর্কিত না হয়। রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রফেসর ড. মো. আমজাদ হোসেন এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রফেসর ড. মো. সেতাউর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, তারা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সব বাধা দূর করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে বদ্ধপরিকর। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২৫ হাজার ১২৭ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী এবার ভোটার হয়েছেন এবং রাকসুর ২৩টি পদে, প্রতিটি হল সংসদের ১৫টি পদে এবং সিনেটের ৫টি ছাত্র প্রতিনিধি পদে ভোট নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালের সর্বশেষ রাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং জিএস পদে রুহুল কুদ্দুস বাবু নির্বাচিত হয়েছিলেন।
৩৫ বছর পর আগামী ১২ অক্টোবর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) প্রতিষ্ঠার ৫৯ বছরে মাত্র ছয়বার নির্বাচন হয়েছে; সর্বশেষটি হয় ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আগামী ১২ অক্টোবর সপ্তমবারের মতো এই নির্বাচন হবে বলে গত ২৮ আগস্ট ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী জানা যায়। সপ্তম চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন তফসিল ঘোষণার সময় জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪টি বিভাগ, ১৪টি হল ও ১টি হোস্টেলের মোট ২৫ হাজার ৭৫২ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক ভোটার তালিকায় আছেন। নির্বাচনের জন্য ১৪টি কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, দীর্ঘ বিরতির পর চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবেন এবং এটি তাদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাণবন্ত রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিবছর চাকসু নির্বাচনের দাবি জানান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের রূপরেখা প্রকাশ করেছে এবং আগামী ২৭ নভেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক শেখ গিয়াসউদ্দিন-এর বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জকসু বিধি অনুমোদিত হলেই ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন গঠন ও কার্যক্রম শুরু হবে। ৯ থেকে ১৭ অক্টোবরের মধ্যে নীতিমালা ও আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে এবং ১৮ অক্টোবর তফসিল ঘোষণা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ২৬ অক্টোবর খসড়া ভোটার তালিকা, ৫ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং ২৭ নভেম্বর ভোটগ্রহণ করা হবে। যদিও ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা ছিল, তার আগেই ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার আহ্বায়ক হয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা হাসান।
৬ নভেম্বর হাকসু ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে দিনাজপুরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি)। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবারের মতো আগামী ৬ নভেম্বর ছাত্র সংসদ (হাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. খাদেমুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই নির্বাচনের সম্ভাব্য রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আবু হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ছাত্র সংসদ সংক্রান্ত সংবিধি চ্যান্সেলর অনুমোদন দিলে আগামী ৬ নভেম্বর কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চুয়েটেকসু) ২০ বছর ধরে অচল। ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল সর্বশেষ নির্বাচন হওয়ার পর ২০০৩ ও ২০০৫ সালে ভোট ছাড়াই ছাত্রদল সমর্থিত কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে চুয়েটেকসুর কার্যক্রম বন্ধ। যদিও সংসদ অচল, তবুও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর ১০০ টাকা করে ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ অধিদফতরের পরিচালক মাহবুবুল আলম জানান, সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে চুয়েটে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ এবং দীর্ঘ দিন ধরে কেউ ছাত্র সংসদের দাবি নিয়ে তার কাছে আসেনি।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনোই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, ৯১.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ছাত্র সংসদ নির্বাচন চায়। তবে রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও ছাত্র সংসদ নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল দ্রুত একটি রূপরেখা প্রণয়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)-তে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইকসু) গঠনের দাবিতে ইবির সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মুভমেন্ট ফর ইকসু’ গঠন করেছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ আইনগত অনুমোদনের বিষয়টিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ইকসুর গঠনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি)-তে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র আলোচনা চলছে। অধ্যাদেশের ধারা ১৬ অনুযায়ী, ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের লিখিত অনুমতি ছাড়া ছাত্র সংসদ বা ছাত্র সংগঠন গঠন করা যাবে না। কিছু শিক্ষার্থী এটিকে দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম মনে করলেও, অধিকাংশেরই আশঙ্কা নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতা ডেকে আনতে পারে। ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত অধ্যাদেশে ছাত্র সংসদের কথা উল্লেখ না থাকায় মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে ডিসিপ্লিনভিত্তিক প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনার কথা জানান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু) গঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আন্দোলন করছেন এবং তাদের দাবির মুখে গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে কুকসু গঠনের প্রস্তাব ও সুপারিশ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে শিক্ষার্থীরা এখনও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন, তাদের অভিযোগ প্রশাসন কালক্ষেপণ করছে। রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, তাদের বিদ্যমান আইনে বিধান নেই, তবে গঠিত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে এবং তা সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা হবে।
প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৫ বছর পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) গঠনের লক্ষ্যে গত সোমবার (৬ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। রেজিস্ট্রা অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন এই তথ্য নিশ্চিত করলেও কবে নাগাদ কমিটির কাজ শেষ হবে, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। শিক্ষার্থীরা এই কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে অতিদ্রুত নির্বাচনের রূপরেখা প্রকাশের দাবি জানান।
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন জানান, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী তার কাছে আসেনি এবং ডুয়েটের আইনেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে ছাত্র সংসদের সংবিধানের খসড়া ইউজিসিতে পাঠানো হবে এবং সরকার গেজেট প্রকাশের সর্বোচ্চ ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হবে, যেখানে সম্ভাব্য তারিখ ধরা হয়েছে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
রিপোর্টারের নাম 

























