সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় জনপ্রিয় মুখরোচক কুমড়ো বড়ির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভোজনরসিকদের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটির রয়েছে আলাদা কদর। এই কুমড়ো বড়ি তৈরি ও বিক্রি করে তাড়াশের কয়েকশ পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। এটি সারা বছর তৈরি করা গেলেও এর মূল মৌসুম হলো শীতকাল। এ সময়ই এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়, কারণ শীতের বিভিন্ন সবজির সঙ্গে কুমড়ো বড়ির একটি বিশেষ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, ফলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকালে তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত।
শীতকালে কুমড়োর বড়ির স্বাদ অতুলনীয়। গ্রামের উঠানে ভোরবেলা থেকেই নারীরা চাল কুমড়ো ও মাষকলাইয়ের মিশ্রণ তৈরি করে মণ্ড বানাতে বসে যান। এরপর বাঁশের কাঠির তৈরি নেটের ওপর পাতলা কাপড় বিছিয়ে হাতের বিশেষ কায়দায় বড়ি বানানোর কাজ শুরু হয়। যদিও যান্ত্রিক যুগে কুমড়োর বড়ি তৈরির পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে; আগে ডাল ও চাল কুমড়ো ঢেঁকিতে তৈরি করা হতো, এখন বড়ির মণ্ড তৈরি হয় যন্ত্রে। তারপরও বড়ির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে এই কাজ নারীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে। কুমড়োর বড়ি তৈরির এই কাজ অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও তুলে ধরছে। বড়ি প্রস্তুতকারী নারীরা জানান, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ক্ষুদ্র ঋণের সহযোগিতা প্রয়োজন। এই মৌসুমি ব্যবসা শীতের শেষ পর্যন্ত চলে এবং স্বল্প সময়ের এই ব্যবসার লাভের অর্থ দিয়ে অনেক পরিবারের সারা বছরের খরচ চলে।
এ বছর সাধারণ মানের কুমড়োর বড়ি প্রতি কেজি ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর ভালো মানের কুমড়ো দিয়ে তৈরি বড়ি ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলাকার বড়ি প্রস্তুতকারক ও বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীরা। অনেকেই এই কুমড়োর বড়ি দেশের বাইরে স্বজনদের কাছেও পাঠিয়ে থাকেন।
নওগাঁ গ্রামের রজিনা, হালিমা, শাপলা, রজনী, আলুফা, শারমীন, কেয়া সহ প্রায় শতাধিক নারী প্রতিদিন এই কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাংলা সনের কার্তিক মাস থেকে ফ্লাগুন মাস পর্যন্ত কুমড়োর বড়ির চাহিদা বেশি থাকে। তাই এ বছরও অক্টোবর মাস থেকে বড়ি তৈরি শুরু হয়েছে, যা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে। গত বছর মাষকলাই ডাল প্রতি কেজি ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও এ বছর সেই ডাল ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ডালের দাম কিছুটা বাড়লেও বড়ির স্বাদের কারণে এর চাহিদা একই রকম আছে।
নাজমা খাতুন জানান, এক সময় কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো। কিন্তু এখন মেশিনের মাধ্যমে ডাল গুঁড়ো করা হয়, শুধু হাতের মাধ্যমে বড়ি তৈরি করে রোদে শুকাতে হয়। পরিবারের সদস্যরাও এই কাজে সহযোগিতা করে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি কিছু সুবিধা দেয়, তবে বড় পরিসরে বড়ি তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, কুমড়ো বড়ি তারা বংশপরম্পরায় তৈরি করছেন—তার বাপ-দাদা, তিনি নিজে, এবং এখন তার ছেলে-নাতিপুতিরাও এই কাজ করছে।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ টি এম গোলাম মাহবুব বলেন, কুমড়ো বড়ি তৈরি করে উপজেলার অনেক নারীর অর্থনৈতিক সমস্যা দূর হচ্ছে। তাদের অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ করিয়ে নারীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























